নদী-সাগরের ভাঙনে সর্বহারা শাহপরীর দ্বীপের বহু মানুষ

ঝুপরি ঘরের দুয়ারে সখিনা খাতুন

ঝুপরি ঘরের দুয়ারে সখিনা খাতুন © টিডিসি

সাগর ও নাফ নদের মাঝখানে বসবাস করা শাহপরীর দ্বীপের মানুষের কাছে বর্ষা মানেই নতুন আতঙ্ক। নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ে গত দেড় দশকে দেড় হাজারের বেশি ঘরবাড়ি বিলীন এবং প্রায় ১০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তবু ভিটেমাটি আঁকড়ে শত শত পরিবার প্রতিদিন নদী-সাগরের ভাঙন আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে।

সাগর ও নাফ নদের মাঝখানে ৩২ দশমিক ৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের শাহপরীর দ্বীপে ১৩টি গ্রামে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনে দেড় হাজারের বেশি ঘরবাড়ি নদী ও সাগরে বিলীন হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। অনেকেই উখিয়ার কুতুপালংসহ বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। তবে এখনও শত শত পরিবার নদী ও সাগরের কিনারায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।

একুল-ওকূল ঢেউ, মাঝখানে জীবনসংগ্রাম
নদীর পাড়ে জিও ব্যাগের ওপর বসে ছেলের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন বিধবা মোস্তফা খাতুন। পাশে ছিলেন তার চাচাতো বোন রেহেনা বেগম। মোস্তফা খাতুন বলেন, ‘৩০ বছর ধরে নদীর পাড়ে জীবনযুদ্ধ করছি। কত ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস গেছে, তবু বেঁচে আছি। ছেলে নদীতে মাছ ধরতে গেছে, আকাশে কালো মেঘ দেখলেই বুক কেঁপে ওঠে।’ তিনি বলেন, ‘শাহপরীর দ্বীপের এক পাশে নাফ নদী, অন্য পাশে সাগর। দুই দিকের ঢেউয়ের মাঝেই আমাদের জীবন। বর্ষা আর ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রতিটি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটে।’

নাফ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দূরে ভাসমান কয়েকটি মাছ ধরার নৌকার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সখিনা খাতুন। ওই নৌকাগুলোর আশপাশেই একসময় ছিল তার বসতভিটা, প্রতিবেশীদের ঘরবাড়ি আর শিশুদের কোলাহলে মুখর একটি জনপদ। আজ সেখানে শুধু নদীর ঢেউ। এভাবেই সাগর আর নাফ নদী ও সাগরের অবিরাম ভাঙনে গত দেড় দশকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের দেড় হাজারের বেশি ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। ভিটেমাটি হারিয়ে অসংখ্য পরিবার ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন এলাকায়। তবে যাওয়ার মতো আর কোথাও না থাকায় এখনও শত শত মানুষ নদী-সাগরর পাড় আঁকড়ে ধরে প্রতিদিন প্রকৃতির সঙ্গে বেঁচে থাকার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।

তেমনই একজন শাহপরীর দ্বীপ জালিয়াপাড়ার বাসিন্দা সখিনা খাতুন (৪০)। নাফ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দূরে ভাসমান কয়েকটি মাছ ধরার নৌকার দিকে আঙুল তুলে বলেন, ওই যে নৌকাগুলো দেখছেন, ঠিক সেখানেই একসময় প্রায় ৩০০ পরিবারের একটি পাড়া ছিল। ছিল ঘরবাড়ি, রাস্তঘাট, মানুষের কোলাহল। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে সেই পাড়া নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে ভাঙন আর থামেনি।

তিনি জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করছেন। এই সময়ে পাঁচবার বসতি হারিয়েছেন। তবুও দ্বীপ ছেড়ে যেতে পারেননি। “যাওয়ার মতো অন্য কোনো জায়গা নেই। তাই ভাঙনের ভয় নিয়েই প্রতিদিন বেঁচে থাকার যুদ্ধ করছি’ বলেন তিনি।

একই চিত্র আবুল কালামের জীবনেও। বর্তমানে তিনি নাফ নদীঘেঁষা বেড়িবাঁধের পাশে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। নদীর দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘একসময় ওই জায়গাতেই আমার বাড়ি ছিল। নদীর ভাঙনে সব হারিয়ে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছি। পরিবার নিয়ে আর কতদিন টিকে থাকতে পারব, জানি না। প্রতিদিনই অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছে।’

সাগর-নাফনদীর বাসিন্দারা বলছে, সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) অন্তর্ভুক্ত শাহপরীর দ্বীপ। এখানে ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ১৩টি গ্রামে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসতি। ভাঙনের কারণে গত দশ বছরে ১০ হাজারের মতো মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে চলে গেছেন। তাঁরা অনেকে টেকনাফ পৌরসভা, সদরের ছোট হাবিরপাড়া, মহেশখালীপাড়া, ডেইলপাড়া, সাবরাং, নয়াপাড়া, হ্নীলা, উখিয়ার পাইন্ন্যাসা, পালংখালী, কুতুপালংসহ বিভিন্ন গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন। বহু মানুষ কাজ হারিয়ে বেকার। এরপরও নদী-সাগরের অব্যাহত ভাঙনে শাহপরীর দ্বীপের মানুষের কাছে বর্ষা মানেই নতুন শঙ্কা। প্রতিটি জোয়ারে হারিয়ে যাওয়ার ভয়, প্রতিটি বর্ষণে নতুন করে ঘর হারানোর আশঙ্কা নিয়েই তাদের জীবন। নিরাপদ আশ্রয় ও স্থায়ী ভাঙনরোধী ব্যবস্থা ছাড়া এই জনপদের হাজারো মানুষের অনিশ্চয়তার শেষ কবে হবে সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য, শাহপরীর দ্বীপের পূর্বে নাফ নদী এবং পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দ্বীপটি দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে নদী ও সাগরভাঙনে দেড় থেকে দুই হাজারের বেশি পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। বিশেষ করে ২০১২ সালে পশ্চিম পাশের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর পশ্চিমপাড়া, জালিয়াপাড়া ও মাঝপাড়ার বড় অংশ সাগরে বিলীন হয়ে যায়। এরপর বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে উখিয়া ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নেয়।

তাদেরই একজন মনোয়ারা বেগম। সমুদ্রভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে তিনি কুতুপালং এলাকার পাশে আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, ‘সব হারিয়ে বাধ্য হয়ে এখানে চলে আসি। পরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প গড়ে ওঠে। নতুন জায়গায় থেকেও আগের জীবন আর ফিরে পাইনি।’

ডেইলপাড়া গ্রামে আশ্রয় নেওয়া আব্দুল আমিন বলেন, ‘দ্বীপে থাকতে আধা ঘণ্টা মাছ ধরেই চার-পাঁচশ টাকা আয় হতো। এখন সেই সুযোগ নেই। ঘরবাড়ি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে জীবিকাও হারিয়েছি। অনেক কষ্টে সংসার চলছে।’

সাগরে ভাঙনের নির্মম শিকার হয়েছেন সাবেক ইউপি সদস্য নুরুল আমিনও। ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করা এই ব্যক্তি একসময় আট একর আবাদি জমির মালিক ছিলেন। এখন তিনি আশ্রিত জীবন কাটাচ্ছেন।

নুরুল আমিন বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের দুটি পাড়া সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় ৩০০ পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। অনেকেই নিঃস্ব হয়ে অন্যত্র চলে গেছে। আমার নিজের ভিটেমাটি আর আট একর চাষের জমিও সাগরে তলিয়ে গেছে। একসময় মানুষের প্রতিনিধি ছিলাম, আজ আমি সর্বহারা।’

টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপের ইউপি ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুস সালাম বলেন, তার ওয়ার্ডে এখনও প্রায় ৫০০ মানুষ নদীর পাড়ে চরম ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। এরই মধ্যে প্রায় ৩০০টি ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। তিনি ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে দ্রুত সরকারি উদ্যোগের দাবি জানান।

এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, শাহপরীর দ্বীপের নদী ও সাগরপাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফুটপাত উচ্ছেদকালে ঘুষ দাবি করে গণধোলাই খেলেন ম্যাজিস্ট্রেট
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
খালের ওপর অনুমোদনহীন কোচিং সেন্টার, পাটাতন ভেঙে আহত ৩০ শিক্…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
কিউএস এশিয়া র‍্যাঙ্কিংয়ে আবারও দেশসেরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
৮ ঘণ্টার বৈঠকে ২৩ নেতার মতামত, তবুও এমপি আজিজের বিষয়ে যে সি…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
ট্যাব পাচ্ছেন প্রাথমিকের ৩ লাখ ৮৩ হাজার শিক্ষক
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
এনএসইউতে অনুষ্ঠিত হলো ‘ফল ২০২৬ গ্র্যাজুয়েট কলক্যুয়াম সিরিজ’
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950