এইচএসসিতে খারাপ ফল, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায় মানুষ পাত্তা দিত না, জাবেদ এখন পুলিশ ক্যাডার

২৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৩ PM
মো. জাবেদ হোসেন

মো. জাবেদ হোসেন © সংগৃহীত

এইচএসসিতে পেয়েছিলেন জিপিএ ৪.১৭। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায় ‘মেধা নেই’—এমন তাচ্ছিল্য শুনেছেন। কিন্তু সেই অবহেলাই একসময় জেদে পরিণত হয়। তিনবার ব্যর্থতার পর চতুর্থ বিসিএসে মেধাক্রমে ৬৮তম হয়ে পুলিশ ক্যাডারে জায়গা করে নিয়েছেন মো. জাবেদ হোসেন। ৪৭তম বিসিএসে সহকারী পুলিশ সুপার পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। এর আগে, ৪৪তম বিসিএসে প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হতে পারেননি। ৪৫তম বিসিএসে নন-ক্যাডার (ইনস্ট্রাক্টর) পদে সুপারিশ পান। ৪৬তম বিসিএসে প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় পাস করলেও খালি হাতে ফেরত আসতে হয় ভাইভা থেকে।

মো. জাবেদ হোসেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর চরনদ্বীপের বাসিন্দা। তার বাবা জয়নাল আবেদীন পেশায় একজন কন্ট্রাক্টর ছিলেন (বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন)। জাবেদরা দুই ভাই বোন। তার ছোট বোন চট্টগ্রামের একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশুনা করছেন। জাবেদ বর্তমানে সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর হাওলা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে এসএসসি ও স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে ২০১৬ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক পাস করেন।  

তার বিসিএস সফলতার গল্প জানতে চাইলে তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর আমার ইচ্ছা ছিল শহরে কোনো কলেজে ভর্তি হব। আমাদের বোয়ালখালী উপজেলায় স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজের এইচএসসি রেজাল্টের ইতিহাস তেমন ভালো ছিল না। জিপিএ-৫ খুব কমই পেত। তাই এ কলেজে ভর্তির ইচ্ছা ছিল না। ছোটবেলা থেকে আমার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবো। তাই এসএসসির পর চেয়েছিলাম শহরের কোনো কলেজে ভর্তি হবো। ভালো প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ পাবো। কিন্তু বাবা-মার এক ছেলে ছিলাম বিধায় তারা চাইত নিজ উপজেলার কাছের কলেজেই ভর্তি হই, তার ওপর কলেজটা ছিল সরকারি কলেজ।  

তিনি বলেন, মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজে ভর্তি হওয়াতে কলেজে থাকাকালীন পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ কমে আসে। ভালো কোচিং সুবিধা না পাওয়াতে পড়ালেখায় আরো পিছিয়ে পড়ি। বাবা চাইত আমাকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াবে। তিনি বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন এর ঠিকাদারি(কন্ট্রাক্টর ছিলেন) কাজ করতেন। কলেজের শেষ পর্যায়ে আমিও সিদ্ধান্ত নিই সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ব। পড়ালেখার উপর কনফিডেন্স কম থাকায় সিদ্ধান্ত নিই প্রাইভেট ভার্সিটিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ব। সারাবছর পড়িনি, এইচএসসি পরীক্ষার আগে শেষ দুই মাস পড়েছি। ফলশ্রুতিতে জিপিএ আসে ৪.১৭। 

তিনি আরও বলেন, এইচএসসি পরীক্ষার পর অ্যাডমিশন টেস্টের জন্য কোনো প্রস্তুতি নেওয়া হয় নি, যেহেতু আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ব। কারণ তখন আমি সমাজে সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যে ব্যবধান আছে সেটা জানতাম না। আমি ভাবতাম দুটোই তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যে চিন্তা সে কাজ। সরাসরি ভর্তি হয়ে যায় স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ এ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। তবে এটা আমার বাবার জন্য জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে একটা। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে ঢাকায় একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ বহন করার মতো কোনো সক্ষমতা আমাদের ছিল না। ব্যাংকে কোনো জমা টাকা ও ছিল না যে খরচ বহন করবে। আমি জানি না- বাবা কীভাবে এত বড় সাহস নিয়ে আমাকে ঢাকায় ভর্তি করিয়ে আসে। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো যে দিন ঢাকায় ভর্তি হতে যায় সেদিনই ছিল বাবা এবং আমার দুই জনের জন্য প্রথম ঢাকায় পা রাখা।

জাবেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার এক সপ্তাহর মধ্যে আমার সকল চিন্তা ভাবনা ভুল প্রমাণিত হতে থাকে। মনে হলো যেন অন্য এক জগতে এসেছি। পরিচিত বন্ধুবান্ধব যারা বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে তাদের আকাশচুম্বী খ্যাতি। আর অন্যদিকে আমি যেন ছাত্রের কাতারেই পড়ি না এমন অবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কিছুদিন পর স্কুল এবং কলেজ থেকে কিছু কাগজ সংগ্রহ করতে আসি, তারা যখন জানতে পারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম তখন তাদের মুখের অভিব্যক্তি ছিল যেন ‘আমার মধ্যে কোনো মেধা নাই তাই ওখানে ভর্তি হলাম, এবং কোনোরকম পড়ালেখা চালিয়ে নেওয়া আার কি, এ দিয়ে জীবনে কিছু হবে না, যারা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো কেবল তারাই সফল’।

নিজের সংগ্রামী জীবনের তথ্য তুলে ধরে জাবেদ বলেন, যত দিন যায় ততই বুঝতে পারি সমাজে আমার কোনো মূল্য নেই। ঢাকার মেসের বড় ভাইরা নিচু চোখে দেখত। সবচেয়ে বড় বৈষম্যের স্বীকার হই টিউশন খুঁজতে গিয়ে। প্রথম এক বছর টিউশন পাইনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার কারণে। টিউশন মিডিয়াগুলো আগ্রহ দেখাত না। এক পর্যায়ে টিউশন চাই এ লিফলেট ছাপিয়ে নিজেই রাতে দেওয়ালে দেওয়ালে লাগাতাম। খুব একটা কল আসত না। আসলেও এমন অফার দিত -যেমন ৮ম/৯ম শ্রেণি সপ্তাহে ছয় দিন সব বিষয় পড়াতে হবে টিউশন ফি দেবে ১৫০০। টিউশনি ফি কম পেতাম বলে ৫-৬টা টিউশন করতে হতো। সকালে বের হলে ভার্সিটি ক্লাস প্লাস টিউশন শেষ করে বাসায় আসতে এগারোটার পর হয়ে যেত। এটাই ছিল প্রতিদিনের রুটিন। 

এসব তাচ্ছিল্য থেকেই বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জেদ তৈরি হয় জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতি পদে পদে এভাবে অবহেলার শিকার হয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম জীবনে একবার হলেও বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় আমি টিকে দেখাব। সে থেকে মনের মধ্যে জেদ কাজ করতো। গ্রাজুয়েশন শেষ করেই বিসিএস প্রস্তুতি শুরু করি। আমার জন্য বিসিএর যাত্রা বেশ কঠিন ছিল। কোনো কোচিং না করে নিজে নিজে সিলেবাস অ্যানালাইসিস করে প্রস্তুতি শুরু করি। নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়তে হয়েছে। বিসিএস প্রস্তুতি নিতে যে কনফিডেন্স দরকার ছিল সেটা আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার ম্যাডামরা আমাদের কখনই নিচু চোখে দেখেনি বরং সবসময় ক্যারিয়ারে উন্নতি করার জন্য পরামর্শ দিত, অনুপ্রেরণা দিত।

আপনার সফলতার পেছনে অনুপ্রেরণা কাদের জানতে চাইলে জাবেদ বলেন, আমার এই যাত্রার পেছনে তিন জন মানুষের অবদান কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। 
তারা হলেন আমার বাবা মা আর আমার নানা। আমি ছোটো থেকে এইচএসসি পর্যন্ত এবং বিসিএস লিখিত পরীক্ষাগুলো সহ যত পরীক্ষা দিয়েছি প্রতিটি পরীক্ষায় আমার মা আমার সাথে জেগে থাকত, পাশে বসে থাকত। বাবা-মা আমাকে পড়ালেখা করানোর জন্য নিজের বাড়ি থেকে অনত্র্য বাসায় ছিলেন। দুইজনই জীবনের প্রায় অধর্কের বেশি সময় আমার জন্যই সংগ্রাম করে গেছেন। বাবার স্বপ্ন ছিল আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াবে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার হয়েও আমাকে ঢাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করান। তাদের ধ্যান, পরিশ্রম, সবকিছু আমাকে ঘিরেই ছিল, বাবা সবসময় বলত আমি যতদিন বেঁচে আছি আমার ছেলেকে পড়াব, দরকার হলে রক্ত বেঁচে হলেও। একথা প্রায় সময় বলত। 

তিনি বলেন, গ্র্যাজুয়েশনের পর উনারা কেউ আমাকে চাকরির জন্য চাপ দেননি, বলছেন শুধু পড়তে, যদি আরো পড়তে চাই তবু সাপোর্ট দেবে। যখন বললাম আমি বিসিএস দেব, উনারা আমাকে সাপোর্ট দিয়ে গেছেন। কখনও বলেনি আমি কবে চাকরিতে যোগ দেবো,কবে কিছু করব। বাবা, আম্মুকে সবসময় বলত ছেলেকে কখনও টেনশন দিও না, ও যতদিন পড়তে চায় পড়ুক। নিজেদের আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকলেও সেটা কখনও আমাকে বুঝতে দেয় নি। ধার দেনা করে সেমিস্টার ফি দিলেও আমাকে জানতে দিত না। আমি বেকার অবস্থায়ও বাবা তার সাধ্যের বাইরে গিয়ে আমাকে সাপোর্ট দিয়েছেন। আর বাবা তো নীরবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার জীবনের অর্ধকের বেশি সময় আমার পিছনেই সংগ্রাম করে গেছেন। কিন্তু আফসোস বাবা আমার পুলিশ ক্যাডার হওয়ার খবরটা শুনে যেতে পারেননি। ৪৭ তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল দেওয়ার চার মাস আগে বাবা ইন্তেকাল করেন। ২০২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বাবা মারা যান। 

প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে যারা বিসিএস ক্যাডার হতে চান তাদের উদ্দেশে জাবেদ হোসেন বলেন, প্রাইভেট ভার্সিটিতে বিসিএস এর ক্রেজটা কম। কারো কাছ থেকে তেমন পরামর্শ পাওয়া যায় না। প্রথমে সিলেবাস অ্যানালাইসিস করে নিজের দুর্বল জায়গা এবং স্ট্রং জায়গা বের করতে হবে। এরপর প্রতিটি বিষয় নিয়ে পরিকল্পনা করে পড়তে হবে। কোন বিষয়ের কোন কোন টপিক গুরুত্বপূর্ণ, কোন টপিক থেকে প্রশ্ন আসে সেটা বের করতে হবে। সে টপিকগুলোই পড়তে হবে। প্রতিটি টপিক পড়ার আগে সে টপিক থেকে বিগত পরীক্ষাগুলো তে কোন ধরনের প্রশ্ন এসেছে সেটা পড়তে হবে। সাথে টপিক রিলেটেড অন্যান্য জিনিস ডিটেইলস পড়তে হবে। এখন যেহেতু প্রিলির ২ মাস পড়ে লিখিত পরীক্ষা হচ্ছে তাই প্রিলি লিখিত সিলেবাসে কমন টপিক গুলো একসাথে প্রিলি লিখিত এর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। পত্রিকা পড়া এবং সাথে ইংরেজি ফ্রি হ্যান্ড রাইটিং, ট্রান্সলেশনের দক্ষতা বাড়াতে হবে।

চাকরি প্রত্যাশীদের উদ্দেশ্য তিনি বলেন, হতাশ না হয়ে ফোকাস ঠিক রেখে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রস্তুতি নিতে হবে বিসিএসের। পাশাপাশি ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় বিকল্প পথ রাখতে হবে। যাতে কোনো কারণে বিসিএস না হলে উচ্চশিক্ষা, ব্যবসা বা অন্য চাকরির মতো বিকল্প বিবেচনায় রাখা যায়। বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে একই বিষয়ের জন্য একাধিক প্রকাশনীর বই না কিনে প্রিলিমিনারির জন্য একটি এবং লিখিত পরীক্ষার জন্য সর্বোচ্চ দুটি প্রকাশনীর বই অনুসরণ করতে হবে। নিয়মিত পত্রিকা পড়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করতে হবে।  

মাদ্রাসা শিক্ষকদের বদলি আবেদনের ছক বা ফরম দেখুন এখানে
  • ২৩ আগস্ট ২০২৬
মাদকাসক্ত ছেলের হামলায় মা ও ভাই গুরুতর আহত
  • ২৩ আগস্ট ২০২৬
টিএসসি নির্মাণ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণসহ ১৩ দাবি সেন্ট্রাল ইউন…
  • ২৩ আগস্ট ২০২৬
ছাদ থেকে শুরু, এরপর সিঁড়ি হয়ে সর্বশেষ বেডরুম— এর মাঝেই ৪ হত…
  • ২৩ আগস্ট ২০২৬
অবৈধ স্লিপার বাসের বৈধতা চেয়ে রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক বন্ধ করে …
  • ২৩ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানোর রহস্য জানালেন কামিন্স
  • ২৩ আগস্ট ২০২৬