রোহিঙ্গা ক্যাম্প © টিডিসি ফটো
সন্ধ্যা নামলেই কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালংয়ের একটি ক্যাম্পে নেমে আসে আতঙ্ক। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে দেন বাসিন্দারা। শিশুরা বাইরে খেলতে যায় না। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হন না পুরুষদেরও অনেকে। কারণ, অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পের পাহাড়ি পথগুলোতে সক্রিয় হয়ে ওঠে সশস্ত্র দলগুলোর চলাচল।
নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা লাখো রোহিঙ্গার আশ্রয়স্থল উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে সময়ের সঙ্গে নতুন করে ঘনীভূত হচ্ছে নিরাপত্তা সংকট। আধিপত্যের লড়াই, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, খুন, অবৈধ অস্ত্র, মাদক কারবার, অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে অস্থির হয়ে উঠেছে ৩৩টি নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প।
কয়েক বছর আগেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রধান উদ্বেগ ছিল খাদ্য, আশ্রয় ও প্রত্যাবাসন। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সশস্ত্র অপরাধী চক্রের দাপট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্যাম্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ধর্ষণ, মানব পাচার, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, স্বর্ণ পাচারসহ নানা অপরাধে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়ছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান জানান, ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সাড়ে চার হাজারের মতো মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা আসামি হয়েছেন।
তিনি জানান, ২৮৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা ২৭৭ মামলায় আসামি হয়েছেন দুই হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। মাদকের সাড়ে তিন হাজার মামলায় আসামি ৫ হাজার ৯৩৫ জন। অস্ত্র ও দস্যুতার ১৬৫ মামলায় ৩১২ জন, ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ৩৫২ মামলায় ৫২১ জন, অপহরণের ৩০৬ মামলায় ৩৫৩ জন এবং মানব পাচারের চার শতাধিক মামলায় ৮৭৯ জন আসামি হয়েছেন। এর বাইরে অন্যান্য আইনে আরও শতাধিক মামলা রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ক্যাম্পে অপরাধের ধরন যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। অপরাধের বিস্তার ক্যাম্পের সীমানা ছাড়িয়ে উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি এলাকা, ক্যাম্পসংলগ্ন জনপদ এবং সীমান্তবর্তী বিভিন্ন পথেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সিরাজ আমিন বলেন, ‘খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মানব পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, ইয়াবা ও স্বর্ণ চোরকারবারসহ আরও কয়েক ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই ক্যাম্পে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্যাম্পের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বিস্তার নতুন নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাবাসন আটকে থাকা, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া এবং ক্যাম্পজীবনের অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এছাড়া স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। মাদক ও অস্ত্রের চালান, সীমান্তপথে মানব পাচার কিংবা মুক্তিপণের জন্য অপহরণের মতো অপরাধে ক্যাম্পের ভেতর থেকে লোক সংগ্রহ করা হচ্ছে। ছোট-বড় একাধিক সশস্ত্র গ্রুপ ক্যাম্পে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এসব দলের আধিপত্যের দ্বন্দ্ব থেকেই কখনো প্রকাশ্যে গোলাগুলি, কখনো টার্গেট করে হত্যা, আবার কখনো অপহরণের ঘটনা ঘটছে।
টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আলী বলেন, ক্যাম্পে এখনো এক ডজনের বেশি অপরাধী চক্র সক্রিয়। তাদের বেশির ভাগই সশস্ত্র। এসব অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। অপরাধের শিকার শুধু স্থানীয় বাংলাদেশিরা নন, ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গারাও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভয়ে অনেকটা জিম্মি হয়ে আছেন।
উখিয়ার কুতুপালং ৫ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা আয়েশা বেগমের স্বামী কোনো অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি রাতে পাহারার কাজ করতেন। তবে এক রাতে মুখোশধারীদের একটি দল তাকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে বলে অভিযোগ আয়েশার। চার সন্তান নিয়ে এখন আতঙ্কে দিন কাটছে তার।
আয়েশা বলেন, ‘আমার স্বামী কোনো দল করতেন না, শুধু রাতে পাহারার কাজ করতেন। মাঝরাতে একদল মুখোশধারী এসে তাকে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে যায় এবং গুলি করে মেরে ফেলে। এখন আমি চার সন্তান নিয়ে চরম আতঙ্কে আছি। ক্যাম্পে অন্ধকার নামলেই আমাদের বুক কাঁপে, কখন কার ঘরে হামলা হয় কেউ জানে না।’
বালুখালী ক্যাম্পের মাঝি মোহাম্মদ জুবায়েরও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভয়ে রয়েছেন। অপরাধীদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিতে চাইলেও প্রতিশোধের আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।
জুবায়ের বলেন, ‘আমরা পুলিশকে অপরাধীদের তথ্য দিতে চাই, কিন্তু তথ্য দিলেই আমাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসে। সশস্ত্র গ্রুপগুলো সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকে। পুলিশ এলে তারা পাহাড়ে পালায়, পুলিশ চলে গেলে আবার এসে হুমকি দেয়। এখানে সাধারণ রোহিঙ্গারা অপরাধীদের কাছে জিম্মি।’
ক্যাম্পের ভেতরের সহিংসতার প্রভাব পড়ছে আশপাশের বাংলাদেশি জনপদেও। টেকনাফের লেদা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, সন্ধ্যার পর ওই এলাকার সড়কে চলাচল করতেই ভয় লাগে। রাত ৮টার পর এই সড়ক দিয়ে একা চলাফেরা করা যায় না। যেকোনো সময় অপহরণের শিকার হতে হয়। গত মাসেও আমাদের এক প্রতিবেশীকে পাহাড়ের ভেতর তুলে নিয়ে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। আমরা নিজেদের এলাকায় এখন পরবাসী।
উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিনের বসতবাড়ি কুতুপালং ক্যাম্পের কাছেই। তিনি বলেন, ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় অপরাধ বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমবাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। ক্যাম্পের সঙ্গে লাগোয়া এলাকায় নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি তারা স্থানীয়দের শ্রমবাজার দখল করছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।
৯ বছর আটকে আছে প্রত্যাবাসন
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পর প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা। এরপর কেটে গেছে প্রায় নয় বছর। দুই দফা প্রত্যাবাসনের দিনক্ষণ ঠিক হলেও শেষ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।
বরং সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে নতুন করে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। একই সময়ে ক্যাম্পগুলোতে জনসংখ্যা বেড়েছে। ফলে প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় থাকা জনগোষ্ঠীর আকার কমার বদলে আরও বেড়েছে।
এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আন্তর্জাতিক সহায়তাও আগের তুলনায় কমেছে। খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও জীবিকার মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে সংকট তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘদিনের বন্দিজীবন, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে অপরাধী চক্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহাবুবুর রহমানের দাবি, ক্যাম্পের বাইরেও জেলার বিভিন্ন অপরাধে রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ ও সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর। বাংলাদেশে সংস্থাটির প্রধান ইভো ফ্রেজেনের মতে, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও মানবিক সহায়তার ঘাটতি এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্যাম্পজীবন অপরাধ ও সহিংসতার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা যাবে না বলেও মনে করেন তিনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মানবিক সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য ক্যাম্পের ভেতরে উৎপাদনশীল ও আত্মনির্ভরশীল কাজের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, দীর্ঘদিন কাজের সুযোগ না থাকা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা অপরাধী চক্রকে তরুণদের টার্গেট করার সুযোগ করে দিচ্ছে।
হতাশাকে কাজে লাগাচ্ছে অপরাধী চক্র
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মনে করেন, দীর্ঘদিন প্রত্যাবাসন ঝুলে থাকায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। এই হতাশাকে কাজে লাগাচ্ছে অপরাধী চক্র।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ নয় বছর ধরে প্রত্যাবাসন ঝুলে থাকায় এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মাঝে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে। এই হতাশাকে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অপরাধী চক্র তাদের মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ক্যাম্পের নিরাপত্তা জোরদারে কাঁটাতারের বেষ্টনী ও সিসি ক্যামেরার আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ক্যাম্পগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সিরাজ আমিন বলেন, ‘ক্যাম্পগুলো অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং পাহাড়ঘেরা। একটি ব্লক থেকে অন্য ব্লকে কিংবা পাহাড়ে পালিয়ে গেলে অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াচ্ছি এবং নিয়মিত বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনা করছি। শিগগিরই যেকোনো অপরাধ নির্মূল করা হবে।’
এফডিএমএনে পুলিশের ডিআইজি মিয়া মাসুদ করিমও ক্যাম্পের ভৌগোলিক বাস্তবতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা ৩৩টি ক্যাম্পে বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে অপরাধীদের আলাদা করে চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ক্যাম্পের বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালো।