ভাষাসৈনিক সৈয়দ আশরাফ হোসেন পরিবারের সদস্যরা সমাধি কমপ্লেক্স নির্মাণ, স্মৃতিফলক স্থাপন ও একটি স্মৃতি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন (ইনসেটে সৈয়দ আশরাফ হোসেন) © টিডিসি
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ঢাকার রাজপথে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বের হওয়া মিছিলে দ্বিতীয় সারিতে ছিলেন ভাষাসৈনিক সৈয়দ আশরাফ হোসেন। মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত তার সহযোদ্ধা শহীদ সেলিমের রক্তমাখা জামা তিনি সংরক্ষণ করেছিলেন। পরে তিনি পটুয়াখালী জুবলি স্কুল মাঠে ভাষা আন্দোলনের প্রথম জনসভায় সেই রক্তমাখা জামা জনসম্মুখে তুলে ধরে ভাষণ দেওয়ার মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের চেতনা ছড়িয়ে দেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি ছিলেন সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সংগঠক। বাংলা ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার পরও এ মহান ব্যক্তির সমাধিস্থল আজ চরম অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে রয়েছে। তার স্মৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্র কিংবা স্থানীয়ভাবে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসেও তাকে স্মরণ করার উদ্যোগ দেখা যায়নি।
ভাষাসৈনিকের পরিবারের সদস্যরা সমাধি কমপ্লেক্স নির্মাণ, স্মৃতিফলক স্থাপন ও একটি স্মৃতি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।
সৈয়দ আশরাফ হোসেন ১৯২৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ধুলিয়া ইউনিয়নের ধুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সৈয়দ আছমত আলী ছিলেন একজন কৃষক। তিনি ধুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমকম ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পরে তিনি ন্যাপের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক পদেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালের সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের ৩ মে তিনি ইন্তেকাল করেন। পরে বাউফলের ধুলিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ধুলিয়া গ্রামের তেঁতুলিয়া নদীর পাড়ে তার উন্মুক্ত সমাধিস্থল অযত্নে পড়ে আছে। মা-বাবা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তিনি। সমাধিস্থলে সীমানা প্রাচীর না থাকায় গরু-ছাগলের অবাধ বিচরণ সেখানে। নেই কোনো স্থায়ী স্মৃতিফলক; একটি ছোট ব্যানারে কেবল নাম-পরিচয় লেখা রয়েছে। একজন ভাষা সৈনিকের সমাধি এমন অবহেলায় পড়ে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
ধুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাসুমা আক্তার বলেন, ভাষাসৈনিক সৈয়দ আশরাফ হোসেনের স্মৃতি সংরক্ষণে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে নতুন প্রজন্ম জানেই না তিনি কে ছিলেন। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, তার স্মৃতি সংরক্ষণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
ধুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, সৈয়দ আশরাফ হোসেনের স্মৃতি সংরক্ষণে বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকেও ভবিষ্যতে তার সমাধি সংরক্ষণে প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।
সৈয়দ আশরাফ হোসেনের ছেলে মাইনুল হাসান সুমন বলেন, ‘আমার বাবা দেশ ও রাষ্ট্রের জন্য কাজ করেছেন। এখন তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ২০২২ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ভাষা সৈনিকদের সম্মাননা দেওয়ার একটি সংক্ষিপ্ত আয়োজন হয়েছিল। সেটিই রাষ্ট্রপক্ষের একমাত্র উদ্যোগ, যা আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সালেহ আহমেদ বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাষাসৈনিক সৈয়দ আশরাফ হোসেনের সমাধিস্থল সংরক্ষণ ও স্মৃতিফলক নির্মাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।