বিরিয়ানি ভর্তি প্লেট হাতে বিক্রেতা। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মইজ্জ্যারটেক এলাকায় © টিডিসি
রমজান শুরু হলেই উপকূলঘেঁষা চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলীতে ঐতিহ্যবাহী ওরশ বিরিয়ানির কদর বেড়ে যায়। ইফতারের আগে দুই উপজেলার ইফতারের বাজারে যেমন বাড়তি কোলাহল, তেমনি ইফতারের পর বড় বড় ডেগে ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানির গন্ধ জানান দেয়, ওরশ বিরিয়ানির মৌসুম এসে গেছে।
বিভিন্ন দরগাহ ও মাজারকেন্দ্রিক এলাকায় নয়, উপজেলার বিভিন্ন বাজার ও হোটেল-রেস্তোঁরাগুলোতে রমজানজুড়ে ওরশ বিরিয়ানির আয়োজন বরাবরের মতোই আছে। সন্ধ্যার পর থেকে এসব দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁয় দেখা যায় ভোজনরসিকদের ভিড়। বিশেষ করে দুই উপজেলার বিভিন্ন বাজারগুলোতে ইফতারের আগে থেকেই বিরিয়ানির জন্য দোকানে দীর্ঘ লাইন পড়ে।
সরেজমিনে শুক্রবার সন্ধ্যায় আনোয়ারার জাইল্ল্যা ঘাটা, চায়না রোড ও কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেক এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ইফতারের আগেই ওরশ বিরিয়ানির দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় জমতে শুরু করেছে। বড় বড় ডেগে একের পর এক বিরিয়ানি নামানো হচ্ছে, কেউ খাচ্ছেন দোকানে বসে, আবার অনেকে পরিবার ও বিতরণের জন্য প্যাকেট করে নিয়ে যাচ্ছেন।
ওরশের ঐতিহ্য থেকে বাণিজ্যিক বিস্তার লাভ করেছে এই সুস্বাদু খাবার।স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় ওরশ মাহফিল ঘিরে হাজারো মানুষের জন্য বড় ডেগে রান্না হতো এই বিরিয়ানি। সেই বিরিয়ানিকে ব্যবসায়িকভাবে রূপ দেওয়ার পর থেকে এটির চাহিদাও বাড়তে থাকে। এই ধারাবাহিকতায় রমজানে মসজিদ-মাদ্রাসা ও দরগাহে খাবার বিতরণের রেওয়াজও গড়ে ওঠে। এখন অনেকেই বিরিয়ানির দোকানগুলোতে পরিবারে ইফতার কিংবা সেহরির জন্য বড় অর্ডার দেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদা তো আছেই। সেই সঙ্গে চাহিদাও বাড়ছে। চাল ও মাংসের দাম বেড়েছে। তবু মান বজায় রাখতেই চেষ্টা করছেন তারা। কারণ, রমজানে একবার স্বাদে ঘাটতি হলে ক্রেতা হারানোর আশঙ্কা থাকে।
কর্ণফুলীর আকাশ ওরশ বিরিয়ানির স্বত্বাধিকারী মো. আকাশ বলেন, বছরের অন্য সময় যেখানে প্রতিদিন ৩-৪ ডেগ রান্না হয়, রমজানে সেখানে ৮-১০ ডেগ পর্যন্ত রান্না করতে হয়। বিশেষ করে জুমার দিন বিক্রি দ্বিগুণ হয় যায়।
বার আউলিয়া ওরশ বিরিয়ানির স্বত্বাধিকারী মো. তারেক বলেন, ‘রমজানের প্রথম দিনে ৩ ও দ্বিতীয় দিনে ৪ডেকসি ওরস বিরানী রান্না করেছি। সেহেরী পযর্ন্ত বিক্রি করছি। রমজানের শুরু থেকে একটু কম, পরে আরও বাড়বে বলে আশা করছি। তবে আমাদের খাবারের মান ১০০% টিক রাখার চেষ্টা করতেছি।’
ওরশ বিরিয়ানির বৈশিষ্ট্য হলো বড় দানার সুগন্ধি চাল, নরম গরুর মাংস আর মসলার ঘন মিশ্রণ। স্থানীয় রাঁধুনিরা জানান, ডেগে ধীরে দমে রান্না করার কারণে স্বাদে আলাদা গভীরতা আসে। অনেক দোকানেই রয়েছে নিজস্ব গোপন রেসিপি।
কর্ণফুলীর মইজ্যারটেক এলাকার এক ক্রেতা বলেন, ‘রমজানে অন্তত একদিন পরিবারের সবাই মিলে ওরশ বিরিয়ানি খাই। ইফতারের টেবিলে এটা না থাকলে যেন পূর্ণতা আসে না।’
চায়না রোডের বার আউলিয়া ওরশ বিরিয়ানিতে খেতে আসা শাহরিয়ার আমিন রফিক বলেন, ‘ওরশ বিরিয়ানির জন্য আলাদা একটা টান কাজ করে। এখানে স্বাদ যেমন পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে, তেমনি পরিমাণ ও মানও ভালো। রাতে পরিবার নিয়ে খাওয়ার জন্য এটা আমাদের প্রথম পছন্দ।’
অন্যজন শহিদুল হাসান শাওন বলেন, ‘আমার ছোট ছেলে বায়না করেছে বিরিয়ানি খাবে। তাই পরিবারের সবার জন্য বিরিয়ানি নিতে এসেছি। এখানকার বিরিয়ানির একটা আলাদা ঐতিহ্য যেমন আছে, তেমনি খাবারের মান-পরিমাণও ভালো।’
হাজীগাঁও এলাকা বাবুর্চি মো. হোসেন বলেন, ‘রোজার দিনে দুপুর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হয়। বড় ডেগে রান্না করতে অভিজ্ঞতা লাগে। তবু রমজানের এই ব্যস্ততাই আমাদের জন্য বছরের সেরা সময়।’
আনোয়ারা ও কর্ণফুলী অঞ্চলে ওরশ বিরিয়ানি শুধু ব্যবসা নয়, এটি বর্তমানে সামাজিক সম্প্রীতির এক অনুষঙ্গ হিসেবে পরিণত হয়েছে। অনেক প্রবাসী পরিবার রমজানে গ্রামের মসজিদে বিতরণের জন্য অর্থ পাঠান। স্থানীয় তরুণরাও স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নেন রান্না ও পরিবেশনে।
খাবারের মান প্রসঙ্গে দুই উপজেলা প্রশাসন জানায়, রমজানকে ঘিরে খাদ্যপণ্যের মান ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে নিয়মিত বাজার তদারকি করা হচ্ছে। কোথাও অনিয়ম বা অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানতে চাইলে সজীব কান্তি রুদ্র, কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, ‘রমজান মাসে খাদ্য নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ওরশ বিরিয়ানি ও ইফতার সামগ্রী প্রস্তুতের ক্ষেত্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় আমরা কোনো ছাড় দিচ্ছি না।’
অন্যদিকে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘রমজান উপলক্ষে উপজেলার বাজারগুলোতে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও তদারকি জোরদার করা হয়েছে। খাদ্যের মান, দাম ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। কেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রমজানের সন্ধ্যা-রাতে তাই আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর বাজারগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে মসলার ঘ্রাণ। ঢাকনা উল্টালেই ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে যায় ঐতিহ্যের সুবাস, যা জানিয়ে দেয়, রমজান মানেই ওরশ বিরিয়ানির বাড়তি আমেজ।