এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান মাহ্দী আমিন। © টিডিসি ফটো
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে চার দিনের নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ মোট ৩০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি জানান, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে একটি ভাষণসহ মোট সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৫টায় (বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর ৩টায়) জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান মাহ্দী আমিন। প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ, বিশ্বমঞ্চে দেওয়া বক্তব্য এবং নিউইয়র্ক সফরের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে এ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
মাহ্দী আমিন বলেন, অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এই সফরে প্রধানমন্ত্রী গত চার দিনে মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান আটটিসহ সরকারি প্রতিনিধিদল আরও প্রায় ৫০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ প্রায় ৮০টি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে প্রতিনিধিত্ব করেছে বলে জানান তিনি।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোট সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। এর মধ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে একটি ভাষণ দেন তিনি। এ ছাড়া সাইডলাইনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে চারটি, শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে একটি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে একটি বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।
মাহ্দী আমিন জানান, জাতিসংঘকেন্দ্রিক প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিগুলো কয়েকটি ভাগে বিভক্ত ছিল। সাধারণ পরিষদের মূল ধারার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত আটটি কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য দেওয়া, জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রাতরাশ অনুষ্ঠান ও উদ্বোধনী অধিবেশন ছিল। এ ছাড়া জাতিসংঘ সম্মেলনস্থলের বাইরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
বৈশ্বিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট চারটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব কর্মসূচিতেও প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিয়ে রোহিঙ্গা সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে ধাত্রী বা মিডওয়াইফের সংখ্যা বৃদ্ধিসংক্রান্ত দুটি অনুষ্ঠান আয়োজন করে। এ ছাড়া জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায্য রূপান্তর এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসংক্রান্ত দুটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
মাহ্দী আমিন জানান, সফরে মালদ্বীপ, ভুটান, হাইতি, তুরস্ক, ক্রোয়েশিয়া, ইরান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—এই ১১টি দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশেষ করে কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সঙ্গে বৈঠকে জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয় বলে জানান তিনি।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বাইরে প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পাঁচটি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আরও ছয়টি বৈঠক করেন বলেও জানান মাহ্দী আমিন। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিব, জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
এ ছাড়া বোয়িং গ্লোবাল, গেটস ফাউন্ডেশন, ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারী, ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউট ও স্থানীয় প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। মাহ্দী আমিন জানান, তিনি মোট আটটি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং এর চারটিতে বক্তব্য দেন। জাতিসংঘের নারী নেত্রীদের প্ল্যাটফর্মের বার্ষিক অধিবেশন, বিশ্ব ফার্স্ট স্পাউস সংলাপ এবং মাতৃমৃত্যু হ্রাসসংক্রান্ত মিডওয়াইফারি ইভেন্টে তাঁর বক্তব্যের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের চার দিনের সফর শেষে শুক্রবার রাতে দেশে ফেরার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। মাহ্দী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় একটি ছোট প্রতিনিধিদল পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তি ও শিক্ষা খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে ক্যালিফোর্নিয়ায় যাবে।
সফরের শেষ দিনেও প্রধানমন্ত্রী ব্যস্ত সময় কাটান বলে জানান মাহ্দী আমিন। সকালে বিশ্বখ্যাত জেপি মর্গান চেস আয়োজিত ‘ব্রেকফাস্ট মিটিং উইথ ওয়াল স্ট্রিট’ শীর্ষক বৈঠকে অংশ নেন তিনি। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০টি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ বিনিয়োগকারীরা অংশ নেন। বাংলাদেশের বিশেষ করে আর্থিক খাতে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে সেখানে আলোচনা হয়।
এরপর ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের (আইপিআই) প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বিশ্বশান্তি, মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে আলোচনা হয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়। মাহ্দী আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে বাংলাদেশের মানবাধিকার, আইনের শাসন ও বাকস্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সফরের শেষ মুহূর্তে প্রবাসী কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গেও কুশল বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সময়ে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। তিন দেশ থেকেই প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানান মাহ্দী আমিন।
তিনি বলেন, এসব বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জ্বালানি ও খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে যৌথ বিনিয়োগের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, ‘আমরা দেখেছি বিশ্বের প্রতিটি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা অপরিসীম শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার সাথে প্রধানমন্ত্রীকে গ্রহণ করেছে। কারণ ওনার ক্ষমতার মূল উৎসই হচ্ছে দেশের জনগণ।’
তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পাশাপাশি বিশ্বে শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবতা প্রতিষ্ঠার বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
মাহ্দী আমিন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের এই ইতিবাচক ধারা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে এবং প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি একেএম ওয়াহিদুজ্জামান, প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনিসহ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সদস্য ও জাতিসংঘ মিশনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।