লোহালিয়া সেতুর বাতিগুলো অচল। হেড লাইট জ্বালিয়ে চলছে গাড়ি © টিডিসি
পটুয়াখালীর জেলা শহরকে বাউফল, দশমিনা ও গলাচিপা উপজেলার সঙ্গে সংযুক্ত করা লোহালিয়া সেতুর অধিকাংশ লাইট অচল হয়ে পড়ায় সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা ডুবে থাকে অন্ধকারে। এই সুযোগে সেতু ও সংযোগ সড়কে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ছিনতাই চক্র, ফলে প্রতিনিয়ত আতঙ্ক ও ভোগান্তিতে পড়ছেন পথচারী ও যানবাহনের চালকরা।
উদ্বোধনের মাত্র দুই বছরেই সেতুর আলোকসজ্জা ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যা নামলেই সেতু ও আশপাশের সড়কে নেমে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এ সুযোগে সেতু ও সংযোগ সড়ককে আধিপত্য গড়ে তুলেছে ছিনতাই চক্রের সদস্যরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, লোহালিয়া সেতুতে মোট ৬১টি ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন আছে। এর মধ্যে আধো আলো জ্বলছে মাত্র ১৫টি ল্যাম্পে। বাকি ৪৬টি ল্যাম্প অচল অবস্থায় আছে। ফলে সেতুর অধিকাংশ স্থান অন্ধকারে ঢেকে থাকে। এতে চরম ভোগান্তিতে ও বিপদে পড়ছেন পথচারীরা।
পথচারী ও স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যা নামলেই সেতু ও আশপাশের সড়কে ছিনতাই চক্রের তৎপরতা বেড়ে যায়। ছিনতাইকারী চক্র সড়কে গাছ ফেলে যানবাহন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। পরে যানবাহন থামলে চালক ও যাত্রীদের সবকিছু লুটে নেয়।
এই পথে নিয়মিত ভাড়ায় চলাচল করা মোটরসাইকেল চালকরা জানান, তাদের জন্য সন্ধ্যার পর পথটি খুব ভয়ংকর হয়ে ওঠে। প্রতিদিন কেউ না কেউ ছিনতাইকারীর কবলে পড়ছেন। সেতু উদ্বোধনের সময় ল্যাম্পগুলো সচল ছিল। আলোর কারণে দূর থেকে সবকিছু দেখা যেত, তাই ছিনতাই করার সাহস পেতেন না অপরাধীরা। তবে মাত্র দুই বছরের মধ্যেই প্রায় সব ল্যাম্প নষ্ট হওয়ায় ছিনতাইকারীদের রাজত্ব চলছে সেতু ও সেতুর আশপাশের এলাকায়।
অভিযোগ রয়েছে, এ পথে ছিনতাইয়ের হাত ভিক্ষুকও রক্ষা পায়নি। ভিক্ষার টাকায় জীবন যাপন করা বৃদ্ধ মনির বলেন, ‘একদিন বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে যায়। রাত ১১টার দিকে তিন চাকার অটোরিকশায় বাড়ি যাচ্ছিলাম। সেতুর সংযোগ সড়কে ১০ থেকে ১২ জনের একটি ছিনতাইকারী দল দেশীয় অস্ত্র দেখিয়ে অটোরিকশা থামায় এবং অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আমার সারা দিনের উপার্জিত টাকা ছিনিয়ে নেয়।’
এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে সেতু-সংলগ্ন ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন পটুয়াখালীর তিন সাংবাদিক। সাংবাদিক এ জেড এম উজ্জ্বল, হেলাল উদ্দিন রিপন ও আরিফ হোসেন টিটু পেশাগত কাজ শেষে ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা জানান, সড়কে একটি গাছ ফেলে পথরোধ করা হয়। গাড়ি থামাতেই ৫-৬ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল দেশীয় অস্ত্র ঠেকিয়ে তাদের চারটি মোবাইল ফোন ও নগদ অর্থ ছিনিয়ে নেয়। একই সময় দুইটি মিনি ট্রাকের চালক ও দুজন ব্যাংক কর্মকর্তারও ছিনতাইর শিকার হন। এ ঘটনায় সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা।
স্থানীয়রা জানান, সেতু ঘিরে ছিনতাই শুরু হলেও বর্তমানে কাশিপুর বাজার পর্যন্ত অন্ধকার সড়কের কয়েকটি স্থানে নিয়মিত ছিনতাইর ঘটনা ঘটছে। সেতুর ল্যাম্প নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের ফলেই এই পরিণতি হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
পটুয়াখালী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হোসেন আলী মীর বলেন, লোহালিয়া সেতুর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ২০২২ সালে নির্মাণ কাজ শেষ করেছে। পরে চুক্তি অনুযায়ী তারা এক বছর সঠিক ভাবে সেতুর রক্ষণাবেক্ষণও করেছেন। তবে বর্তমানে সেতুর কিছু লাইট অকেজো অবস্থায় আছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং বরাদ্দ পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে সবগুলো লাইট সচল করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পটুয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) সাজেদুল ইসলাম সজল বলেন, ‘লোহালিয়া সেতু হয়ে বাউফল ও দশমিনা যাওয়ার সড়ক নির্জন হওয়ায় অপরাধীরা সুযোগ নিচ্ছে। আমরা সেখানে পুলিশের নিয়মিত টহল বাড়িয়েছি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাতে পুলিশের দুটি দল নিয়মিত পেট্রোলিং করে। ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত একজনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে চক্রের সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’