টেবুনিয়া বিএডিসি বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র (ইনসেটে অভিযুক্ত এডি মাহমুদুল হাসান) © সংগৃহীত
পাবনার টেবুনিয়ায় বিএডিসি বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, তার সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণ, হেনস্তা করা, কাউকে তোয়াক্কা না করাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। বগুড়ায় বাড়ি হওয়ার সুবাদে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নিজেই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হওয়ার চেষ্টা করছেন। তার কথা না শুনলে কর্মকর্তাদের নানাভাবে হেনস্তা করে চলেছেন।
সম্প্রতি একজন অবসরপ্রাপ্ত উপসহাকরী প্রকৌশলীর সঙ্গে বাগবিতণ্ডার জেরে মাহমুদুল হাসান শ্রমিকদের ব্যবহার করে কাজ বন্ধ রেখে ওই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে মানববন্ধন করিয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে পাল্টপাল্টি অভিযোগ ও থানায় জিডি করার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে বিএডিসি বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ খামারে শ্রমিক, কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। ফলে স্বাভাবিক কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগে জানা গেছে, বিএডিসি বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের লোকবল সংকট প্রবল আকার ধারণ করেছে। ২৬টি পদের বিপরীতে মাত্র তিনজন দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। অফিসের কাজের প্রয়োজনে অবসরপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমকে দিয়ে কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করাচ্ছেন। গত ৫ জানুয়ারি শ্রমিকরা একটি দাবি নিয়ে ধর্মঘট করেন। ওই দিন জাহাঙ্গীর আলম অফিসে গেলে শ্রমিকরা ঢুকতে বাধা দিয়ে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।
এরপর ১১ জানুয়ারি অফিসে গিয়ে অবসরপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম দেখতে পান তার বসার কক্ষে চেয়ার টেবিল নেই। পরে অফিসের পিয়ন সবুজকে বিষয়টি বললে সে জানায় সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান স্যারের নির্দেশে শ্রমিকরা তার অফিসের চেয়ার-টেবিল সরিয়ে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর মাহমুদুল হাসান অফিসে আসার পর তার কাছে জাহাঙ্গীর আলম জানতে চাইলে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও গালাগাল শুরু হয়। একপর্যায়ে দুজন মারমুখী হয়ে উঠলে শ্রমিকরা তাদের নিবৃত করেন।
এ ঘটনার পরদিন ১২ জানুয়ারি অফিসের গেটে অবসরপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের শাস্তি চেয়ে মানববন্ধন করেন শ্রমিকরা। যেখানে জাহাঙ্গীর আলমকে আওয়ামী লীগের দোসর উল্লেখ করে সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসানের ওপর হামলার বিচার দাবি করেন তারা।
পরে এ ঘটনায় ১২ জানুয়ারি বিএডিসি টেবুনিয়ারর যুগ্ম পরিচালক (বীপ্র) কাছে লিখিত অভিযোগ দেন সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান ও অবসরপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম। এ ছাড়া সহকারী পরিচালক সদর থানায় একটি জিডি করেন।
এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি এডি সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আমার চেয়ার-টেবিল কোথায়। তখন তিনি আমাকে বলেন, কিসের টেবিল, আপনার এখানে কি, আপনার তো চাকরি নাই। এসব বলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। যা মানহানিকর। অফিসের সিনিয়র অফিসারকে না জানিয়ে তিনি তো আমার চেয়ার-টেবিল সরাতে পারেন না। আবার ঝামেলা হলো এডির সাথে, শ্রমিকদের সাথে আমার কোনো ঝামেলা নেই। অথচ তিনি শ্রমিকদের দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করালেন।’
এ বিষয়ে টেবুনিয়া বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের যুগ্ম পরিচালক কৃষিবিদ মো. কাজেম আলী বলেন, ‘একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষকে তিনি অপদস্ত করতে পারেন না। কারণ, আমরাই আমাদের অফিসের প্রয়োজনে তাকে কাজ করাচ্ছি। দুজনের অভিযোগ পেয়েছি, খতিয়ে দেখছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান ৫ আগস্টের পরে দীর্ঘ ৮ মাস অফিস করেননি। বর্তমানেও অনিয়মিতভাবে অফিস করছেন। তিনি খামারের বিভিন্ন কাজে বাধার সৃষ্টি করছেন। কোনো সিনিয়র কর্মকর্তাদের মানছেন না। নিজের ইচ্ছামতো নিজেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন। ক্ষমতার প্রভাব দেখাচ্ছেন। আমি বিভিন্ন সময় বীজের কোয়ালিটি দেখে বলে দিচ্ছি এটা নেয়া হোক। কিন্তু তিনি আবার সেটা মানসম্মত নয় বলে বাতিল করে দিচ্ছেন।’
যুগ্ম পরিচালক কৃষিবিদ কাজেম আলী আরও বলেন, ’২২ জানুয়ারির মধ্যেই আমন বীজ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণাগারে সংরক্ষণ কাজ সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক ও শ্রমিকদের যোগসাজশে শ্রমিকরা কাজকর্ম হতে বিরত থাকছে। ফলে স্বাভাবিক কাজকর্ম হচ্ছে না। তার কারণে মান-সম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বীজ সংরক্ষণ না হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’
বিএডিসি পাবনার বিপণন বিভাগের উপপরিচালক ড. মো. ছাদেক হোসেন বলেন, ‘এডি মাহমুদুল হাসান চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। সিনিয়র কাউকে মানেন না। বগুড়ায় বাড়ি হওয়ায় ক্ষমতার দাপট দেখান। ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিশে ছিলেন। এখন ভোল পাল্টে বিএনপি সেজেছেন। কাউকে তোয়াক্কা করছেন না। ইতিপূর্বে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয়ে তিনটি অভিযোগ ঊর্ধ্বতন ও কর্তৃপক্ষের কাছে দেয়া হয়েছে। সেগুলো তদন্ত চলছে। তার বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামলাও হয়েছে।’
টেবুনিয়া বিএডিসি (খামার) উপপরিচালক এস এম মাহবুব অর রশিদ বলেন, ‘এডি মাহমুদুল হাসানের কথামতো কাজ না করায় ইতিপূর্বে তিনি আমাকেও নানাভাবে হেনস্থা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি আমাকে নিয়ে বিভিন্নভাবে পোস্ট দিয়েছেন। তিনি সবার ওপরে খবরদারি করার চেষ্টা করছেন। তার কথা না শুনলে নানাভাবে হেনস্তা করা হয়। বিষয়টি আমি লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েছি।’
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে তার কোনোটি সত্য নয়, সব মিথ্যা। আমার ওপরে হামলা করেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম। শ্রমিকরা না ঠেকালে হয়তো সেদিন আমার কিছু হয়ে যেতে পারতো। এ বিষয়ে আমি যুগ্ম পরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছি ও থানায় জিডি করেছি। কিন্তু এ কয়েকদিনে যুগ্ম পরিচালক স্যার এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেননি।’
তিনি বলেন, ‘আমি ৮ মাস অফিস কেন করিনি, সেটি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানে। পরিস্থিতির কারণে তাদের জানিয়েই আমি অফিস করা থেকে বিরত ছিলাম। এখানে ক্ষমতার প্রভাব দেখানোর কিছু নেই। আমি কারও সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ খারাপ আচরণ করিনি। আর আমার ওপরে হামলার বিষয়টি মানতে না পেরে শ্রমিকরাই নিজেরা মানববন্ধন করেছে। তাদের দিয়ে আমি মানববন্ধন করানোর প্রশ্নই ওঠে না।’