নেত্রকোনা মডেল থানা © সংগৃহীত
নেত্রকোনা শহরের জয়নগর এলাকায় ভাড়া বাসা থেকে স্বর্ণা আক্তার (২৫) নামের এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে স্বর্ণার হাতে লেখা একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, স্বামীর সঙ্গে পারিবারিক কলহ ও অভিমানের জেরে তিনি আত্মহত্যা করেছেন।
রবিবার (৯ আগস্ট) সকালে ঘরের জানালার গ্রিলের সঙ্গে ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় তার মরদেহ পাওয়া যায়।
নিহত স্বর্ণা আক্তার নেত্রকোনা সদরের দক্ষিণকাটলি এলাকার নাজমুল হাসান নাহিদের স্ত্রী। স্বামীর সঙ্গে তিনি জয়নগর এলাকায় ওই বাসায় ভাড়ায় বসবাস করতেন।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সম্প্রতি স্বামী নাজমুলের সঙ্গে স্বর্ণার মনোমালিন্য চলছিল। শনিবার দিবাগত রাত বা রবিবার ভোরের কোনো এক সময় স্বামীর সঙ্গে অভিমান করে তিনি নিজের শোবার ঘরের দরজা ভেতর থেকে আটকে দেন। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও সকাল ৯টার দিকে ভেতর থেকে কোনো সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। ডাকাডাকি করেও কোনো উত্তর না পেয়ে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয় এবং তারা তাৎক্ষণিকভাবে নেত্রকোনা মডেল থানা পুলিশকে খবর দেন।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় পুলিশ। দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকির পরও দরজা না খোলায় একপর্যায়ে পুলিশ দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় ঘরের জানালার গ্রিলের সঙ্গে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় স্বর্ণার নিথর দেহ ঝুলতে দেখা যায়।
মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘরের ভেতর তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ ডায়েরির পাতায় স্বর্ণার নিজ হাতে লেখা একটি চিরকুট (সুইসাইড নোট) উদ্ধার করে। চিরকুটটিতে মায়ের প্রতি ভালোবাসা, স্বামীর প্রতি তীব্র অভিমান এবং সবশেষে স্বামীকে নির্দোষ দাবি করার মতো এক অদ্ভুত মানসিক দ্বন্দ্ব ও বেদনার ছাপ স্পষ্ট।
চিরকুটের শুরুতে তিনি লিখেছেন, ‘আসসালামু আলাইকুম। প্রিয় মা, বাবা, ভাই এবং সকল আত্মীয় স্বজন সবার প্রতি আমার ভালো বাসা এবং আন্তরিকতা রইল। প্রিয়, মা আমি পারলাম না তুমার সেবা করতে তুমার কোনো উপকারে আসতে তুমার কষ্টের প্রতিদান দিতে আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও। সবার কাছে আমি মাফ চাই।’
স্বামীর দেওয়া প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ নিয়ে অভিমান করে তিনি লেখেন, ‘মাগো গোপনে ইবাদত মানুষকে উজ্জ্বল করে আর গোপনে পাপ মানুষকে ধ্বংস করে। নাজমুল ওর সাথে যখন কথা হয়েছিল, তখন ও-বলেছিল সব ও-দেখবে আমাকে কোনদিন কষ্ট দিবে না। কিন্তু ওর ওই কথা সব মিথ্যা ছিল। আমার কারনে আমি আমার মাকে অপমানিত হতে দিব না।’
তবে এত আক্ষেপের পরও স্বামীর প্রতি ভালোবাসার কথা জানিয়ে তাকে দোষারোপ না করার অনুরোধ করেছেন স্বর্ণা। তিনি লেখেন, ‘ও-আমাকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছে তার জন্য আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ। তাকে তোমরা কোনো দোষ দিওনা।’
সবশেষে নিজের মরদেহের বিষয়ে আকুতি জানিয়ে ওই গৃহবধূ লেখেন, ‘আমাকে পোস্ট মর্টাম করাইও না। আমাকে সরাপাড়া কবর দিও…।’
নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ঝুলন্ত অবস্থায় গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করি। সেখানে তার নিজের লেখা একটি চিরকুট পাওয়া গেছে। চিরকুটের বক্তব্য অনুযায়ী এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, স্বামীর সঙ্গে অভিমান করেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।’
ওসি আরও বলেণ, ‘নিহত গৃহবধূ চিরকুটে ময়নাতদন্ত না করার অনুরোধ জানালেও, যেহেতু এটি অস্বাভাবিক মৃত্যু, তাই আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়েরসহ পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।’