ভারতের বিহারে
বিহারে শিক্ষা দপ্তরের শিক্ষকদের বেতন ব্যবস্থাপনা পোর্টালে অনিয়মের অভিযোগ © আনন্দবাজার
ভারতের বিহারে শিক্ষা দপ্তরের শিক্ষকদের বেতন ব্যবস্থাপনা পোর্টালে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও অস্তিত্বহীন শিক্ষকের নামে অর্থ ছাড় করা হয়েছে, আবার কোথাও শিক্ষকদের প্রাপ্য বেতনের আট থেকে ১০ গুণ পর্যন্ত টাকা জমা পড়েছে ব্যাংক হিসাবে। এমনকি অনুমোদন ছাড়াই পোর্টালে বেতনের নথি পরিবর্তনের অভিযোগও পাওয়া গেছে। সরকারি অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় অন্তত তিন জেলায় এসব অনিয়ম ধরা পড়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হয়ে থাকতে পারে। খবর আনন্দবাজার।
দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাটনা, নওয়াদা ও ভাগলপুর জেলায় এসব অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। শিক্ষকদের বেতন ব্যবস্থাপনার হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এইচআরএমএস) পোর্টালে লগইন তথ্যের অপব্যবহার করে বেতনের নথিতে কারসাজি করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে অন্তত চারজন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তবে বিহারের শিক্ষামন্ত্রী মিথিলেশ তিওয়ারিও তিন জেলার অনিয়মের অভিযোগ স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ঘটনাগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাজ্যের ৩৮টি জেলাতেই অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। এইচআরএমএস পোর্টালে যাতে কোনো ধরনের কারচুপি করা না যায়, তা নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞদের সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে। এদিকে দুর্নীতিতে জড়িত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
নওয়াদায় প্রাপ্যের ১০ গুণ বেতন:
শিক্ষা দপ্তরের পোর্টালে অনিয়মের অভিযোগ প্রথম প্রকাশ্যে আসে নওয়াদা জেলায়। জেলার রাজৌলি এলাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রাপ্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বেতন নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। নওয়াদার জেলা শিক্ষা আধিকারিকের করা অভিযোগ অনুযায়ী, ওই শিক্ষকের গত বছরের এপ্রিলে ৪৬ হাজার ৭৭২ টাকা বেতন পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাঁর ব্যাংক হিসাবে জমা পড়ে ৪ লাখ ৯১ হাজার ৭৭২ টাকা। পরের মাসেও তাঁর হিসাবে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা জমা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়।
এ ঘটনায় ওই শিক্ষকের পাশাপাশি শিক্ষা দপ্তরের দুই কর্মীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁদের একজন বেতনের নথি প্রস্তুত করতেন, অন্যজন তা যাচাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ, তাঁরা অনুমোদন ছাড়াই ‘অন্যান্য ভাতা’ খাতে অতিরিক্ত অর্থ যুক্ত করে বেতনের হিসাব পরিবর্তন করেন। শুধু গত বছরের এপ্রিলে ওই শিক্ষকের বেতনের নথিতে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৫২ হাজার ২২২ টাকা যোগ করা হয়েছিল। পরের মাসেও একই ধরনের কারসাজি করা হয়। সব মিলিয়ে অনুমোদনহীনভাবে ওই শিক্ষকের ব্যাংক হিসাবে ১০ লাখ ৪৩ হাজার ৯৫০ টাকা জমা পড়েছে। এ ঘটনায় নওয়াদা থানায় মামলা হওয়ার পর তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
পাটনায় লগইন তথ্য ব্যবহার করে কারসাজি:
নওয়াদার পর পাটনাতেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। পাটনার জেলা শিক্ষা আধিকারিক অভিযোগ করেছেন, তাঁর লগইন আইডি ব্যবহার করে বেতনের পোর্টালে অনুমোদনহীন অর্থের অঙ্ক যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ঘটনায় প্রায় ৭৬ লাখ ৭১ হাজার ৯৮৩ টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে শিক্ষা দপ্তরের এক কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তদন্ত চলছে।
তবে পাটনার ঘটনায় অর্থের অঙ্ক পরিবর্তন এবং পুরো অর্থ কোথায় গেছে, সে বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
অস্তিত্বহীন শিক্ষকের নামেও অর্থ ছাড়:
ভাগলপুর জেলাতেও বেতন ব্যবস্থাপনা পোর্টালে কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। সেখানে জেলাস্তরের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন এক ব্যক্তির নামে অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করার অভিযোগ রয়েছে, যিনি আদতে শিক্ষক হিসেবে অস্তিত্বহীন। এ ঘটনায় গত ৮ অক্টোবর ভাগলপুরের জোগসার থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগের পরদিনই অভিযুক্ত কর্মকর্তা শশীচন্দন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কত টাকা সরানোর অভিযোগ রয়েছে, তা এখনো অপ্রকাশিত।
ফলে তিন জেলার এসব ঘটনায় শিক্ষা দপ্তরের বেতন ব্যবস্থাপনা পোর্টালের নিরাপত্তা, লগইন তথ্যের নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থ ছাড়ের অনুমোদনপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনিয়মের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা জানতে তদন্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে বিহার সরকার।
সূত্র: আনন্দবাজার