প্রক্টরের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের জের, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীসহ কয়েকজনকে প্রকাশ্যে পেটালেন রাকসুর আম্মার

২৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৫ PM , আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৪ PM
ছাত্রলীগ কর্মীসহ কয়েকজনকে প্রকাশ্যে পেটালেন রাকসুর আম্মার

ছাত্রলীগ কর্মীসহ কয়েকজনকে প্রকাশ্যে পেটালেন রাকসুর আম্মার © টিডিসি সম্পাদিত

প্রক্টরের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের জেরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক এক কর্মীসহ দুই শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় বেধড়ক পেটানো হয়েছে। এ সময় আরও কয়েকজন মারধরের শিকার হয়েছেন। আজ সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুর ও বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ভেতরে দফায় দফায় এই ঘটনা ঘটে। রাত ৮টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।

জানা যায়, গতকাল রবিবার (২৬ জুলাই) সংস্কৃত বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী তার নিজ বিভাগের জ্যেষ্ঠ ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মহসিন আলমের বিরুদ্ধে প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় হুমকির অভিযোগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গতকাল রাতে একটি সভায় বসেন প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। এ সময় তার সঙ্গে নিজ এলাকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৭-১৮ বর্ষের আনাস, সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসানসহ কয়েকজন সেখানে যায়। পরে তারা অভিযোগটি অস্বীকার করে প্রক্টরের সঙ্গে উচ্চবাচ্য করেন।

এ বিষয়ে আজ দুপুরে আবারও একটি সভা ডাকেন প্রক্টর। ওই সভায় উপস্থিত হয়ে আনাসকে ছাত্রলীগ কর্মী বলে অভিযোগ করেন রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার, এসজিএস এস এম সালমান সাব্বিরসহ রাকসুর নেতারা। পরে রাকসু নেতারা আনাসের মোবাইল ফোন চেক করে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ-হীল গালিবসহ কয়েকজন নেতার সঙ্গে আনাসের ছবি খুজেঁ বের করেন। পরে তাকে প্রক্টর দপ্তরে জিএস আম্মার ও এজিএস সালমান সাব্বির মারধর করেন। পরে বিষয়টি দুপুরেই প্রক্টর বিষয়টির সাময়িক সমাধান করে দেন এবং আনাসসহ বাকিরা প্রক্টর দপ্তর থেকে চলে আসেন।

এরপরে বিকেল তিনটার দিকে আনাস, মাহমুদুলসহ কয়েকজন এই ঘটনার জেরে রাকসু ভবনে অতর্কিত হামলা করেন। এতে রাকসুর তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিব আহত হন। পরে রাকসু নেতারা তাদের ওপরে পাল্টা চড়াও হলে সেখান থেকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের সামনে আসেন।

এরপর সেখানে আসেন রাকসু জিএস আম্মার, এজিএস সালমান সাব্বির, আহত বিএম নাজমুস সাকিব, সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সিফাত আবু সালেহ, শাখা শিবিরের সেক্রেটারি মেহেদী হাসান, প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মেহেদী সজীব, দপ্তর সম্পাদক মানাজির আহাসান, অর্থ সম্পাদক শামীম পাটোয়ারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ও শাখা শিবিরের ক্যাম্পাস মনিটরিং কো-অর্ডিনেটর ফজলে রাব্বি মোহাম্মদ ফাহিম রেজা, শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলাম, শহীদ হবিবুর রহমান হল সংসদের ভিপি আহসানুল্লাহ ফারহান, জিএস আশিক শিকদার, নবাব আব্দুল লতীফ হল জিএস নুরুল ইসলাম শহীদ, ‘শিবির ক্যাডার’ রমজান আলীসহ অন্যান্যরা।

এ সময় রাকসু জিএস আম্মার দূর থেকে ওই শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। গ্রন্থাগারের সামনে থেকে ওই শিক্ষার্থীরাও গালির প্রত্যুত্তর দেন। এক পর্যায়ে সালাহউদ্দিন আম্মার ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। এ সময় প্রক্টর মাহবুবর রহমান তাদেরকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে পাঠকক্ষের ভেতরে নিয়ে যান। পরে শিবির ও রাকসু নেতারা পাঠকক্ষের ভেতরে ঢুকেই ওই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে তুমুল মারধর শুরু করেন। এ সময় তারা হাতের কাছে পাওয়া কাঠ, বাশ, রড, বেল্টসহ লাঠিসোঁটা দিয়ে তাদেরকে পেটান রাকসু ও শিবির নেতারা। পরে তাদের হামলা ঠেকাতে পাঠাগারের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসলে তাদেরও মারধর করেন তারা।

পরে ওই শিক্ষার্থীদের আহত অবস্থায় রেখে শিবির ও রাকসু নেতাদের পাঠ কক্ষ থেকে বের করে দেন প্রক্টরিয়াল বডি, পুলিশ সদস্য ও পাঠাগারের শিক্ষার্থীরা। এর কিছু সময় পরে গুরুতর আহত মাহমুদুল হাসানকে ভেতরের একটি গেট দিয়ে নিয়ে মূল ফটক দিয়ে এম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিনসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক। পরে এম্বুলেন্সে তোলার সময় ফাহিম রেজা ও ‘শিবির ক্যাডার’ রমজান আলী ‘আমার ভাইদের মারলি কেন?’ বলে আরও এক দফা হামলা করেন। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে তাকে নামিয়ে আবারও বেধড়ক লাথি মারেন এবং টেনে হিচড়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। পরে প্রক্টরিয়াল বডি, পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের সহায়তায় হাসপাতালে পাঠানো হয়। এর পরে রাকসু ও শিবির নেতারা এক হয়ে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’, ‘হাতে তালি, শিবির’, ‘মুখে বলি, শিবির’, ‘ছাত্রলীগের ঠিকানা, এই ক্যাম্পাসে হবে না’। পরে বিকেল সাড়ে চারটা থেকে বিকেল পৌনে ৬টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিচার দাবিতে উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও করে অবস্থান করছে শিবিরের নেতাকর্মীরা।

হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে পাঠকক্ষে অধ্যয়নরত পদার্থ বিজ্ঞানের ১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হেলাল উদ্দীন বলেন, আমরা এখানে পড়তেছিলাম। তারপর তারা অতর্কিত সবাই রিডিং রুমে ঢুকে পড়ে। তারা যাকে পাচ্ছে তাকেই ছাত্রলীগ ট্যাগ দিচ্ছে। অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের দিকেও তারা উগ্র হয় এবং হামলা করে। মতের পার্থক্য থাকলেই তাকে ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে মেরে ফেলতে চাচ্ছে। ছাত্রলীগ হলেও তাকে মেরে ফেলার অধিকার তো কারও নাই। বিচারের জন্য দেশে আইন আছে।

হামলার শিকার সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী আনাস বলেন, ‘আজকে আমাদের প্রক্টর অফিসে ডাকা হয়। সেখানে তারা আমাকে ছাত্রলীগ ট্যাগ দেয়। সালাউদ্দিন আম্মার লোকজন নিয়ে এসে আমাকে মারা শুরু করে। তারপর আমাদের প্রক্টর অফিস থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর আমরা সেখান থেকে লাইব্রেরিতে চলে আসি। এরপর অন্য কেউ হয়তো রাকসুর সামনে তাদের সাথে হাতাহাতি করে। তারপর আম্মার লোকজন নিয়ে এসে লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে আমাকে মারধর করে। আমার উপর কমপক্ষে ২০০টিরও বেশি আঘাত করা হয়েছে।

তিনি ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী নন এ বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতে আমার বন্ধুরা হয়তো ছাত্রলীগ করতো তাই হয়তো কোনো এক জায়গায় তাদের সাথে আমার ছবি রয়েছে। তবে ছাত্রলীগের ব্যানার - ফেস্টুনে আমার কোনো ছবি নেই।

হামলার বিষয়ে শিবিরের দায় অস্বীকার করে শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, ‘এখানে শিবিরের কেউ ছিলো না। আমরা আমাদের ভাই রাকসু নেতাদের হামলার কথা শুনে দ্রুত এখানে আসি। এখানে এসে এই পরিস্থিতি দেখতে পাই।’ হামলার ঘটনায় শিবিরকে দেখা গেছে এবং এর ভিডিও ফুটেজও আছে, এটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।


জানতে চাইলে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘আমাদের রাকসু ভবনে গিয়ে মারধর করেছে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। প্রশাসনকে আমরা ছাত্রলীগের ওই নেতাকে পুলিশে দেওয়ার আহ্বান জানাই। তবে তারা তাকে কিছুই করেনি। আমাদের ওপরে হামলার পরে বাধ্য হয়ে আমাদের এখানে আসতে হলো।

এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, যে নারীকে নিয়ে ঝামেলার শুরু, আমরা জেনেছি তাকে শিবিরের এক নেতা পছন্দ করতেন। এই কারণে একটি নারী ঘটিত বিষয়কে গোপনে সমাধান না করে শিবিরের সন্ত্রাসী বাহিনী রাজনৈতিক রূপ দিয়েছে। আমরা আমাদের পবিত্র জায়গা লাইব্রেরিতে শিবিরের এই হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। যারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপরে ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে নির্মম হামলা চালিয়েছে তাদের ছাত্র সংসদের পদ ও ছাত্রত্ব উভয়ই বাতিল করতে হবে।

এ সময় আহত রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস সাকিব বলেন, আনাস প্রক্টর অফিস থেকে বের হয়ে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীসহ রাকসু ভবনে এসে জিয়া হলের জিএস আরিফকে খুঁজতে থাকে। আমি বলি, আরিফ জিয়া হলে থাকবে, রাকসু ভবনে কেন খুঁজতে আসছেন। এরপর আনাসসহ কয়েকজন রাকসু জিএসের কক্ষে গিয়ে তার সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ায়।

তিনি আরও বলেন, একপর্যায়ে আনাসের সঙ্গে থাকা ছাত্রদলের কয়েকজন মিলে আম্মারের ওপর হামলা করে রাকসু ভবন থেকে বেরিয়ে লাইব্রেরির দিকে চলে যায়। এরপর প্রক্টর স্যার ওদের সেইফ এক্সিট দিয়েছেন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, আমরা খুব দ্রুত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। আজকের মধ্যেই আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানাব।

বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম 
  • ২৭ জুলাই ২০২৬
পবিপ্রবিতে নতুন উপ-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ
  • ২৭ জুলাই ২০২৬
দায়িত্ব নিলেন ইবির নতুন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক এমতাজ হোসেন
  • ২৭ জুলাই ২০২৬
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে বেসামরিক ১৭৪ পদে বড় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি,…
  • ২৭ জুলাই ২০২৬
বন্যায় বইপত্র-শিক্ষা উপকরণ নষ্ট হওয়া সানজিদার পাশে ছাত্রদল …
  • ২৭ জুলাই ২০২৬
পাবনায় ট্রান্সফরমার চোর চক্রের ৬ সদস্য গ্রেপ্তার, চোরাই মাল…
  • ২৭ জুলাই ২০২৬