যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোনা সরাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো, নেপথ্যে কী?

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৭ AM
সোনার বার

সোনার বার © টিডিসি ছবি

যুক্তরাষ্ট্রে রাখা সোনার মজুত একের পর এক সরিয়ে নিচ্ছে ইউরোপের কয়েকটি দেশ। নেদারল্যান্ডস সম্প্রতি উত্তর আমেরিকায় থাকা ৮৬ টন সোনা লন্ডনে সরিয়ে নিয়েছে। এর আগে চলতি বছরের শুরুতে ফ্রান্সও যুক্তরাষ্ট্রে থাকা নিজেদের সোনা দেশে ফিরিয়ে আনার কথা জানিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—হঠাৎ কেন ইউরোপের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোনা সরিয়ে নিচ্ছে?

নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় থাকা তাদের প্রায় ৩১৩ টন সোনার মধ্যে ৮৬ টন লন্ডনে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ‘ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার’ কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংকটের সময় যেন সোনা দ্রুত ব্যবহার করা যায়, সে জন্য সহজে লেনদেন করা সম্ভব এমন জায়গায় মজুত রাখা হচ্ছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে নেদারল্যান্ডস সামনে বড় কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কার আশঙ্কা করছে। বরং বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেশটি সোনার মজুতের অবস্থান বদলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক বিরোধ ও সামরিক সংঘাতের মধ্যে বিভিন্ন দেশ নিজেদের রিজার্ভ সম্পদ আরও কৌশলগতভাবে ব্যবস্থাপনার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

ফ্রান্সও চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা নিজেদের সোনা দেশে ফিরিয়ে আনার কথা জানিয়েছে। এর আগে জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুন্দেসব্যাংক কয়েক বছর ধরে বিদেশে থাকা ২১৬ টনের বেশি সোনা সরিয়ে নেয়। এর মধ্যে নিউইয়র্ক থেকে ১১১ টন এবং প্যারিস থেকে ১০৫ টন সোনা সরানো হয়েছিল। ২০১৬ সালে এই প্রক্রিয়া শেষ হয়।

বিশ্বে অস্থিরতা তৈরি হলে সোনার মজুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণা বিশ্লেষক লিনা থমাস ও ডান স্ট্রুইভেন বলেন, ‘স্নায়ু যুদ্ধের সময় ইউরোপের কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সোনার একটি অংশ নিউইয়র্কে সরিয়ে নিয়েছিল।’

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ বাজার কৌশলবিদ জোসেফ ক্যাভাটোনি বলেন, যুদ্ধ ও বাণিজ্যিক উত্তেজতা কিছু সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখছে। তবে এগুলো সোনা সরানোর মূল কারণগুলোর তালিকার শীর্ষে নেই। মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং এমন জায়গায় সোনা রাখা, যেখান থেকে দ্রুত লেনদেন করা যায়—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

ক্যাভাটোনি বলেন, ‘আমি এমন কোনো আশঙ্কা করছি না যে সামনে বড় কোনো বিপর্যয় আসছে। তবে আমি মনে করি, মানুষ এখন তাদের রিজার্ভ সম্পদ কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, কীভাবে সেই সম্পদ বাড়াতে হবে এবং কীভাবে এসব সম্পদ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া যায়—সে বিষয়ে আরও ভালোভাবে জানতে পারছে।’

নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে সরিয়ে নেওয়া সোনা এখন ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে রাখা হয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ওলাফ স্লেইপেন বলেন, ‘আমরা আশা করি, এগুলো কখনো ব্যবহার করতে হবে না। তবে আমাদের স্থিতিস্থাপকতা ও প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করতে হবে।’

সোনা সংরক্ষণের জন্য লন্ডনকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে দেখা হয়। কারণ লন্ডন বিশ্বের অন্যতম বড় সোনা বাণিজ্যকেন্দ্র। সংকটের সময় দ্রুত সোনা কেনাবেচা করতে হলে এই শহর সুবিধাজনক। এ কারণে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও সোনা সংরক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে জনপ্রিয়।

কেন্দ্রীয় লন্ডনের প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ভবনের নিচে প্রায় ৪ লাখ সোনার বার রাখা আছে। এসব সোনার মোট মূল্য ২০০ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের বিভিন্ন জরিপেও সোনা সংরক্ষণের জন্য ব্যাংক অব ইংল্যান্ডকে সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থান হিসেবে দেখা যায়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন নিজেদের সোনা একাধিক জায়গায় রাখার দিকে ঝুঁকছে।

গোল্ডম্যান স্যাকসের থমাস ও স্ট্রুইভেনের মতে, দেশের সোনা কোথায় সংরক্ষণ করা হবে, সেটি এখন ‘রিজার্ভ ব্যবস্থাপকদের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে’।

এক দেশ থেকে অন্য দেশে সোনা সরানোর ক্ষেত্রে সব সময় বাস্তবে সোনা পরিবহন করতে হয় না। নেদারল্যান্ডস নিউইয়র্কে থাকা প্রায় ৫৯ টন সোনা বিক্রি করে লন্ডনে সমপরিমাণ সোনা কিনেছে। ফলে ওই সোনা বাস্তবে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে পরিবহন করতে হয়নি।

তবে ২৭ টনের বেশি সোনা শারীরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে নেদারল্যান্ডসের জেইস্ট শহরে নেওয়া হয়েছে। একই পরিমাণের কাছাকাছি সোনা জেইস্ট থেকে লন্ডনেও পাঠানো হয়েছে।

সোনা পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত এসব কার্যক্রমের বিস্তারিত প্রকাশ করে না। তবে এত বিপুল মূল্যবান সম্পদ পরিবহনে কঠোর নিরাপত্তা ও পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

ক্যাভাটোনি জানান, সোনার মজুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানোর একটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো এক জায়গায় সোনা বিক্রি করে অন্য জায়গায় সমপরিমাণ সোনা কেনা। তিনি বলেন, ‘ধরুন, আমি চাই আমার সোনা নিউইয়র্কে থাকুক, কিন্তু সেটি লন্ডনে আছে। আমি লন্ডনে সোনা বিক্রি করে একই দিনে, একই সময়ে নিউইয়র্কে সোনা কিনতে পারি। এভাবে বাস্তবে কোনো পরিবহন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন না করেই কার্যত হিসাবের মাধ্যমে সোনার স্থানান্তর করা সম্ভব।’

আন্তর্জাতিকভাবে সোনা পরিবহনের কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠান খুব বেশি নেই। এর মধ্যে একটি ব্রিঙ্কস গ্লোবাল সার্ভিসেস। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে তারা ‘বাড়তি চাহিদা’ পেয়েছে।

ব্রিঙ্কসের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট নাদের আন্তার বলেন, ‘বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কৌশলগত রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে সোনার ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এই প্রবণতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে হচ্ছে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সোনা কোথায় রাখবে, সে বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আরেকটি কারণ হলো তারা আগের তুলনায় অনেক বেশি সোনা কিনছে। তবে দেশে সোনা সংরক্ষণ করতেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়।

গোল্ডম্যান স্যাকসের থমাস ও স্ট্রুইভেন বলেন, ‘দেশের ভেতরে সোনা সংরক্ষণের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা, হিসাব নিরীক্ষার অবকাঠামো এবং বিমায় বিনিয়োগ করতে হয়। ছোট কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য এসব খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হতে পারে।’

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রতি বছর গড়ে ১ হাজার টন সোনা কিনেছে। এর আগের দশকে এই গড় ছিল ৫০০ টন। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এই প্রবণতা বাড়তে শুরু করে। আগামী বছরেও সোনা কেনার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সোনার দামও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। একের পর এক রেকর্ড গড়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়।

আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে সোনাকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করায় এর চাহিদা বাড়ে। বাণিজ্যিক বিরোধ ও সামরিক সংঘাতের কারণে অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝোঁকেন।

মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারও সোনার দামে প্রভাব ফেলে। সোনা দুষ্প্রাপ্য ধাতু এবং হাজার বছর ধরে এর মূল্য রয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও অনেকে সোনাকে সম্পদ ধরে রাখার তুলনামূলক নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে দেখেন।

বিনিয়োগ ব্যাংক চার্লস শোয়াবের মতে, ‘গত অর্ধশতকে সোনার দাম ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআইয়ের তুলনায় অনেক দ্রুত বেড়েছে।’ সিপিআই হলো মূল্যস্ফীতি পরিমাপের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সূচক।

চলতি বছরের শুরুতে রেকর্ড উচ্চতায় ওঠার পর সোনার দাম কিছুটা কমেছে। তবে ঐতিহাসিক বিবেচনায় দাম এখনো অনেক বেশি।

গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৯০০ ডলার বা প্রায় ৩ হাজার ৬২৪ পাউন্ডে উঠতে পারে। আগস্টের দামের তুলনায় এই পূর্বাভাস ৩০০ ডলার বেশি।

গোল্ডম্যান স্যাকসের থমাস ও স্ট্রুইভেনের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনার চাহিদা বাড়াই সাম্প্রতিক সময়ে সোনার দাম বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।

যে পাঁচ কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবি হলো ট্রাম্পের
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
এইচএসসির ফলাফলে ধস, শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফেরাতে মাইকিং
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
দুই যুগেও মেলেনি এমপিও, ঋণের চাপে সর্বস্বান্ত হয়ে প্রাণ গেল…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামানের ছেলেকে ছুরিকাঘাত
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
হামের টিকা নিয়ে তদন্ত করছে সরকার
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
জায়গা দখল করে ছাত্রদল নেতার অবৈধ দোকান, নিউজ করায় সাংবাদিকে…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950