তীব্র গ্যাস সংকটে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। © বিবিসি বাংলা
বাংলাদেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটে টেক্সটাইল মিল, ডাইং ও ফিনিশিং কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। গতকাল দুপুর থেকে অনেক স্থানে গ্যাসের চাপ পাওয়া গেলেও অনেক স্থানে পরিস্থিতি এখনও আগের অবস্থায় ফেরেনি। বিশেষ করে, ময়মনসিংহের ভালুকা বা গাজীপুরের শ্রীপুরে এখনও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
গত ২০ দিন ধরে চলমান এই গ্যাস সংকটকে 'নজিরবিহীন' কিংবা 'অস্বাভাবিক' বলে মনে করছেন শিল্পমালিকরা। তারা বলছেন, এবার তারা অপরিসীম ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারা, বাড়তি খরচ গোণা, এমনকি ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশ হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা।
এদিকে, সরকার থেকে গতকালই জানিয়েছে যে দেশের চলমান জ্বালানি সংকটের সমাধান ছয় মাস এক বছরে হবে না, কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগতে পারে।
বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন যে গ্যাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন যে পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, তার কোনো রাতারাতি সমাধান নেই। কিন্তু হাতের নাগালেই এমন কিছু উপায় রয়েছে, যেগুলো গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হলে এই সংকট থেকে উত্তরণ করা অনেকটাই সম্ভব।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সরবরাহ সক্ষমতা আছে দুই হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তাহলে দৈনিক গ্যাসের ঘাটতি অন্তত এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, যা মোট চাহিদার প্রায় ২৬ থেকে ২৯ শতাংশ। এই ঘাটতি নিশ্চিত করা হয় বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির মাধ্যমে। বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দু'টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ রয়েছে।
এক্সিলারেট এনার্জি এবং সামিট গ্রুপ পরিচালিত এই টার্মিনালগুলোর মাধ্যমেই বিদেশ থেকে আনা এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন বা রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। তবে গত ২১শে জুলাই আগুনে সেই এলএনজি টার্মিনালের একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শুরুতে এই সংকটকে সাময়িক হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ত্রুটি চিহ্নিত করতে সময় বেশি লাগার কারণেই প্রেক্ষাপট আরও জটিল হয়েছে। গতকাল দু'টো এলএনজি টার্মিনালই হয়েছে এবং গ্যাস সরবরাহও কিছুটা বেড়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সংকট তীব্র হওয়ার পেছনে, এর পেছনে মূল কারণ ত্রুটিযুক্ত এফএসআরইউ না।
বরং, সংকটের একটি বড় কারণ হলো দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং সেই ঘাটতি পূরণে পর্যাপ্ত নতুন গ্যাসক্ষেত্র বা কূপ থেকে উৎপাদন যোগ না হওয়া। ফলে কয়েক বছর ধরেই বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও আবাসিক গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে।
আর দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি সামাল দিতে বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানি করে সেগুলো জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে হয়। অর্থাৎ, দেশের গ্যাস সরবরাহ এখন শুধু নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়, আমদানি করা এলএনজিও গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ২০১৮ সাল থেকে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ এলএনজি থেকে এবং বাকি ৭০ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে আসছে। কিন্তু আমদানি করা এলএনজির খরচ দেশীয় গ্যাসের তুলনায় অনেক বেশি বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। কিন্তু ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতা এখনও চলছে। তাই, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি আমদানি করার ক্ষেত্রেও একপ্রকার জটিলতা তৈরি হয়ে আছে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের হিসাবে, দেশীয় উৎস থেকে ৭০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহে বছরে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাকি ৩০ শতাংশ এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। ফলে সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে এলএনজিনির্ভর সমাধান ব্যয়বহুল হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে আমদানি নির্ভরতাও বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
গ্যাস সংকটের কারণে গ্যাসনির্ভর টেক্সটাইল, নিটওয়্যার, ডাইং ও ফিনিশিং কারখানাগুলোর ক্ষতি হচ্ছে। কোথাও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে, আবার কোথাও সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন হচ্ছে।
পরিস্থিতির উন্নতি হবে কবে?
চলমান জ্বালানি সংকট সমাধানে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। কারণ হিসেবে মি. চৌধুরী বলেন, "ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করতেও দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগবে। ফলে এর আগে সমস্যার সমাধান হবে না।"
তিনি আরও জানান, সম্ভাব্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সরকার দ্রুত সেসব নিচ্ছে। "দীর্ঘ সময় গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়নি। এখন সেটা করা হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে কাজ হচ্ছে, কয়লা নিয়ে কাজ হচ্ছে। কোন ধরনের জ্বালানি কত পরিমাণ লাগবে, তা নির্ধারণ করা হচ্ছে।"
চলমান জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই বলেই অর্থমন্ত্রী অন্তত দুই বছর সময় লাগার কথা বলেছেন বলে মনে করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তার ভাষায়, "কোনো কুইক ফিক্সই সাসটেইনেবল নয়। এর কস্ট ইমপ্লিকেশনও অনেক বেশি।"
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদায় ঘাটতি আছে। তুন সংযোগের অপেক্ষায় থাকা গ্রাহকদের চাহিদা যুক্ত হলে চাহিদা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে। ফলে শুধু গ্যাসের সরবরাহ বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না। স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার (ছাতক) উপজেলায় অবস্থিত গ্যাসক্ষেত্র টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রের বিডিং প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা এবং পুরনো কূপগুলো থেকে পাওয়া গ্যাস দ্রুত গ্রিডে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তার মতে, "আমাদের এখানে আরও এলএনজি প্লান্টের কথা বলা হচ্ছে। এটি আরও দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি নির্ভরশীলতা বাড়াবে। কিন্তু এগুলোর বিকল্প হলো অভ্যন্তরীন গ্যাস এক্সপ্লোরেশন। সরকার কয়লা এক্সপ্লোরেশনে যাওয়ার কথা বলছে, কিন্তু এটি সলিউশন না।" তবে এসব উদ্যোগ নিলেই চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান পুরোপুরি দূর হবে না বলে মনে করেন তিনি। এজন্য শিল্পে জ্বালানির যথাযথ ব্যবহার এবং যেখানে সম্ভব গ্যাস ও তেলের বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি আরও জানান, শিল্প খাতে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার বাড়াতে হবে। যেমন, গ্যাসচালিত বয়লারের পরিবর্তে ইলেকট্রিক বয়লার ব্যবহার করা যেতে পারে। একইভাবে যানবাহনে তেলের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক গাড়ি, বাসাবাড়ির রান্নায় গ্যাসের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ বা এলপিজি এবং সেচে ডিজেলের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। থ্রি-হুইলারে অবৈধভাবে জ্বালানি ব্যবহারের পাশাপাশি কারখানাতেও অবৈধ ব্যবহারের নজির রয়েছে। কোনো কোনো কারখানা পাশের সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস কিনে এনে ব্যবহার করছে। বাসাবাড়িতেও অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে।