দিনের অভিযান ব্যর্থ, গভীর অন্ধকারে রুদ্ধশ্বাস মিশনে যেভাবে উদ্ধার হয় মার্কিন ক্রু

০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১২ PM
যুক্তরাষ্ট্রের সি-১৩০ বিমান

যুক্তরাষ্ট্রের সি-১৩০ বিমান © সংগৃহীত

বহু ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত ভূপাতিত এফ-১৫ ঈগল যুদ্ধবিমানের ওয়েপনস স্পেশালিস্ট অফিসারকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দিনের আলোতে প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় দফায় রাতের অন্ধকারে চালানো অভিযানে আসে সাফল্য। মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষক সাবিনা আহমেদ এই মিশন নিয়ে ব্যাখ্যামূলক আলোচনা করেছেন। রবিবার (৫ এপ্রিল) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি বিষয়টি তুলে ধরেন।

তার দেওয়া পোস্টটি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে দেওয়া হলো-

‘আমেরিকা অবশেষে গতকালের ভূপাতিত এফ-১৫ ঈগলের ওয়েপনস স্পেশালিস্ট অফিসারকে (ডব্লিউএসও) উদ্ধার করতে পেরেছে। প্রথমবারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয়বারেরটা সাকসেসফুল হয়েছে। আমেরিকার এই কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ অপারেশনে টেকনোলজি, টেরেইন আর কিছু স্মার্ট ট্যাকটিক্স তাদের পক্ষে ছিলো, তাই এই উদ্ধার কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। যদিও আমেরিকান পক্ষ বলেছে এটা তাদের জীবনের কঠিনতম উদ্ধারকাজ ছিলো।

খুব ছোট ছোট, ১-২ সেকেন্ডের বার্স্টে ডেটা পাঠিয়েছে। এতে শত্রুপক্ষের পক্ষে সিগন্যাল ধরা খুব কঠিন। এটাকে বলে Low Probability of Intercept (LPI)। রাশিয়া-চীনের স্যাটেলাইটগুলোর গ্লোবাল SIGINT ক্যাপাবিলিটি আছে, কিন্তু US মিলিটারি কমিউনিকেশনের এনক্রিপশন ভাঙার মতো রিয়েল-টাইম ক্ষমতা এখনো তাদের নেই। সময় নিয়ে অবশ্য তারা এনক্রিপশন ভাঙতে পারত। টাইমিং ইজ অফ এসেন্স হিয়ার। 

প্রথম অভিযানটা দিনের বেলায় হয়েছিল। কিন্তু ছিলো পুরোপুরি ব্যর্থ। যাতে দুটো আমেরিকান ব্ল্যাকহক/পেভ হক হেলিকপ্টার গ্রাউন্ড থেকে স্থানীয় ইরানিরা শ্যুট করে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যার একটা ক্র্যাশ ল্যান্ডিং-এর মতো অবস্থায় ছিলো। একটা এ-১০ অ্যাটাক প্লেনও হারিয়েছে, যার পাইলট নিরাপদে ইজেক্ট করে কুয়েত বা পারস্য উপসাগরের কাছে উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধার কাজে জড়িত কিছু আমেরিকান ক্রু আহত হয়েছে।

কিন্তু দ্বিতীয় অভিযানটা হয়েছে রাতের অন্ধকারে। এই অন্ধকারের সুবিধা নিয়ে, অফিসারের সঠিক অবস্থান জেনে তারা অপারেশনে আসে। অফিসার তখন অবস্থান করছিল ইরানের একটা খুব দুর্গম, কম জনবসতির পাহাড়ি প্রান্তিক প্রদেশে; চাহারমাহাল ও বাখতিয়ারি বা খুজেস্তানের কাছাকাছি এলাকা। যা ছিল ইরানের সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক ডজন কিলোমিটার দূরে। দুই দিন ধরে জঙ্গল-পাহাড়ের মাঝে লুকিয়ে থেকে অফিসার জিপিএস আর স্যাটেলাইট ফোন দিয়ে এনক্রিপ্টেড মেসেজ পাঠিয়ে আমেরিকান বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে।

ফক্স নিউজসহ বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, সিআইএ এখানে একটা  ডিসেপশন মেথড ব্যবহার করে  ইচ্ছা করে ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। তারা ইরানের ভেতরে গুজব ছড়িয়েছে যে, “আমেরিকানরা ইতিমধ্যে অফিসারকে খুঁজে পেয়েছে এবং স্থলপথে বের করে নিয়ে যাচ্ছে”। উদ্দেশ্য ছিলো  ইরানি সার্চ টিম ও আইআরজিসি কি বিভ্রান্ত করা। এরপর সিআইএ তাদের অ্যাডভান্সড ট্র্যাকিং সিস্টেম দিয়ে ভূমি থেকে প্রায় ৭০০০ ফুট উপরে পাহাড়ের খাঁজে লুকানো অফিসারের সঠিক লোকেশন পিনপয়েন্ট করে পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসকে জানায়। ট্রাম্প তখনই রেসকিউ অর্ডার দেন।

আমেরিকান স্পেশাল অপারেশনস ফোর্স আর এয়ারফোর্স এর স্পেশাল ওয়্যারফেয়ার টিম রাতের বেলায় গ্রাউন্ডে নামে। কিন্তু ইরানি ফোর্সের সাথে তাদের  ভারী ফায়ারফাইট হয়। অর্থাৎ, ইরানি ফোর্সও সেখানে উপস্থিত ছিলো, কেবল জানতে পারেনি অফিসারের এক্সাক্ট লোকেশন। আমেরিকান স্পেশাল ফোর্স রাতের অন্ধকার, সঠিক লোকেশন, এবং এয়ার কভারের সাহায্যে অফিসার কে উদ্ধার করে নিয়ে আসে ভোরে। 

প্রশ্ন আসে ইরান কেন আগে এই ডব্লিউএসও-কে খুঁজে পায়নি? কারণ এলাকাটা অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি/জঙ্গল আর জনবিরল। সেখানে ইরানের অ্যাডভান্সড SIGINT কভারেজ খুব দুর্বল। দ্রুত ডেপ্লয় করার মতো ইকুইপমেন্টও হয়তো তাদের ছিল না। তার উপর সিআইএ-র ডিসেপশন তাদের হয়তো কিছুটা  বিভ্রান্ত করেছে। অন্যদিকে আমেরিকানরা রিয়েল-টাইম লোকেশন জানতো, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল, আর সীমান্তের কাছে থাকায় তাদের সাড়া দেওয়া অনেক সহজ হয়েছে। রাতের অন্ধকারে দ্বিতীয় অভিযানটা চালানোয় ইরানের রাডার বা নজরদারি এড়ানো আরও সহজ হয়েছে।

এবার প্রশ্ন আসে কেন অফিসারের জিপিএস লোকেশন পাঠানোর মেসেজটা ইরান-রাশিয়া-চীন কেউই ইন্টারসেপ্ট করতে পারেনি? কারণ অফিসার যখন তার GPS লোকেশন US টিমকে পাঠিয়েছে, তখন সেটা কোনো সাধারণ মোবাইল বা ওয়াটসঅ্যাপ মেসেজ ছিল না। সে ব্যবহার করেছে “মিলিটারি-গ্রেড এনক্রিপ্টেড সারভাইভাল রেডিও”, যেমন HOOK3 বা CSEL টাইপের আধুনিক রেডিও। তার পাঠানো মেসেজটা AES-256 বা তার চেয়েও উন্নত টাইপ-১ এনক্রিপশন দিয়ে এনক্রিপ্ট করা ছিল। এটা NSA-অ্যাপ্রুভড মিলিটারি ক্রিপ্টো। 

সাবিনা আহমেদ

ইরান, রাশিয়া বা চীনের কাছে যতই অ্যাডভান্সড কম্পিউটার থাকুক, এই এনক্রিপশন রিয়েল-টাইমে ভাঙা প্রায় অসম্ভব। শুধুমাত্র US-এর কাছে সিক্রেট কী (key) আছে।  ইরান এই সিগন্যাল ধরতে পড়লেও, ভেতরের GPS কোঅর্ডিনেটগুলো তাদের সহজে পড়তে পারার কথা না। শুধু “কিছু একটা সিগন্যাল গেছে” ইরানি ফোর্স বুঝতে পেরেছে, কিন্তু কোথায় সেই সিগন্যাল যাচ্ছে সেটা বোঝেনি। 

তাছাড়া, অফিসার সম্ভবত ট্রেনিং অনুযায়ী একনাগাড়ে কথা বলেনি। খুব ছোট ছোট, ১-২ সেকেন্ডের বার্স্টে ডেটা পাঠিয়েছে। এতে শত্রুপক্ষের পক্ষে সিগন্যাল ধরা খুব কঠিন। এটাকে বলে Low Probability of Intercept (LPI)। রাশিয়া-চীনের স্যাটেলাইটগুলোর গ্লোবাল SIGINT ক্যাপাবিলিটি আছে, কিন্তু US মিলিটারি কমিউনিকেশনের এনক্রিপশন ভাঙার মতো রিয়েল-টাইম ক্ষমতা এখনো তাদের নেই। সময় নিয়ে অবশ্য তারা এনক্রিপশন ভাঙতে পারত। টাইমিং ইজ অফ এসেন্স হিয়ার। 

এসবই আধুনিক যুদ্ধের টেকনোলজি আর এনক্রিপশনের খেলা। প্রথম দিনের ব্যর্থ অভিযানে যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্বিতীয়বার তারা সঠিকভাবে কাজটা করেছে। এটা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে পুরো ঘটনাটা দেখলে বোঝা যায় — দুর্গম এলাকা, আধুনিক টেক, সিআইএ-র ডিসেপশন আর সীমান্তের কাছাকাছি থাকাটাই এই সাফল্যের বড় কারণ। সব মিলিয়ে এটা একটা ভালো অপারেশন ছিলো।

যাই হোক, আগামী কাল ট্রাম্পের দেওয়া ডেডলাইন শেষ হবে, তারপর ট্রাম্পের আর পিটার হেগসেথের কথা অনুযায়ী তারা ইরানকে প্রস্তর যুগে নিয়ে যাবে।’

ট্যাগ: ইরান
স্বাস্থ্যে বাজেট বৃদ্ধি তখনই কার্যকর হবে, যখন তামাকের ব্যবহ…
  • ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাবির তিন অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ট্রাইবুনাল, একজনের বিরুদ্ধে তদ…
  • ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালে দুর্ঘটনা, বিমানবাহিন…
  • ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নবম পে-স্কেলের প্রস্তাবিত গেজেট দেখুন এখানে
  • ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাশেদ খাঁনকে ২০১৯ সালের ডাকসুর জিএস ঘোষণা
  • ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকে নতুন ১৫ পরিচালক, অব্যাহতি ১০ জন
  • ৩১ আগস্ট ২০২৬