জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ, কী ঘটেছিল আসলে?

১৪ মে ২০২৬, ০৮:৩৫ PM
ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাতভর আন্দোলন

ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাতভর আন্দোলন © সংগৃহীত

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে একজন শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাতভর আন্দোলন হয়েছে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করার আলটিমেটাম দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনায় বাংলাদেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে।

মঙ্গলবার রাতে ক্যাম্পাসেরই একটি সড়ক থেকে ওই শিক্ষার্থীকে টেনে-হিঁচড়ে পাশের ঝোপঝাঁড়ে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বুধবার ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার মামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ ও অভিযুক্ত ব্যক্তির চেহারা শনাক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘সিসি ফুটেজের মাধ্যমে আসামির চেহারা শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু আসামির নাম পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আমরা চেষ্টা করছি যত দ্রুত সম্ভব আসামিকে গ্রেফতার করা যায়।’

অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই এলাকারই বাসিন্দা কি না জানতে চাইলে এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ‘এটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।’

অভিযুক্ত ব্যক্তির তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে ঢাকা জেলা পুলিশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছে। অতীতেও এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ধর্ষণের মতো ঘটনার অভিযোগ উঠেছে। এখনো কেন ক্যাম্পাসটি অনিরাপদ সেই প্রশ্ন সামনে আসছে।

ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ ও নিরাপত্তার প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কেন প্রশ্নের মুখে পড়ছে- জানতে চাইলে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা বলেন প্রক্টর অধ্যাপক রাশিদুল আলম।

প্রক্টর অধ্যাপক রাশিদুল আলম বলেন, বর্তমান প্রশাসন তো দেড় বছর হলো এসেছে, কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সিসিটিভি ক্যামেরাই ছিল না, আমরা নিরাপত্তা বেষ্টনী দৃঢ় করার জন্য ইতোমধ্যেই আড়াইশ'র বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা সংযুক্ত করেছি।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে অংশীজনদের সহযোগিতা চাওয়ার কথাও জানান তিনি।

কী ঘটেছে বুধবার রাতে?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সিসিটিভি ফুটেজকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বলে অনেকে দাবি করছেন এবং ওই ভিডিওতে একজন ব্যক্তিকে ক্যাম্পাসের ভেতরে লক্ষ্যহীনভাবে হেঁটে যেতে দেখা যায়।

ভিডিওটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বলেই পুলিশ মনে করছে, তবে এই ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। পুলিশ ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, অভিযোগকারী শিক্ষার্থী মঙ্গলবার রাত এগারোটার দিকে পরিত্যক্ত ফজিলাতুন্নেছা হলের সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন।

এ সময় ওই ব্যক্তি তার সাথে কথা বলতে চাইলে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের কি না প্রশ্ন করেন অভিযোগকারী শিক্ষার্থী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মতো ব্যাচের নাম উল্লেখ করে পরিচয় দেয়।

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা বোঝা গেছে যে সে এখানকার সাথে পরিচিত। ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টরা কীভাবে পরিচয় দেয় এটা সে জানে।’

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষার্থী জানান, ঘটনার সম্পর্কে অভিযোগকারী তাদের বলছেন, এরপরই তাকে টেনে পাশের ঝোপের অন্ধকারে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে ওই ব্যক্তি এবং তিনি চিৎকার শুরু করেন। চিৎকার শুনে কয়েকজন এগিয়ে এলে তিনি ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে বের হতে সক্ষম হন। পরে তাকে উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রে নেওয়া হয়।

বুধবার এ ঘটনা ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীদের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার প্রতিবাদে রাতেই বিক্ষোভ করেন প্রায় কয়েকশ নারী শিক্ষার্থী।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বুধবার রাত দশটায় নারী শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল করে প্রক্টর অফিসের সামনে গিয়ে শেষ করেন। পরে তাদের সাথে ছেলেরাও যোগ দেয়।

রাতে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন মেহরিন মোবাশ্বিরা বিনতে আনোয়ার। এই শিক্ষার্থী জানান, মেয়েদের মিছিলটি প্রতিবাদী নানা স্লোগান দিয়ে ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে প্রথমে প্রক্টর অফিসের সামনে যায়।

সেখান থেকে ছেলেরাও তাদের সাথে সংহতি জানালে প্রশাসনিক ভবনের সামনে মিছিল নিয়ে যান তারা। মেহরিন মোবাশ্বিরা বিনতে আনোয়ার বলেন, প্রক্টর অফিসের সামনে হঠাৎ করেই কয়েকজন দাঁড়িয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই লোককে গ্রেফতার, প্রক্টর ও তার পুরা বডির পদত্যাগসহ পাঁচটা দাবির কথা বলে। আমরাতো খানিকটা অবাক হই।

রাত দশটা থেকে প্রায় সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানার থাকলেও তখন শিক্ষার্থীদের মাঝে বিভক্তি দেখা দেয় বলে জানান তিনি ও আরো কয়েকজন শিক্ষার্থী। সেখান থেকে দুই পক্ষ ভাগ হয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে আন্দোলন শুরু করে বলে জানান তারা।

এ দুটি পক্ষ কারা জানতে চাইলে শিক্ষার্থী তিনি জানান, ছাত্রদল, ছাত্রশক্তি, ছাত্রফ্রন্টের নেত্রীরা ১০টা থেকেই ছিল আমাদের সাথে। কিন্তু তারা ওই সাড়ে বারোটা পর্যন্ত কেবল সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবেই ছিল।

ছাত্র ইউনিয়ন ও প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আরেকটি পক্ষ পাঁচ দফা ঘোষণা দেয়। এই দুই পক্ষই আন্দোলন চালিয়ে যায় বলে জানান শিক্ষার্থীরা।

পরে দুই পক্ষেরই কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসানের সাথে এক বৈঠকে ছয় দফা দাবি জানান। শিক্ষার্থীরা জানান, রাত দেড়টা থেকে প্রায় সাড়ে তিনটা পর্যন্ত উপাচার্যের কার্যালয়ে ছিলেন তারা।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া বুধবার রাতে আন্দোলনে ছিলেন। তিনি জানান, ‘ভিকটিম আসলে খুবই স্ট্রং একজন মানুষ। আমার জুনিয়র ছোট বোন আমি প্রাউড এ ব্যাপারে।’

উপাচার্যের কাছে ছয় দফা দাবি উত্থাপনের সময় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত ছিল বলে জানান তিনি। ফারিয়া বলেন, এমনকি আমরা যখন ভিসির রুমে দাবি-দাওয়াগুলো উত্থাপন করছিলাম তখন সে নিজে সেখানে উপস্থিত ছিল এবং এই পুরোটা সময় সে আসলে ভেঙে পড়েনি। পুরোটা সময়ই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখেছে সে।

দাবি নিয়ে দ্বন্দ্ব কেন?
প্রথমে ২৪ ঘণ্টা বললেও পরে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার করা, ক্যাম্পাসে প্রবেশের পথগুলোতে প্রহরী মোতায়েনসহ ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি ছিল আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের।

তবে, প্রক্টর ও তার পুরো টিমের পদত্যাগের দাবির প্রশ্নে দুই পক্ষের মাঝে বিভেদ দেখা দেয় বলে জানান শিক্ষার্থীরা।

ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির নেত্রী ফারিয়া দাবি করেন, ছাত্র ইউনিয়ন পৃথক ওই দাবিটি তুলেছিল। যদিও ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দপ্তর সম্পাদক সাদিয়া ইমরোজ ইলার দাবি, এই অভিযোগ মিথ্যা। আমরা কোনো ব্যানার, রাজনৈতিক পরিচয় কোনো কিছু করি নাই। বরং সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবেই ছিলাম আমরা।

নিরাপত্তা প্রাচীর নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশে
প্রায় সাতশো একর জমি নিয়ে ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের একমাত্র পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পশ্চিম পাশে এটি অবস্থিত।

আবাসিক হলেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরোপুরি নিরাপত্তা প্রাচীর নেই বলে জানান শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি স্বীকারও করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রক্টর অধ্যাপক রাশিদুল আলম বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে একদিকে হাইওয়ে অন্য তিনদিকে লোকাল অধিবাসীরা বসবাস করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে পশ্চিম দিকের বাসিন্দারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য দিয়েই চলাচল করে। আবাসিক হিসেবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা যতটা সুসংহত হওয়া প্রয়োজন ততটা না।

কেন নিরাপত্তা প্রাচীর নেই- জানতে চাইলে প্রক্টর অধ্যাপক আলম আর্থিক ফান্ড নেই বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, বাউন্ডারি ওয়াল এখনো সম্পূর্ণ না। আসলে আমাদের আর্থিক সংশ্লিষ্টতা আছে, আমাদের ফান্ডিং এর অভাব আছে।

একইসঙ্গে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ ও বের হওয়ার এগারোটি পথে সার্বক্ষণিক পাহারা নেই বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিটি গেটে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রহরী মোতায়েন, সাত দিনের মধ্যে কাঠামোগত ত্রুটি মেরামত, ক্যাম্পাসে নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের দাবিও রয়েছে শিক্ষার্থীদের।

নিরাপত্তা প্রহরীর সংখ্যা কম স্বীকার করে প্রক্টর আলম দাবি করেন, বর্তমান প্রশাসনের দেড় বছরে প্রতিটি প্রবেশপথ ও বাউন্ডারি ওয়াল তৈরির জন্য সচেষ্ট আছে।

 অধ্যাপক আলম বলেন, আগামী একমাসের মধ্যে কাজগুলোকে আরো ফাস্টেন করবে, আমরা সচেষ্ট আছি। আমরা আশা করছি বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত হবে, আগের চেয়ে আরো কড়াকড়ি হবে।

উল্লেখ্য, ঈদুল আযহা ও গ্রীষ্মকালীন ছুটি উপলক্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে টানা ২৫ দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ২১শে মে থেকে এ ছুটি শুরু হবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন মির্জা আব্বাসকে দেখতে গেলেন জামায়াত এ…
  • ১৪ মে ২০২৬
পে-স্কেল বাস্তবায়নে নীরব প্রস্তুতি সরকারের, সামনের মাসেই সা…
  • ১৪ মে ২০২৬
অব্যাহতির পর ডুয়েটের সদ্য সাবেক ভিসির আবেগী পোস্ট
  • ১৪ মে ২০২৬
বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলারকে নিয়ে দল ঘোষণা কাতার…
  • ১৪ মে ২০২৬
‘আইন ভেঙে’ বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বানানো হল…
  • ১৪ মে ২০২৬
ডিবির হাতে ধরা পড়ার ভয়ে ১৯ পিস ইয়াবা গিলে হাসপাতালে যুবক 
  • ১৪ মে ২০২৬