বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ সমাধি © টিডিসি ফটো
স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ। তার সমাধিস্থল যশোরের শার্শা উপজেলার কাশীপুরে। প্রতিবছর জাতীয় দিবসগুলোতে সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শ্রদ্ধা জানানো হয়। আসে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে জাতীয় এই বীরের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটিতে এখনো কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। বর্ষায় সমাধিস্থলে যাওয়ার একমাত্র রাস্তায় জমে হাঁটুপানি। নেই দর্শনার্থীদের বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। নেই মিলাদ মাহফিল আয়োজনের নির্দিষ্ট ঘরও। তাই বীরশ্রেষ্ঠের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকীর আগে দীর্ঘদিনের দাবিগুলো বাস্তবায়নে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দ্রুত উদ্যোগ চান স্থানীয় বাসিন্দারা।
৫ সেপ্টেম্বর বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। প্রতিবছর এই দিনসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে তার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন মুক্তিযোদ্ধা, প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষ। কিন্তু বর্ষা এলেই তাদের পড়তে হয় নানা দুর্ভোগে।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সমাধিস্থলে যাওয়ার একমাত্র রাস্তায় বৃষ্টির সময় হাঁটুপানি জমে থাকে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষও ভোগান্তিতে পড়েন। দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা নিরসন ও রাস্তাটি স্থায়ীভাবে সংস্কারের দাবি জানানো হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু রাস্তা সংস্কার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সমাধিস্থলকে ঘিরে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও গড়ে তুলতে হবে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে একটি জাদুঘর, স্মৃতিসৌধ, মিলাদ মাহফিলের জন্য ঘর এবং দর্শনার্থী ও সরকারি অনুষ্ঠানে আসা অতিথিদের বসার ব্যবস্থা। সমাধিস্থলের পাশে একটি পোস্ট অফিস স্থাপনের দাবিও রয়েছে।
এলাকাবাসী আরও চান, সমাধিস্থলের ভেতর দিয়ে যাওয়া রাস্তাটি মাজারের পাশ দিয়ে অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া হোক। তাদের মতে, এতে সমাধিস্থলের পবিত্রতা ও পরিবেশ আরও সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ শুধু শার্শা বা যশোরের নন। তিনি পুরো জাতির গর্ব। অথচ দীর্ঘদিন ধরে তার সমাধিস্থল কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও সংরক্ষণের অভাবে পড়ে আছে। বিভিন্ন সরকার সময়ে সময়ে ক্ষমতায় এলেও জাতীয় এই বীরের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটির স্থায়ী উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা দ্বীন ইসলাম দিনু বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন। তার সমাধিস্থল কোনো সাধারণ স্থান নয়। এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ। এখানে এমন পরিবেশ তৈরি করা দরকার, যেখানে নতুন প্রজন্ম এসে তাঁর বীরত্বের ইতিহাস জানতে পারবে। দীর্ঘদিনের দাবিগুলো বাস্তবায়নে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা আল-আমীন বলেন, তাদের এলাকায় একজন বীরশ্রেষ্ঠ শায়িত আছেন, এটি তাদের জন্য গর্বের। কিন্তু বর্ষায় সমাধিস্থলে যাওয়ার রাস্তায় হাঁটুপানি জমে থাকে। বিষয়টি তাদের কষ্ট দেয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন বলে আশা করেন তিনি। তার মতে, রাস্তা সংস্কারের পাশাপাশি স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা দরকার।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করে, কাশীপুরের স্থানটিকে শুধু একটি সমাধি হিসেবে দেখলে হবে না। এটিকে পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেখানে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের জীবন, মুক্তিযুদ্ধে তার বীরত্ব এবং ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনের ইতিহাস তুলে ধরতে আধুনিক জাদুঘর ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, জাদুঘর ও স্মৃতিসৌধ হলে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে নূর মোহাম্মদ শেখের আত্মত্যাগ সম্পর্কেও তারা আরও গভীরভাবে জানতে পারবে। দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীদের জন্যও স্থানটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে।
এলাকাবাসীর আরও দাবি, দর্শনার্থীদের জন্য বসার স্থান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। মিলাদ মাহফিল আয়োজনের জন্য আলাদা ঘর নির্মাণ করতে হবে। সমাধিস্থলের পাশে পোস্ট অফিস স্থাপনের দাবিও তাঁরা জানিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কাশীপুরের সমাধিস্থল শুধু শ্রদ্ধা নিবেদনের স্থান থাকবে না। এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চা এবং নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হবে।
শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে ওয়াহিদ বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ জাতীয় গৌরব। তাঁর সমাধিস্থলের প্রতি সবার দায়িত্ব রয়েছে। স্থানীয়দের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও সংরক্ষণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এনে সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর উপজেলার চণ্ডিবরপুর ইউনিয়নের মহিষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পরে তার জন্মস্থানটির নামকরণ করা হয় নূর মোহাম্মদনগর। ১৯৫৯ সালে তিনি তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ৮ নম্বর সেক্টরে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যশোরের শার্শা উপজেলার গোয়ালহাটি ও ছুটিপুর এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন নূর মোহাম্মদ শেখ। পরে তাঁকে শার্শা উপজেলার কাশীপুরে সমাহিত করা হয়। কাশীপুরের এই সমাধিস্থলে নূর মোহাম্মদ শেখ ছাড়াও আরও কয়েকজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সমাধি রয়েছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্মৃতির দিক থেকে স্থানটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
প্রতিবছর বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় দিবসে সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। দেওয়া হয় গার্ড অব অনারও। জাতীয় বীরের সমাধিতে নিয়মিত রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শ্রদ্ধা জানানো হলেও দীর্ঘদিনেও কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে আক্ষেপ।
শাহাদাতের ৫৫ বছর পর এবার এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের স্মৃতি শুধু ফুলেল শ্রদ্ধার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তার সমাধিস্থল সংরক্ষণ ও উন্নয়নে নেওয়া হবে দৃশ্যমান ও স্থায়ী উদ্যোগ। তাদের বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে দীর্ঘদিনের দাবিগুলো বাস্তবায়িত হলে কাশীপুরের এই সমাধিস্থল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য স্মারক হয়ে উঠতে পারে।