নেপালে ভয়াবহ বন্যা © সংগৃহীত
তিব্বত থেকে নেমে আসা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এমন ভয়াবহ দুর্যোগের পর প্রশ্ন উঠেছে, চীন যদি আগেই নেপালকে সতর্ক করত, তাহলে কি বহু মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো? সেই প্রশ্নের জবাব দিয়েছে বেইজিং। নেপালে আগাম সতর্কবার্তা না দেওয়ার অভিযোগকে সরাসরি ‘ভুয়া’ বলে দাবি করেছে নেপালে অবস্থিত চীনা দূতাবাস।
তিব্বত থেকে নেমে আসা প্রবল পানির স্রোত ও ধ্বংসাবশেষের আঘাতে নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নেপালে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রশ্ন উঠেছে, দুর্যোগের আগাম তথ্য চীনের হাতে থাকলে তা নেপালকে জানানো হয়েছিল কি না।
নেপালে অনেকেই মনে করছেন, রাসুওয়াগাধি-গিরং সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র এবং গিরং বন্দর যখন দুর্যোগের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল, তখন নিচের দিকে থাকা মানুষদের সতর্ক করার সুযোগ ছিল। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় এমন ঘটনা ঘটার পর দ্রুত সতর্কবার্তা পাঠানো গেলে স্থানীয় মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সময় পেতেন বলেও অনেকে মনে করছেন।
নেপালের দৈনিক ‘নয়া পত্রিকা’র এক সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘নেপাল তার প্রতিবেশীদের বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তবে দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমাদের উত্তরের প্রতিবেশী দেশটি আমাদের ব্যাপকভাবে হতাশ করেছে। এত বড় একটি দুর্যোগের বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা না দেওয়ায় আমাদের বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণ হারাতে হয়েছে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমরা তাদের সব ধরনের উদ্বেগ—তা প্রয়োজনীয় হোক বা অপ্রয়োজনীয়—নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু একতরফা এই সম্পর্কের মূল্য শুধু নেপালকেই কেন দিতে হবে?’
নেপালের জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এবং ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশনের সাবেক প্রধান নির্বাহী ড. গোবিন্দ রাজ পোখরেলও চীনের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘আমি ভেবেছিলাম সীমান্ত এলাকায় হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা পর্যবেক্ষণের জন্য চীন আরও উন্নত ব্যবস্থা ব্যবহার করে। কিন্তু মনে হচ্ছে, তেমনটা নয়। তারাও প্রাণ ও সম্পদের বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নেপাল ও চীনের সীমান্ত এলাকায় হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা এবং বন্যার বিষয়ে শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।’
২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পের পর দেশটির পুনর্গঠন কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেওয়া ড. পোখরেল এনডিটিভিকে বলেন, ‘আমি আশা করেছিলাম, উন্নত স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ও প্রযুক্তির কারণে তারা অন্তত কোনো ছবি বা এ ধরনের কিছু দেখতে পাবে। এরপর তারা সেই তথ্য নেপালের দিকে পাঠাতে পারত। কিন্তু তারাও বিষয়টি বুঝতে পারেনি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের দিকে জায়গাটি নিচের দিকে ছিল। কিন্তু এত বড় বন্যা হবে, সেটা আমাদের ধারণারও বাইরে ছিল। সেদিন বৃষ্টি হয়নি। তাই নদীর নিচের দিকে থাকা মানুষ এমন কিছু ঘটবে বলে ভাবেননি। এমনকি যেসব পুলিশ সদস্য মানুষকে নদীর কাছে যেতে নিষেধ করছিলেন, তারাও পানির স্রোতে ভেসে যান। কারণ তারাও বন্যার পানির উচ্চতা এতটা হবে বলে ধারণা করতে পারেননি।’
ড. পোখরেলের মতে, সীমান্ত এলাকায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা হয় কার্যকর ছিল না, অথবা থাকলেও ঠিকমতো কাজ করেনি।
তিনি বলেন, ‘স্রোত এতটাই দ্রুত ছিল যে নুওয়াকোট পর্যন্ত মানুষ এমন বন্যার কথা কল্পনাই করতে পারেনি। রাসুওয়া জেলায় জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মী, পুলিশ সদস্য এবং স্থানীয় বাসিন্দাসহ অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, চীনেও বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সেখানে কোনো আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ছিল না। আর থাকলেও স্থানীয় মানুষকে সতর্ক করার সক্ষমতা হয়তো তাদের ছিল না।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল পরিমাণ পানির সঙ্গে মিশে যাওয়া বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে গিয়ে রাসুওয়া জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে।
ড. পোখরেল বলেন, ‘বন্যা বা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে আমাদের আরও ভালো সমন্বয় প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই সীমান্ত এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের অন্যান্য দুর্যোগের বিষয়ে তারা তথ্য ভাগ করে নেবে—এমন একটি চুক্তি বা সমঝোতাও হয়েছিল।’
নেপালে একের পর এক এমন প্রশ্ন ওঠার পর অবশেষে বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন। নেপালে অবস্থিত চীনা দূতাবাস একটি বিবৃতিতে চীনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে সরাসরি ‘ভুয়া’ বলে দাবি করেছে।
দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ভুয়া: চীনের দিকে ভূতাত্ত্বিক দুর্যোগের কারণে বাঁধ ভেঙে নেপালে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।’
চীনা দূতাবাসের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘২৬ আগস্ট ২০২৬ সকালে নেপালের দিকে একটি ভূমিকম্প বা ভূমিকম্পের মতো হিমবাহ ধসে পড়ার ঘটনা ঘটে। এর ফলে বিশাল কাদাধস নামে। এতে গিরং-রাসুওয়াগাধি সীমান্ত এলাকায় নেপাল ও চীন—দুই দেশেই বহু মানুষ হতাহত হন এবং অনেকে নিখোঁজ হন।’
অর্থাৎ, নেপালে বন্যার জন্য চীনের দিকে কোনো ভূতাত্ত্বিক দুর্যোগের বাঁধ ভেঙে যাওয়াকে দায়ী করার দাবি চীন মানছে না। বরং তাদের বক্তব্য, দুর্যোগের সূত্রপাত নেপালের দিকেই হয়েছিল এবং এর প্রভাব দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় পড়েছে।
বিবৃতির শেষে চীন বলেছে, ‘অভিযোগ কোনো কাজে আসে না, সহযোগিতাই জীবন বাঁচায়।’
এদিকে নেপালে আকস্মিক এই বন্যার প্রকৃত কারণ কী ছিল, তা নিয়েও তদন্ত চলছে। বরফ ও পাথরের বিশাল একটি স্তূপ ধসে পড়ার পর এই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমবাহের কোনো হ্রদ থেকে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি বেরিয়ে আসা বা হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার কারণেই এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
এই বন্যায় নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। অন্তত ১৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বহু গ্রাম ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরো জনবসতি পানির স্রোতে ভেসে যাওয়ায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পেতে সময় লাগবে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট বা আইসিমোডের জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বুধবারের আকস্মিক বন্যার মূল কারণ সম্ভবত একটি হিমবাহ ধসে পড়া।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নেপাল-চীন সীমান্তের হিমবাহ এলাকার কাছে বরফ ও পাথরের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে। জায়গাটি রাসুওয়াগাধি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে।
ধসে পড়া সেই বরফ ও পাথর হয় কোনো হিমবাহের হ্রদে পড়ে বিপুল পানি বের করে দেয়, অথবা নদীর গতিপথ আটকে দেয়। এরপর বরফ, গলিত পানি ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ নিয়ে তৈরি প্রবল স্রোত লেন্দে খোলা নদী দিয়ে নেমে ভোতে কোশি নদীতে গিয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের বন্যাকে ‘হিমবাহ-সমৃদ্ধ বন্যা’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
এর আগে একটি ভূমিকম্পের খবরও পাওয়া গিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের সর্বশেষ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সেখানে কোনো ভূমিকম্প হয়নি। ফলে এত বড় ভূমিধসের কারণ কী, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রাথমিকভাবে সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের দিকে একটি ভূমিকম্প হয়েছিল বলে খবর ছড়ায়। এর উপকেন্দ্র গোসাইকুণ্ড থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে ছিল বলে জানানো হয়েছিল। সেই ভূমিকম্পকেই বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল।
নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগও তদন্ত করছে, কোনো হিমবাহের হ্রদ হঠাৎ ভেঙে এই ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয়েছিল কি না।
এর আগে গত বছরের আগস্টেও একই এলাকায় এমন আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। তিব্বতে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে একটি হিমবাহের হ্রদ উপচে পড়ায় ওই বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই ঘটনায় নয়জনের মৃত্যু হয়। নেপাল ও চীনের মধ্যে যোগাযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুসহ গিরং বন্দরের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম পিপলস ডেইলি জানিয়েছে, বুধবার দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের শিজাং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের গিরং বন্দরের কাছে একটি বড় ধরনের কাদাধস হয়েছে। এতে কয়েকজন নিখোঁজ হয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গিরং কাউন্টির জরুরি ব্যবস্থাপনা ব্যুরো জানিয়েছে, এই দুর্যোগের কারণে চীনের দিকে বন্দরমুখী সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। একই সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়ে গেছে। গিরং বন্দর চীন ও নেপালের মধ্যে যোগাযোগকারী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর।