নিখোঁজ আক্কাস © সংগৃহীত
সংসারের অভাব, মাথার ওপর ঋণের চাপ আর ভবিষ্যতে একটি অটো (বোরাক) কেনার স্বপ্ন—এই তিনটি কারণই ২৫ বছর বয়সী মো. আক্কাসকে প্রথমবারের মতো গভীর সাগরে মাছ ধরতে যেতে হয়েছিল। কিন্তু সেই যাত্রাই যেন হয়ে উঠল জীবনের শেষ যাত্রা। বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবির প্রায় তিন দিন পার হলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন আক্কাসসহ ছয় জেলে।
গত রবিবার (০৫ জুলাই) রাতে কুয়াকাটা উপকূল থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে উত্তাল সাগরে প্রবল স্রোত ও কয়েক মিটার উচ্চতার ঢেউয়ের আঘাতে একটি মাছ ধরার ট্রলার উল্টে যায়।
ট্রলারে থাকা ১১ জেলের মধ্যে দুজন বাইরে থাকলেও বাকি নয়জন ট্রলারের ভেতরে আটকা পড়েন। পরে তাদের মধ্যে ছয়জন বের হতে সক্ষম হলেও তিনজন আর বের হতে পারেননি।
এ ঘটনায় পাঁচজনকে অন্য একটি জেলে ট্রলার জীবিত উদ্ধার করা করলেও আক্কাসসহ ছয়জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজরা হলেন— এমাদুল খাঁ (৪৫), হারুন হাওলাদার (৪৫), ফোরকান সিকদার (৫৫), সায়েম (২০), আল-আমিন (২২) ও মো. আক্কাস (২৫)।
গলাচিপা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চৌরাস্তা মসজিদসংলগ্ন আক্কাসের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, এখন শুধুই অপেক্ষা আর কান্না। মা শাহানাজ বেগম বারবার সন্তানের ফেরার আশায় চোখের পানি ফেলছেন। স্ত্রী প্রাপ্তি বেগম স্বামীর শোকে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। আর সাড়ে তিন বছরের ছেলে আলভি বুঝতেই পারছে না কী ঘটেছে। সে শুধু তার নানাকে ফোন করে বারবার বলছে, “বাবাকে নিয়ে আসো।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আক্কাসের বাবার মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ঢাকায় একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন তিনি। পরে গলাচিপা উপজেলার সদর ইউনিয়নের পক্ষিয়া গ্রামে নানাবাড়ির সুবাদে সেখানে বসবাস শুরু করেন। ছয় বছর আগে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার মরহুম নাসির উদ্দীনের ছেলে আক্কাস রাঙ্গাবালী উপজেলার বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের হানিফ মিয়ার মেয়ে প্রাপ্তিকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে আলভি নামে সাড়ে তিন বছরের একটি ছেলে রয়েছে।
আক্কাসের খালা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোসা. ফারআনা জানান, ঋণের প্রায় ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ এবং একটি বোরাক কেনার স্বপ্ন থেকেই প্রথমবার জেলেদের সাথে মাছ ধরার ট্রলারে যোগ দেন আক্কাস। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, প্রথম সমুদ্রযাত্রাই তাকে নিখোঁজের তালিকায় ঠাঁই করে দিয়েছে।
স্ত্রী প্রাপ্তি বেগম বলেন, অভাবের কারণে আর কোনো উপায় ছিল না। লোনের টাকা শোধ করতে প্রথমবার সাগরে গিয়েছিল। ও ভালোভাবে সাঁতারও জানত না। এখন শুধু আল্লাহর কাছে চাই, অন্তত ওর একটা খোঁজ যেন পাই।
শ্বশুর হানিফ মিয়া জানান, নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর থেকেই তিনি কুয়াকাটা উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় ছুটে বেড়াচ্ছেন। গঙ্গামতি, হাসাখালী, চাপালীসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও এখন পর্যন্ত জামাইয়ের কোনো সন্ধান মেলেনি।
দিন যত গড়াচ্ছে, পরিবারের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। এখন স্বজনদের একটাই আকুতি—যদি জীবিত না-ও ফেরে, অন্তত যেন আক্কাসের মরদেহটি ফিরে পাওয়া যায়।
কুয়াকাটা নৌ-পুলিশের ইন্সপেক্টর মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বৈরি আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তারপরও নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার কার্যক্রমের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রশাসন পাশে রয়েছে।