ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেলেনস্কি © টিডিসি ফটো
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সরিয়ে নতুন প্রেসিডেন্ট নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল আমদানি চুক্তির সমালোচনা এবং রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা অব্যাহত রাখার বিষয়ে জেলেনস্কির অবস্থানের সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় হয়েছে।’
শনিবার (১০ অক্টোবর) হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। তিনি অভিযোগ করেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা চালানোর অনুমোদন দিয়ে জেলেনস্কি ‘বিশ্বের জন্য সমস্যা তৈরি করতে চান’।
ট্রাম্প বলেন, ‘তার অভিশপ্তভাবেই এটা বন্ধ করা উচিত।’ এরপর তিনি ইঙ্গিত দেন, ইউক্রেনের এমন একজন নতুন নেতা পাওয়া উচিত, যিনি একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবেন।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইউক্রেনে সামরিক আইন কার্যকর রয়েছে। এ কারণে দেশটিতে নির্বাচন স্থগিত আছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে শুরু করা যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ, বিশেষ করে ডিজেলের সরবরাহ ব্যাপকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের মোট তেলজাত পণ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।
জ্বালানি উৎপাদনে অন্যতম প্রধান দেশ রাশিয়া এবং ইউক্রেন সম্প্রতি একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামো ও পরিবহন স্থাপনায় হামলা বাড়িয়েছে। এতে জ্বালানির বাজারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, রাশিয়ার বিরুদ্ধে তোমরা যা খুশি করতে পারো, কিন্তু তেল শোধনাগারে হামলা করো না। কারণ, এতে বিশ্বজুড়ে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তিনি অনেক চুক্তি করতে পারতেন, কিন্তু কোনো এক কারণে তিনি তা কখনোই করেন না।’
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ ট্রাম্পের এই হস্তক্ষেপকে ‘ঐতিহাসিক ও আইকনিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইউক্রেনের এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যারা প্রকৃত অর্থেই শান্তির দিকে মনোযোগ দেবে।
শুক্রবার ট্রাম্প নিশ্চিত করেন, রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আগামী ৭ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত রাখতে মস্কোর সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়েছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় জেলেনস্কি বলেন, এই চুক্তির ফলে রাশিয়া নতুন অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পাবে। সেই অর্থ দিয়ে দেশটি নতুন সামরিক সরঞ্জাম কিনে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।
জাপোরিঝঝিয়ায় নতুন করে প্রাণঘাতী হামলার পর জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, মস্কো এই চুক্তিকে এমনভাবে দেখছে যে তারা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে এবং শহরগুলোতে বোমা ফেলতে পারবে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে শনিবার কয়েকজন মিত্রের সঙ্গে কথা বলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। এ সময় তিনি ইউক্রেনের মানুষের জীবন রক্ষায় ‘কার্যকর সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র জানান, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম জেলেনস্কির সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তার প্রতি ‘পূর্ণ সংহতি’ প্রকাশ করেছেন।
মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই নেতা একমত হয়েছেন যে রাশিয়ার অবিলম্বে জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচলে হামলা বন্ধ করা উচিত মস্কোর। মুখপাত্র বলেন, ‘এতে বিশ্ববাজারে অবিলম্বে আরও বেশি জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার ডিজেল চুক্তির সমালোচনা করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান কাজা কালাসও। তিনি জেলেনস্কির বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করলে ‘রাশিয়া যুদ্ধ চালানোর জন্য আরও বেশি রাজস্ব পাবে’।
তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়ার ওপর চাপ কমানোর সময় এখন নয়, আর ইউরোপ তা করবে না।’
কাজা কালাস জানান, ইউরোপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সোমবার রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় প্যাকেজ অনুমোদনের পরিকল্পনা করছেন। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর এটি হবে দেশটির বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে বড় নিষেধাজ্ঞার প্যাকেজ।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমাতে ট্রাম্পের সর্বশেষ উদ্যোগ এই রাশিয়া চুক্তি। মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির দাম কমানোর চেষ্টা করছেন তিনি। ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব সামাল দিতে গত কয়েক মাস ধরে তাকে চাপে থাকতে হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এই সংঘাতের কারণে পেট্রল ও বিশেষ করে ডিজেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। এতে মার্কিন জনগণের কাছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জ্বালানির পাম্পে বেশি দাম দিতে হচ্ছে ভোক্তাদের। পাশাপাশি এর প্রভাবে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম ৬ দশমিক ২৮ ডলার, যা ব্রিটিশ মুদ্রায় ৪ দশমিক ৭৪ পাউন্ড। গত মাসে এই দাম ছিল গড়ে ৫ দশমিক ৯৪ ডলার। আর গত বছর একই সময়ে ছিল ৩ দশমিক ৬৮ ডলার।
চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া প্রথম ধাপে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে ৩ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, এরপর আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে। এর পরপরই ‘অল্প সময়ের মধ্যে’ আরও ৩০ লাখ টন সরবরাহ করা হবে। তবে তিনি উল্লেখ করেছেন, পরবর্তী চালানের পরিমাণ রাশিয়ার ডিজেল শোধনাগারগুলোর অবস্থার ওপর নির্ভর করবে।
গত ১০ মাসে ইউক্রেনের ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়াজুড়ে দুই দফায় তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এসব হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ায় ডিজেল উৎপাদন আনুমানিক ৩০ শতাংশ কমে গেছে।
এর আগেও গত বছরের ডিসেম্বরে ইউক্রেনে নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। সে সময় তিনি বলেছিলেন, জেলেনস্কিকে ক্ষমতায় রাখবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ইউক্রেনের ভোটারদের পাওয়া উচিত।
২০২২ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইউক্রেনে সামরিক আইন কার্যকর রয়েছে। এ কারণে দেশটিতে নির্বাচন স্থগিত আছে।