‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে’—সিজারের আগে নারীর আর্তনাদ, সেই মা ও নবজাতকের মৃত্যু

৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৭ AM
 সিজারের আগে প্রসূতি নারীর আর্তনাদ

সিজারের আগে প্রসূতি নারীর আর্তনাদ © সংগৃহীত

সন্তান জন্মের পরই মৃত্যু। তার কয়েক ঘণ্টা আগে হাসপাতালের বিছানায় কাঁদতে কাঁদতে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন ২৫ বছরের কল্পনা মিশ্র। বলেছিলেন, ‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’ শেষ মুহূর্তের সেই ভিডিও এখন ছড়িয়ে পড়েছে। কল্পনার সঙ্গে তার নবজাতক সন্তানও মারা গেছে। পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসায় গাফিলতির কারণেই মা ও শিশুর এই পরিণতি। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। খবর এনডিটিভি। 

মধ্যপ্রদেশের রেওয়ার একটি সরকারি হাসপাতালে এই ঘটনা ঘটেছে। প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার পর কল্পনা মারা যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি কাঁদছিলেন, চিৎকার করছিলেন এবং পরিবারের সদস্যদের অনুরোধ করছিলেন তাকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যেতে।

মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে ধারণ করা একটি ভিডিওতে কল্পনাকে তার মাকে বলতে শোনা যায়, ‘এভাবে চিকিৎসা চলতে থাকলে, এই মানুষগুলো আমাকে মেরে ফেলবে।’

এরপর তিনি আবার বলেন, ‘আমি বাঁচব না। দয়া করে আমাকে বাঁচাও, আমার জীবন বিপদের মধ্যে।’

কল্পনার এই কথাগুলোর কয়েক ঘণ্টা পরই তার মৃত্যু হয়। একই সময়ে মারা যায় তার নবজাতক সন্তানও।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা চিকিৎসার নির্ধারিত নিয়ম মেনেই কল্পনার চিকিৎসা করেছে। চিকিৎসকদের কোনো গাফিলতি ছিল না বলেও দাবি করেছে হাসপাতাল। তবে কল্পনার পরিবার হাসপাতালের এই বক্তব্য মানতে নারাজ। তাদের অভিযোগ, চিকিৎসকদের বারবার অনুরোধ করার পরও কল্পনার শারীরিক অবস্থার দিকে যথেষ্ট নজর দেওয়া হয়নি।

ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুই নার্সিং কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্তে কেউ দায়ী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রেওয়া জেলার হাতওয়া এলাকার বাসিন্দা কল্পনা প্রথমবার মা হতে যাচ্ছিলেন। পরিবার জানিয়েছে, সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য ২৫ আগস্ট রাতে তাকে সঞ্জয় গান্ধী-গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

২৬ আগস্ট রাত সাড়ে ৮টার দিকে চিকিৎসকেরা কল্পনার সিজারিয়ান অপারেশন করেন। এরপর তিনি একটি সন্তানের জন্ম দেন।

পরিবারটি নতুন একজন সদস্যকে স্বাগত জানাতে হাসপাতালে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের ঘরে নতুন সদস্য এলেও সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। সন্তান জন্মের কিছুক্ষণ পরই কল্পনা ও তার নবজাতক সন্তান দুজনেই মারা যায়।

এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন, সন্তান জন্মের পর ঠিক কী ঘটেছিল এবং কীভাবে মা ও শিশুর মৃত্যু হলো।

কল্পনার চাচা ধর্মেন্দ্র মিশ্র জানান, হাতওয়ায় কল্পনার বিয়ে হয়েছিল। প্রথম সন্তানের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। মঙ্গলবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রসবের সময় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার তিনি মারা যান।

এরই মধ্যে কল্পনার মৃত্যুর আগে ধারণ করা ভিডিওটি সামনে এসেছে। ভিডিওতে তাকে নারী ওয়ার্ডের ভেতরে চরম অস্থির অবস্থায় দেখা যায়। তিনি কাঁদছেন, চিৎকার করছেন এবং সেখান থেকে বেরিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

ভিডিওতে দেখা যায়, নার্সিং স্টাফরা তাকে আটকে রাখার চেষ্টা করছেন এবং হাসপাতালে থাকার জন্য বোঝাচ্ছেন।

একপর্যায়ে একজন স্টাফ কল্পনাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?’

কিন্তু কল্পনা তখনও সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি পরিবারের সদস্যদের দিকে হাত বাড়িয়ে দেন, কাঁদতে থাকেন এবং অভিযোগ করেন যে তিনি যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছেন না।

কল্পনার বাবা রামশরণ মিশ্র এখন তার একমাত্র মেয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন।

তার অভিযোগ, কল্পনার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করা এবং তার ওপর নজর রাখার জন্য তিনি বারবার চিকিৎসকদের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকেরা তার অনুরোধকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি।

রামশরণের দাবি, সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় কল্পনার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়।

রামশরণ মিশ্র বলেন, ‘কল্পনা আমার একমাত্র মেয়ে ছিল। তার বিয়ের জন্য আমি ১৫ লাখ রুপির জমি বিক্রি করেছিলাম। আজ, সে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। পুলিশকে অবশ্যই যারা গাফিলতি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করতে হবে। দায়িত্বে থাকা ডাক্তার ও স্টাফদের সাসপেন্ড করতে হবে। আমাদের দাবি না মানলে আমরা পোস্টমর্টেম করতে দেব না।’

কল্পনার পরিবার অ্যানেস্থেশিয়া নিয়েও গুরুতর অভিযোগ করেছে। স্বজনদের দাবি, অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়ার পর কল্পনা আর জ্ঞান ফিরে পাননি।

পরিবারের সদস্যরা সন্দেহ করছেন, অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়ার কারণেই হয়তো কল্পনার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে এই অভিযোগের সত্যতা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।

কল্পনা ও তার নবজাতকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতাল চত্বরে শোকের সঙ্গে ক্ষোভও ছড়িয়ে পড়ে।

কল্পনার স্বজনেরা হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তারা চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ করেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

প্রায় চার ঘণ্টা ধরে হাসপাতাল এলাকায় উত্তেজনা ছিল।

পরিবার প্রথমে কল্পনার ময়নাতদন্ত করাতেও রাজি হয়নি। তাদের দাবি ছিল, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত তারা ময়নাতদন্ত করতে দেবেন না।

পরে হাসপাতালের ডিন ডা. সুনীল আগরওয়াল এবং হাসপাতাল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. রাহুল মিশ্র ঘটনাস্থলে যান। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও কল্পনার পরিবারের মধ্যে প্রায় দুই ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়।

বৈঠকের পর দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয় যে জেলা হাসপাতালের চিকিৎসকেরা কল্পনার ময়নাতদন্ত করবেন।

এর পাশাপাশি প্রশাসন প্রথম দফায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়। ওই সময় দায়িত্বে থাকা দুই নার্সিং কর্মকর্তা সাধনা বর্মা ও সীমা মুজালদেকে প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

পুরো ঘটনা তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্তে কেউ দায়ী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হাসপাতালের ডিন ডা. সুনীল আগরওয়াল ঘটনাটিকে অত্যন্ত মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, কল্পনার পরিবারের করা অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হবে।

ডা. আগরওয়াল বলেন, ‘এটি একটি গভীরভাবে দুঃখজনক ঘটনা, যেখানে মা ও শিশু দুজনেই মারা গেছে। যে অভিযোগগুলো আমরা পেয়েছি, তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং দুই নার্সিং কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এটি একটি চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয়। রোগী কেন জ্ঞান ফিরে পাননি, সেটি তদন্তের বিষয় এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে যে ব্যক্তি দায়ী প্রমাণিত হবেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তবে হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. রাহুল মিশ্র চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘ওই নারীকে চিকিৎসার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে কোনো গাফিলতি হয়নি। তবে পরিবারের করা অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’

কল্পনার মৃত্যু এমন একটি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যেই ঘটেছে, যেখানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

২০২৫-২৬ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রদেশে অনুমোদিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রায় চারটি পদের মধ্যে তিনটিই খালি রয়েছে।

রাজ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের জন্য মোট ৫,৪৪৩টি পদ অনুমোদিত রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১,৪৯৫টি পদে চিকিৎসক কর্মরত আছেন।

অর্থাৎ ৩,৯৪৮টি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ খালি রয়েছে। অনুমোদিত মোট পদের হিসাবে এই শূন্যতার হার ৭২ শতাংশেরও বেশি।

শুধু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদেই সংকট নেই। মেডিকেল অফিসারদের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

মেডিকেল অফিসারের জন্য রাজ্যে মোট ৬,৫১৩টি পদ অনুমোদিত। এর মধ্যে ২,৬৮৯টি পদ খালি রয়েছে।

অর্থাৎ অনুমোদিত প্রতি ১০টি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে চারটিরও বেশি পদে কোনো কর্মকর্তা কর্মরত নেই।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সামনে রোগীদের ক্ষোভের ঘটনায় ডিউটিতে অনুপস…
  • ৩০ আগস্ট ২০২৬
মেসির ৪ গোল—কিংবদন্তিরা বুঝি এভাবেই কামব্যাক করে!
  • ৩০ আগস্ট ২০২৬
‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে’—সিজারের আগে নারীর আর্তনাদ, সেই মা ও …
  • ৩০ আগস্ট ২০২৬
জেলের জালে ধরা পড়ল বিরল ‘টাইটান ট্রিগারফিশ’
  • ৩০ আগস্ট ২০২৬
নেপালের ভয়াবহ বন্যায় এখনো নিখোঁজ ২৩৬২
  • ৩০ আগস্ট ২০২৬
অনার্স ভর্তির ২য় রিলিজ স্লিপের ফল কবে, জানাল জাতীয় বিশ্ববিদ…
  • ৩০ আগস্ট ২০২৬