ভয়াবহ বন্যায় নেপাল ও চীনে নিখোঁজ ১৫০০, মৃতের সংখ্যা ১৫০ ছাড়াল

২৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩০ AM
 নেপালে ভয়াবহ বন্যা

নেপালে ভয়াবহ বন্যা © সংগৃহীত

হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও কাদাধসের ঘটনায় নেপাল ও চীনের তিব্বতে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০-তে পৌঁছেছে। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৮০০ জন বিদেশি নাগরিক। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১৫০ ছাড়িয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। খবর রয়টার্স। 

হিমালয়ের একটি নদীতে কাদা ও পাথরের বিশাল স্তূপ ধসে পড়ার পর প্রবল স্রোত নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে সেই স্রোত নদীর আশপাশের শহর, গ্রাম ও উপত্যকাগুলোতে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করে। পানির সঙ্গে নেমে আসা কাদা ও পাথরের স্রোতে বাড়িঘর, সড়ক, সেতু, গাড়ি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়। বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে নেপাল ও চীনের তিব্বতের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ।

বৃহস্পতিবার নেপালের কর্মকর্তারা জানান, বুধবারের ভয়াবহ দুর্যোগের পর দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকে পড়া হাজারো মানুষের কাছে হেলিকপ্টারে করে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা। একই সঙ্গে হেলিকপ্টার থেকে দুর্গত এলাকায় জরুরি ত্রাণসামগ্রীও ফেলা হচ্ছে।

বুধবারের বন্যায় হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এই অঞ্চলটি তিব্বতের লাসা থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও ট্রেকারদের চলাচলের জন্যও পথটি গুরুত্বপূর্ণ।

নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। উদ্ধারকারীরা নতুন করে তল্লাশি অভিযান শুরু করেছেন। ফলে আরও মরদেহ উদ্ধারের আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।

পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে রয়টার্সকে বলেন, ‘এই সংখ্যা আরও বাড়বে। আমরা আবারও তল্লাশি শুরু করেছি এবং আরও মরদেহ উদ্ধার হওয়ার আশঙ্কা করছি।’

নেপালের পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটিতে ৮২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন বিদেশি নাগরিক।

দুই ডজনেরও বেশি দেশের নাগরিকদের মধ্যে নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন ১৭৭ জন ভারতীয়, ৬৩ জন মার্কিন নাগরিক, ৩৪ জন অস্ট্রেলীয়, ৩৩ জন ব্রিটিশ এবং ২৫ জন কানাডীয় নাগরিক।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের গিয়েরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।

যাচাই করা ভিডিওতে গিয়েরংয়ের একটি সীমান্ত চৌকিতে কাদা, পাথর ও পানির বিশাল স্রোত ধেয়ে আসতে দেখা গেছে। সেই স্রোতে বহু মানুষ ভেসে যান। পরে নেপালের দিকে নদীর নিম্নাঞ্চলেও পানির স্রোত নেমে আসে। এতে বাড়িঘর, সড়ক ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ভেসে যায়।

বন্যা থেকে বেঁচে যাওয়া ৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বারাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘এটি ছিল বিশাল কাদার স্রোত, যা সরাসরি আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি যত কাছে আসছিল, ততই উঁচু হচ্ছিল। যখন আমি দেখলাম কাদা আমাদের ঘরে ঢুকে পড়েছে, তখন আমি আমার স্ত্রীর হাত ধরে তাঁকে ছাদে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কাদার স্রোত তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।’

চার ঘণ্টা পর একটি হেলিকপ্টারে করে বারালকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে তাঁর স্ত্রীকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, 'আমার স্ত্রী এখনও কাদার নিচে কোথাও আছেন। তিনি চলে গেছেন।'

আরেকজন বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি জানান, একটি আমগাছ আঁকড়ে ধরে তিনি প্রাণে বেঁচেছেন। গাছের সঙ্গে ঝুলে থাকা অবস্থায় তিনি দেখতে পান, যে বাড়িতে তিনি কাজ করছিলেন, সেটি পানির প্রবল স্রোতে পুরোপুরি ভেসে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দিতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে নেপালের সেনাবাহিনী। ভারতের দেওয়া তাঁবু, খাবার ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী এসব হেলিকপ্টারে করে দুর্গত এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত।

উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযানে ৫ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্যকে মোতায়েন করা হয়েছে। তাঁরা জীবিতদের উদ্ধারের পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং মরদেহ উদ্ধারের কাজ করছেন।

প্রাথমিকভাবে নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ওই এলাকায় একটি ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ে বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।

তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, শুরুতে যে কম্পনকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প বলা হয়েছিল, সেটি আসলে কোনো ভূমিকম্প ছিল না। হিমবাহের বরফ ও পাথর ধসে পড়ার সময় সৃষ্ট ভূকম্পনজাত শক্তিই ওই কম্পনের কারণ। এর পরপরই বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের স্রোত নেমে আসে।

এদিকে চীনা কর্তৃপক্ষ গিয়েরং এলাকায় একটি বাঁধ দিয়ে আটকে থাকা হ্রদ নিয়ে নতুন ঝুঁকির কথা জানিয়েছে। হ্রদটি কাদাধস ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত তিব্বত-নেপাল সীমান্ত চৌকির উজানে অবস্থিত। হ্রদের পানি হঠাৎ নেমে এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে জানিয়েছে সিসিটিভি। এতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় চলমান উদ্ধার অভিযান আরও কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নিখোঁজ ও ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অনেকেই কৈলাস মানস সরোবরের তীর্থযাত্রী ছিলেন। তিব্বতের উচ্চভূমিতে অবস্থিত এই স্থানটি হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে পবিত্র।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন, মাউন্ট কৈলাস ভগবান শিবের আবাসস্থল। পাহাড়টি মানস সরোবর হ্রদের তীরে অবস্থিত। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছেই এই হ্রদ পবিত্র হিসেবে বিবেচিত।

দুর্যোগের পর নেপালকে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা একজন দুর্যোগ মোকাবিলা বিষয়ক পরামর্শক পাঠাচ্ছে এবং ৫ লাখ ডলার সহায়তা দিচ্ছে।

কানাডাও পরিস্থিতির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বন্যাকে ‘একেবারেই ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত নেপালি জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করতে জাতিসংঘের বিভিন্ন দল ও সহযোগী সংস্থাগুলো ত্রাণসামগ্রী এবং কর্মী পাঠাচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজও পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘নেপাল ... একটি উন্নয়নশীল দেশ। অস্ট্রেলিয়ায় এ ধরনের একটি দুর্যোগ মোকাবিলায় যে ধরনের সম্পদ রয়েছে, নেপালের কাছে তা নেই। তাই তথ্য পাওয়া কঠিন।’

হিমালয়ভিত্তিক একটি পর্যটন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী সাগর পান্ডে জানিয়েছেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কৈলাস মানস সরোবর তীর্থযাত্রায় যাওয়া ১৫ জন ভারতীয়-অস্ট্রেলীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।

হেলিকপ্টারে করে দুর্গত এলাকা ঘুরে দেখার পর তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘মানুষের তৈরি কোনো কিছু, কোনো জনবসতি—কিছুই অবশিষ্ট নেই। সবকিছু সমতল হয়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তাই হোটেল, রেস্তোরাঁ বা গাড়িতে যারা ছিলেন, আমার বিশ্বাস, সবাই চলে গেছেন।’

চীনের দিকে সীমান্ত এলাকায় স্থাপিত নিরাপত্তা ক্যামেরার ভিডিওতেও ভয়াবহ পরিস্থিতির চিত্র ধরা পড়েছে। সেখানে দেখা যায়, পাথর, কাদা ও পানির বিশাল স্রোত ধেয়ে আসার সময় বহু মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালাচ্ছেন। পরে সেই স্রোত ভবন ও গাড়ি ধ্বংস করে নিয়ে যায়।

নেপালের নুয়াকোট ও ধাদিং এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বজনেরা নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের খবর জানতে একটি নেপালি সেনা প্রশিক্ষণকেন্দ্রের বাইরে জড়ো হয়েছেন। ওই প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকেই দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

দুর্গত এলাকাগুলোতে কয়েক মিটার পুরু কাদার স্তর বাড়িঘর, গাছ ও গাড়িকে ঢেকে দিয়েছে। জীবিতদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে দিনভর হেলিকপ্টারগুলো ওই এলাকার আকাশে চক্কর দিয়েছে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি প্রাথমিকভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বরফ ও পাথরের একটি ভূমিধসের কারণে লহেন্দে নদীতে ধ্বংসাবশেষে ভরা ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়াগাড়ি সীমান্ত চৌকি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এই ঘটনা ঘটে।

টেলিভিশনের ফুটেজে ধসে পড়া বাড়িঘর, পানিতে ভেসে যাওয়া গাড়ি এবং বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া একটি ধাতব সেতু দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, পানির স্রোত পুরো গ্রামও তলিয়ে দিয়েছে।

রাসুয়া এলাকার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিক বলেন, ‘আমরা যেদিকেই তাকাই, সেদিকেই ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে পাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, ‘নদীর পাশে থাকা জনবসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে। আমার নিজের পাঁচজন আত্মীয় নিখোঁজ।’

বাড়িতে ঢুকে মডেল মুসকানকে কুপিয়ে হত্যা
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬
জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে জেডএনআরএফ ইউনিভার্সিটিতে ফ্রেশার্স ওরিয়…
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬
জিম থেকে বের হতেই একের পর এক গুলি, প্রাণ হারালেন জনপ্রিয় গা…
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ৬ জনকে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির …
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬
ওয়ালটন প্লাজা নিয়োগ দেবে ২০০ ডেপুটি ম্যানেজার, আবেদন ১০ সেপ…
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬
পূর্বশত্রুতার জেরে ধানক্ষেত নষ্টের অভিযোগ, থানায় অভিযোগ
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬