© লোগো
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্রশাসনের অনিয়ম ও দুর্নীতি বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে উপাচার্যসহ ৮ জনের কাছে কৈফিয়ত চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত বৃহস্পতিবার (১০ ডিসেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নীলিমা আফরোজ স্বাক্ষরিত মোট ১২টি চিঠির ইস্যু করা হয়েছে।
এসব চিঠিতে উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান, উপ-উপাচার্য চৌধুরী মোহাম্মদ জাকারিয়াসহ কয়েকজনের কাছে কৈফিয়ত চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. এম এ বারীকে অব্যাহতি দিতে। সাথে সাথে সকল প্রকার নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার নির্দেশনাও এসেছে।
জানা গেছে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তনের ঘটনায় চলতি বছরের শুরুর দিকে রাবির উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেন রাবির অর্ধশতাধিক শিক্ষক ও কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী সদস্য ড. দিল আফরোজ বেগমকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। ওই কমিটি গত ২২ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে জমা দেয়।
ইউজিসির ওই তদন্তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম আবদুস সোবহান ও তার নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা বেশকিছু অভিযোগের সত্যতা মেলে। প্রতিবেদনে অনিয়মের প্রমাণগুলো তুলে ধরে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করে ইউজিসির তদন্ত দল। ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে সম্প্রতি বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত বৃহস্পতিবার রাবি উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যসহ কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একদিনে ১২টি চিঠি ইস্যু করেছে মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নীলিমা আফরোজ বলেন, উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনার আলোকে চিঠিগুলো ইস্যু করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো উচ্চ পর্যায় থেকে নেয়া হবে। এ বিষয়ে আমার কোনো ধরনের মন্তব্য করার সুযোগ নেই।
সাতজনের কাছে কৈফিয়ত তলব
সাতজনের কাছে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ নীতিমালা ২০১৫ এর শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে ২০১৭ এর পরিবর্তিত নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে ইউজিসি তদন্ত কমিটি। পরিবর্তিত নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত থাকার কারণে কেনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না সে বিষয়ে পত্র প্রাপ্তির সাত কর্মদিবসের মধ্যে কৈফিয়ত দিতে বলা হয়েছে।
তারা হলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী মো জাকারিয়া, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এম এ বারী, আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান ও সহকারী অধ্যাপক শিবলী ইসলাম, ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স এর সহকারী অধ্যাপক গাজী তৌহিদুর রহমান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এম মজিবুর রহমান এবং রেজিস্ট্রার দপ্তরের ডেপুটি রেজিস্ট্রার সাখাওয়াত হোসেন টুটুল।
এছাড়া নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন করে মেয়ে সানজানা সোবহানকে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি বিভাগ ও মেয়ের স্বামী এটিএম শাহেদ পারভেজকে ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিউিটটে (আইবিএ) প্রভাষক পদে নিয়োগ দিয়ে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম করা হয়েছে জানিয়ে উক্ত নিয়োগ কেনো বাতিল করা হবে না, উপাচার্যকে ৭ দিনের তার ব্যাখ্যা মধ্যে দিতে বলা হয়েছে।
রেজিস্ট্রারকে অব্যাহতি দিতে নির্দেশ
এদিকে একটি চিঠিতে ইউজিসির তদন্ত কমিটিকে বিভিন্ন পর্যায়ে অসহযোগিতা করায় অসদাচরণের সামিল হয়েছে জানিয়ে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী রেজিস্ট্রারের পদ থেকে অধ্যাপক ড. এম এ বারীকে অব্যাহতি দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ বিষয় কথা বলতে অধ্যাপক বারীর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি তো একটা মিটিংয়ে আছি।’
বাড়ি দখলে রাখার ক্ষতিপূরণ কোষাগারে জমা দিতে হবে
উপাচার্য প্রফেসর এম আব্দুস সোবহান ডুপ্লেক্স বাড়ি নিয়ম বহির্ভূতভাবে দখলে রাখায় ৫ লাখ ৬১ হাজার ৬০০ টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ওই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে চালানের কপি জরুরী ভিত্তিতে এ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে জানতে উপাচার্যকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও বরাবরের মতো তাকে পাওয়া যায়নি।
সিনিয়র সহকারী সচিব নীলিমা আফরোজ স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রকার নিয়োগ স্থগিত রাখতে নির্দেশনা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
তাছাড়া আরেক চিঠিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭ সালের নিয়ােগ নীতিমালা বাতিল করে ১৯৭৩ এর আদেশ অনুযায়ী পরিচালিত অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় যেমন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়ােগ নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এদিকে, মন্ত্রণালয়ের এসব পদক্ষেপ স্বাগত জানিয়ে উপাচার্যকে পদত্যাগের আহবান জানিয়েছেন বর্তমান প্রশাসনের দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি নিয়ে অভিযোগকারী শিক্ষকরা। তাদের একজন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি বিরোধী শিক্ষক সমাজের আহবায়ক অধ্যাপক ড. সুলতান উল ইসলাম।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এসব নির্দেশনা সম্পর্কে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় যে নির্দেশনা দিয়েছে সেটা বাস্তবায়ন হোক সেটাই আমাদের প্রথম প্রত্যাশা। দেশের সরকার এটা ইস্যু করেছে, আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেটা বাস্তবায়ন করবে না অমান্য করবে সেটা দেখার বিষয়।'
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন কি এক্ষেত্রে কোন বাধার সৃষ্টি করতে পারে? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, স্বায়ত্তশাসন মানে এই না যে কাউকে অন্যায় করার সার্টিফিকেট দেয়া হবে। গত একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিংয়ে উপাচার্য নিজেই বলেছিলেন সরকারি কাজে বাধার সৃষ্টি করা যাবে না। আমরাও প্রত্যাশা করবো উনি যেনো সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি না করেন। কারণ সরকার আমাদের। আর অমান্য করলে উনি রাষ্ট্রদ্রোহী।
সেক্ষেত্রে দুর্নীতি বিরোধী শিক্ষক সমাজের পদক্ষেপ কী হবে? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এভাবে যদি অমান্য হতেই থাকে। বাংলাদেশে অতীতে স্বৈরাচারীদের উৎখাত করা হয়েছিল সেভাবে সকলে মিলে উৎখাত করবে। কারণ আমরা তো আইনের শাসন চাই। আমরা চাইনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রণক্ষেত্র হোক। কোন অন্যায় অত্যাচারের চারণক্ষেত্র হোক সেটা চাইনা।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. ইফতেখারুল আলম মাসউদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নির্দেশনা আসাটা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি কলঙ্ক লেপন করেছে। বড় অনিয়ম না করলে অবশ্যই এসব নির্দেশনা আসতো না। প্রশাসন বিষয়টাতে এক ধরনের বেকায়দায় পড়েছে বলতে হবে।