আজ বিশ্ব সাপ দিবস
সাপের খামারে উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক © টিডিসি ফটো
বিশ্বজুড়ে ১৬ জুলাই পালিত হয় সাপ দিবস। সাপ সম্পর্কে মানুষের ভ্রান্ত ভয় দূর করা এবং প্রকৃতির জন্য সাপের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করাই এ দিবস পালনের উদ্দেশ্য। ওষুধ তৈরির অন্যতম কাঁচামাল হিসেবে বিশেষ কার্যকারিতা রয়েছে সাপের বিষের। তাই গবেষকদের কাছে এর গুরুত্বও অপরিসীম। অথচ বাংলাদেশে বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে সাপের বিষ আমদানি করা হয়।
দেশেই মিলতে পারে অ্যান্টিভেনম তৈরির কাঁচামাল। কমতে পারে আমদানিনির্ভরতা, সাশ্রয় হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা। অথচ সরকারি নিবন্ধন পাওয়ার পরও থমকে আছে দেশের একমাত্র বাণিজ্যিক স্নেক ভেনম (সাপের বিষ) ফার্ম। সরকার ও ওষুধ কোম্পানিগুলোর সহযোগিতা না পাওয়ায় এগোতে পারছে না সাপের বিষের এই বাণিজ্যিক খামার।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামে ২০০০ সালে প্রবাসী আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করেন স্নেক ভেনম ফার্মটি। দীর্ঘ ২৬ বছর নানা আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন পেয়েছে তাঁর খামার। ফলে বৈধভাবে বিষধর সাপ থেকে ভেনম সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে রাজ্জাকের খামারে কিং কোবরা, কালো গোখরা, পঙ্খীরাজ, কালকেউটে, পদ্মগোখরা, সাদা গোমা, বিষঝুড়ি, পাইথন ও দাঁড়াশসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় আড়াই শতাধিক সাপ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নিরাপত্তাবেষ্টিত খাঁচাগুলোতে রাখা হয়েছে কিং কোবরা, কালো গোখরা, কালকেউটে, পঙ্খীরাজ, পদ্মগোখরাসহ পাঁচ প্রজাতির বিষধর ও অবিষধর মিলিয়ে প্রায় আড়াই শতাধিক সাপ। প্রতিটি খাঁচার সামনে রয়েছে পরিচিতিমূলক তথ্য। খামারের কর্মীরা নিয়মিত সাপগুলোর পরিচর্যা করছেন।
খামারের প্রতিষ্ঠাতা রাজ্জাক বিশ্বাস জানান, দীর্ঘদিন সৌদি আরবে প্রবাসজীবন কাটানোর সময়ই তাঁর মাথায় সাপের খামার গড়ে তোলার ধারণা আসে। দেশে ফিরে ২০০০ সালে নিজ বাড়ির সামনে একটি গোখরা সাপ ও ২০টি ডিম দিয়ে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তাঁর খামারে ২৫০টিরও বেশি বিষধর ও অবিষধর সাপ রয়েছে।
তিনি আরও জানান, টানা ২৬ বছর ধরে খামার পরিচালনা করলেও চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে দেশের একমাত্র অনুমোদিত সাপের খামার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ে প্রবাসে উপার্জিত অর্থ এবং বাবার সম্পদ বিক্রি করে খামারের পেছনে এক কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করেছেন।
রাজ্জাক বিশ্বাসের অভিযোগ, অনুমোদন পেতে বছরের পর বছর বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হয়েছে। অবশেষে অনুমোদন মিললেও বর্তমানে সরকারিভাবে কোনো আর্থিক বা কারিগরি সহযোগিতা পাচ্ছেন না। ফলে এই উদ্যোগ এখন আর্থিক সংকটে রয়েছে। খামার পরিচালনা, সাপের পরিচর্যা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রতি মাসেই উল্লেখযোগ্য ব্যয় হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে কর্মীদের নিয়মিত বেতন দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
খামারটির উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস বলেন, প্রতি মাসে প্রায় এক পাউন্ড সাপের বিষ সংগ্রহ করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজারে যার মূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা। তবে কাঁচা ভেনম সরাসরি বিক্রি করা যায় না। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তা পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাত করে ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করতে হয়। নিবন্ধন পাওয়ার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো ওষুধ কোম্পানি এখনো এ বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি। দেশীয় সাপের বিষ ব্যবহার করে অ্যান্টিভেনম উৎপাদন শুরু হলে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির প্রয়োজন অনেকটাই কমবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
খামারের কর্মী হৃদয় বলেন, ‘মালিকের আর্থিক সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বেতন পাই না। মানুষের বাড়িতে সাপ থাকলে আমাদের খবর দেওয়া হয়। তখন গিয়ে সাপ উদ্ধার করলে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পাই। ওই টাকাতেই জীবনযাপন করি। আমাদের খামারটি বড় পরিসরে পরিচালিত হলে কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে।’
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘খামারটিকে ভেনম সংগ্রহের জন্য নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। তবে সংগৃহীত ভেনম সরাসরি বিক্রি করা যাবে না। নির্ধারিত মান ও অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত করার পর তা ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা সম্ভব।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২৭ লাখ মানুষের শরীরে বিষক্রিয়া দেখা দেয় এবং ৮১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশেও প্রতি বছর হাজারো মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন, বিশেষ করে উপকূলীয় ও গ্রামীণ এলাকায়।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পটুয়াখালী জেলায় সাপের কামড়ে আক্রান্ত ১০২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে জেলায় অ্যান্টিভেনমের ৯০ ভায়াল মজুত রয়েছে।
পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, ‘বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসে পানি বৃদ্ধি পেলে উপকূলীয় এলাকায় সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। এ ধরনের রোগীর চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ হলো অ্যান্টিভেনম, যা বর্তমানে সম্পূর্ণ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আমাদের এখানে একটি অনুমোদিত সাপের খামার রয়েছে, যেখানে সাপের বিষ সংগ্রহ করা সম্ভব। তবে সেই বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন উন্নত গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত অবকাঠামো। এ কারণে দেশের বড় বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ খাতে এগিয়ে আসতে হবে।’
সিভিল সার্জন আরও বলেন, ‘সাপের খামার কর্তৃপক্ষ যদি আমার কাছে আবেদন করেন, তাহলে আমি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করব।’
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান বলেন, ‘বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে সাপের বিষ (ভেনম) সংগ্রহের উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। দেশে উৎপাদিত ভেনমের মাধ্যমে অ্যান্টিভেনম তৈরির কাঁচামাল নিশ্চিত করা গেলে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং সাপে কাটা রোগীদের দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করা সহজ হবে। এ বিষয়ে সরকার এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। তবে এ ধরনের খামার পরিচালনায় সর্বোচ্চ জৈবনিরাপত্তা (biosafety), প্রাণিকল্যাণ নীতি, প্রশিক্ষিত জনবল এবং সরকারি তদারকি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও ওষুধ শিল্পের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই খাতকে এগিয়ে নেওয়া গেলে বাংলাদেশে অ্যান্টিভেনম গবেষণা ও উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।’