নাটোর ১ আসনে এমপি প্রার্থীরা © সংগৃহীত
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাটোর-১ (লালপুর–বাগাতিপাড়া) আসনে তৈরি হয়েছে তীব্র ত্রিমুখী রাজনৈতিক লড়াই। বিএনপির একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় অংশগ্রহণে এ আসনের নির্বাচনী মাঠ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি ও সিদ্ধান্তহীনতা।
বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষ পেয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও চারবারের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান পটলের কন্যা অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের পররাষ্ট্রবিষয়ক পরামর্শক কমিটির বিশেষ সহকারী, দলের মিডিয়া সেলের সদস্য এবং নাটোর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় তিনি ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে সক্রিয় প্রচারণা শুরু করেছেন।
অন্যদিকে একই পরিবারের আরেক প্রভাবশালী মুখ, ফজলুর রহমান পটলের ছেলে ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি ডা. ইয়াসির আরশাদ রাজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। রাজনৈতিকভাবে একই পরিবারের দুই প্রার্থীর অবস্থান নাটোর-১ আসনে বিএনপির ভোটব্যাংকে বিভাজনের শঙ্কা তৈরি করেছে।
এছাড়া বিএনপির দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন। তার প্রার্থিতা বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্ব সংকটকে আরও প্রকাশ্যে এনেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নাটোর-১ আসনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে লালপুর উপজেলা শাখার আমির ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদকে। তিনি ইতোমধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করেছেন এবং ইসলামপন্থী ভোটারদের একত্রিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
ইতিহাসের আলোকে নাটোর-১
স্বাধীনতার পর থেকে নাটোর-১ আসনটি বরাবরই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের আব্দুস সাত্তার প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও, ১৯৭৯ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে এই আসনে প্রভাব বিস্তার করেন বিএনপি নেতা ফজলুর রহমান পটল। তিনি একটানা চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে নাটোরের রাজনীতিতে নিজস্ব বলয় তৈরি করেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ এই আসন পুনরুদ্ধার করলেও ২০০১ সালে আবারও বিএনপির দখলে যায়। তবে ২০০৮ সালে জাতীয় পার্টির দখলে আসনটি চলে যায় পরবর্তীতে ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামীলীগের এ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০১৮ সালে আওয়ামীলীগ থেকে নৌকার মনোনয়ন পেয়ে শহিদুল ইসলাম বকুল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০২৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নৌকাকে হারিয়ে নির্বাচিত হন আওয়ামীলীগের সাবেক সংসদ সদস্য এডভোকেট আবুল কালাম আজাদ । দীর্ঘ সময় ভোটাধিকার সংকট ও নির্বাচন বর্জনের কারণে এই ধারাবাহিকতা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাটোর-১ আসনের ইতিহাসই প্রমাণ করে—এখানে ভোট বিভাজনই বারবার ফলাফল নির্ধারণ করেছে। এবারের নির্বাচনে বিএনপির একাধিক প্রার্থী ও জামায়াতের শক্ত অবস্থান ভোটের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। ত্রিমুখী এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ লাভবান হবে, তা নির্ভর করবে শেষ মুহূর্তে ভোটারদের ঐক্য ও সিদ্ধান্তের ওপর। সাধারণ ভোটারদের বড় একটি অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন। ফলে নাটোর-১ আসনের ফলাফল নিয়ে জল্পনা-কল্পনা বাড়ছে দিন দিন।