প্রথম জাতীয় জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীলতা সম্মেলন © সৌজন্যে প্রাপ্ত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইনস্টিটিউট অফ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এন্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ এর উদ্যোগে ‘প্রথম জাতীয় জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীলতা সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১১ এপ্রিল) বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে সকাল ৯টা থেকে শুরু হওয়া দিনব্যাপী এ সম্মেলনে আলোচনায় দেশের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলা এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের যাবতীয় বিষয় আলোচনা করা হয়।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা এবং চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন। প্রতিবছর দুর্যোগের কারণে এ দেশের বহু মানুষ তাদের মূল্যবান সম্পদ হারায় এবং প্রাণ হারানোর ঝুঁকিতে থাকে। এ সংকটময় মুহূর্তে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে ক্রমবর্ধমান সাফল্য ধরে রাখতে এবং টেকসই ও সমন্বিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুর্যোগ সহনশীলতা অর্জনের জন্য একটি প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন গঠনের লক্ষ্য নিয়েই এ জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
আয়োজকরা জানান, এ সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতক ও পেশাজীবীদের জন্য একটি অ্যাসোসিয়েশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। এটি একাডেমিক গবেষণার সাথে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের সেতুবন্ধন তৈরি করবে এবং তরুণ গবেষকদের জন্য নতুন ক্যারিয়ার ও গবেষণার পথ উন্মোচিত করবে বলে বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. তৈয়েবুর রহমান বলেন, ‘সরকারের পরিবেশ নীতির কেন্দ্রে থাকা প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানই আমাদের ভবিষ্যতের রক্ষাকবচ। সকলকে ঐক্যবদ্ধ এবং নীতিনির্ধারকদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ব্যতীত দুর্যোগের নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস অসম্ভব। শুধু সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলেই হবে না, সবাইকে যার যার জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে এবং পরিবেশ রক্ষায় সহযোগিতার মনোভাব থাকতে হবে।’
এছাড়া তিনি তার বক্তব্যে প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন গঠন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. ইফতেখার আহমেদ বলেন, ‘সহনশীলতা মানে শুধু একটি ঘূর্ণিঝড় বা বন্যা থেকে বেঁচে থাকা নয়; বরং প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও টিকে থাকা এবং উন্নতি করা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আমাদের কৃষক ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের বাস্তবতা। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আমাদের কর্মঘণ্টা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে, যা মোকাবিলায় সচেতনতা ও নিরন্তর কাজের কোনো বিকল্প নেই।’
ইনস্টিটিউট অফ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এন্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ এর ফাউন্ডার অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন বলেন, ‘দীর্ঘ এক যুগের পরিক্রমায় আইডিএমভিএস এখন অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। দেশের উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন আমাদের দুর্যোগ সহনশীলতা অর্জন হবে।’
ইনস্টিটিউট অফ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এন্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ এর পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান খান বলেন, ‘দুর্যোগ ঝুঁকি রোধে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার কোন বিকল্প নেই। সেজন্যই দীর্ঘদিন ধরে আমরা চেষ্টা করছিলাম একাডেমিক গবেষণা, মাঠের বাস্তবতা এবং এ সেক্টরের সকল পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞ মানুষদের কে নিয়ে একটি প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন গঠনের। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের যে আজ আমরা সেটি করতে পেরেছি। এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পথে আরো বহু গুণ এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং সহনশীলতা অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।’
অনুষ্ঠানের সমাপনী অংশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন আয়োজন নিয়মিত হওয়া উচিত। আমাদের দেশ শুধু নয় বরং এ পৃথিবীকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য পৃথিবী উপহার দেয়ার জন্য সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। আজকের প্রফেশনাল সংগঠন গঠন এরই একটি ধাপ হবে।’
সভাপতির বক্তব্যে ইনস্টিটিউটির ফাউন্ডার অধ্যাপক ড. খন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন বলেন, ‘প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে আমরা যে দূষণ আর জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের মাঝে বন্দী হচ্ছি, তা সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমেই হ্রাস করা সম্ভব। শুধু প্রফেশনাল বডী গঠন করলেই হবে না, বরং এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আমাদের একসাথে কাজ করতে হবে।’
সম্মেলনে দুটি টেকনিক্যাল সেশনে দুর্যোগ ঝুঁকি শাসন আগাম সতর্কবার্তা, পরিবেশ ও ইকোসিস্টেম এবং নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। একটি সেশনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা গবেষকবৃন্দ তাদের গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এবং অপর সেশনে প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন গঠনের সকল কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এছাড়া জলবায়ু এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উপর ভিত্তি করে বানানো বিভিন্ন পোস্টার প্রদর্শন করা হয়।