সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা © টিডিসি
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে হেযবুত তওহীদের দুই সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করা ঘটনায় ১০ বছর পেরিয়েও বিচার না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছেন। চাষীরহাট পোরকরা শহীদি জামে মসজিদ কমপ্লেক্সে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তারা দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার ও সুষ্ঠু বিচারের জন্য চাপ দিয়েছেন।
শনিবার (১৪ মার্চ) বেলা ১১টায় উপজেলার চাষীরহাট পোরকরা শহীদি জামে মসজিদ কমপ্লেক্সের হলরুমে এ ঘটনার মামলা সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিচারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
এ সময় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন হেযবুত তওহীদের সর্বোচ্চ নেতা হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। এ সময় তিনি ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ সোনাইমুড়ীর পোরকরা গ্রামের হেযবুত তওহীদের সদস্যদের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও দুই সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা বিবরণ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী মব সৃষ্টি করে, মিথ্যা বানোয়াট তথ্য দিয়ে অপপ্রচার ছড়িয়ে ও গুজব রটনা করে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে উস্কানি দিয়ে আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় বাড়ির আঙ্গিনায় নির্মাণাধীন মসজিদকে গির্জা আখ্যা দিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে ধ্বংস করে দেয়। সংগঠনের কয়েকজন সদস্যের বাড়ির মালামাল লুটপাট চালিয়ে পরে একে একে সব বাড়িতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। এসময় তারা ১৮টি মোটরসাইকেল, গোলার ধান, গবাদি পশুসহ সব কিছু বাড়ির সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে যায়।’
মব সৃষ্টি করে দিনে-দুপুরে তার দুই সদস্যকে কীভাবে হত্যা করেছে সেই বর্ণনা তুলে ধরে মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘মসজিদ নির্মাণ করতে আসা হেযবুত তওহীদের দুইজন সদস্য রুবেল ও খোকনকে প্রকাশ্যে নির্মমভাবে জবাই করে হত্যা করা হয়। এ সময় তাদের চোখ তুলে নেওয়া হয়। এছাড়াও তাদের হাত ও পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। মৃত্যু নিশ্চিত করে লাশ পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়।’
নৃশংস এই হত্যার ঘটনায় গত ১০ বছরেও কোনো বিচার হয়নি বলে দাবি করেন মোহাম্মদ সেলিম। তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ২ বছর পর বিগত সরকারের আমলে একটি মামলা হয়। সেই মামলায় যাদেরকে আসামী করা হয় তাদের অধিকাংশই আইনের আওতায় আসেনি। তাদের গ্রেফতার করা হয়নি, এমনকি একজন মানুষকেও রিমান্ডে আনা হয়নি। আসামিরা তখন থেকে এখনো হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। আর ভুক্তভোগীরা বিচারের আশায় প্রতিনিয়ত আদালতের বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, কোনো বিচার নেই।’
ন্যায় বিচারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অতি সম্প্রতি আমরা জানতে পেরেছি সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় কিছু মামলাকে প্রত্যাহারের আদেশ দিয়েছেন। যার মধ্যে এই ঘটনায় দায়েরকৃত জি আর- ৬১৭/১৬, জি আর- ৮১২/১৬, জি আর- ৬৮১-১৬, জি আর- ৮৬৬/১৬ মামলাগুলি অন্তর্ভুক্ত। আমাদের বক্তব্য হলো, একটা ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্যে। কারা জবাই করেছে, কারা অর্থ দিয়েছে, কারা মিছিল করে এসে হামলা চালিয়েছে তার প্রমান আমাদের কাছে রয়েছে। সেসকল ছবি, ভিডিও, অডিও তাদের নাম ঠিকানা সহ আমরা আদালতে জমা দিয়েছি। এই ধরনের আসামীদেরকে কোনভাবেই ছাড় দেওয়ার কোন সুযোগ নেই, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে ন্যায় বিচার, মানবাধিকার, আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত হবে।’
বিচারের কোন লক্ষণ নেই উল্লেখ করে মোহাম্মদ সেলিম আরও বলেন, ‘‘এখন পর্যন্ত মামলার প্রকৃত কার্যক্রম শুরু হয়নি। আজকের এই সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের সামনে আমরা প্রথমত এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমরা আসামীদেরকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি দেওয়ার আবেদন করছি। আমাদের ভূক্তভোগী পরিবারকে এখন পর্যন্ত কোন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি, তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনা যেন পরবর্তীতে না ঘটে সে বিষয়ে জোর দাবি জানাচ্ছি।’’
হিযবুত তওহীদের এই নেতা বলেন, ‘হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের পরেও এই এলাকায় নানা উন্নয়ন প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। মসজিদ, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী, স্কুল, হাসপাতাল, খামারসহ অন্তত ৪২টি উন্নয়ন প্রকল্পে এখানে হাজার হাজার মানুষ কাজ করছেন। তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে।’
আবার হামলার ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এখনো সেই উগ্রবাদী ধর্ম ব্যবসায়ী গোষ্ঠীটি বিভিন্ন সময় এই এলাকার আশেপাশে বেআইনি সমাবেশ করে হামলার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উস্কানি দিয়ে যাচ্ছে।’ যারা এগুলো করছে সংবাদ সম্মেলন থেকে তাদেরকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে জান মালের নিরাপত্তা দাবি জানানে হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জেলার বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার গণমাধ্যমকর্মীসহ হিযবুত তওহীদের নিহত দুই সদস্য রুবেল, সোলায়মান খোকনের পরিবারের সদস্য ও ঘটনার দিনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।