কাঁটাতার কেড়ে নিয়েছে শিক্ষার্থী, অস্তিত্ব সংকটে প্রাথমিক বিদ্যালয়

১৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩১ PM
শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা হচ্ছে

শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা হচ্ছে © টিডিসি

কাঁটাতারের বেড়া শুধু একটি দেশের সীমানা ভাগ করেনি, বদলে দিয়েছে একটি গ্রামের ভবিষ্যৎও। যে নবীনগর একসময় ছিল শত শত পরিবারের কোলাহলে মুখর, আজ তার বাংলাদেশ অংশে টিকে আছে মাত্র ৩০টি পরিবার। সেই ৩০টি পরিবারের শিশুদের শিক্ষার একমাত্র আশ্রয় নবীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১৪ জনে। সরকারি সমন্বয় নীতির আওতায় বিদ্যালয়টি বিলুপ্তির আশঙ্কায় থাকায় সীমান্তের শিশুদের শিক্ষার একমাত্র আশ্রয়ও এখন অস্তিত্ব সংকটে।

মেহেরপুর সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী নবীনগর গ্রামের খালপাড়া অংশে ১৯৯২ সালে স্থানীয় যুবক সিরাজুল ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন ‘নবীনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়’। দীর্ঘ দুই দশকের পথচলার পর ২০১৩ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হয়। প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল ইসলাম এখনো প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব। পালন করছেন। ২০১২ সালে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর বিদ্যালয়টিতে একটি পাকা ভবন নির্মাণ করে। ভবনটিতে প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের জন্য একটি এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য তিনটি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। পরিচ্ছন্ন এই বিদ্যালয় ভবন যেন সীমান্তের শিশুদের স্বপ্ন আগলে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই স্বপ্নের আকাশ ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে।

দেশভাগের সময় নবীনগর গ্রামের বড় অংশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ভারত সরকার ২০০৩ সালে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের সময় কাঁটাতার সংলগ্ন ভারতের অংশে বসবাসকারি প্রায় ২০০ পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের অংশেও। বর্তমানে খালপাড়ায় বসবাস করছে মাত্র ৩০টি পরিবার। আরও ছয়টি পরিবার বিভিন্ন সময়ে মেহেরপুরের অন্যত্র চলে গেছে। গ্রামে বিদ্যালয়গামী শিশুর সংখ্যা এখন মাত্র ১৪ জন। আশার কথা, শতভাগ শিশুই নবীননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে ৩ জন, প্রথম শ্রেণিতে ২ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ৪ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ২ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে মাত্র ১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

সরেজমিনে বিদ্যালয়ে দেখা যায়, উপস্থিত মাত্র ছয়জন শিক্ষার্থী। ছোট্ট শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দিয়ে পড়ছে তারা। চারদিকে সীমান্তের নিস্তব্ধতা, আর ভেতরে ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করে চলা কয়েকটি নিষ্পাপ মুখ।

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রিফাত আলী সরল কণ্ঠে বলে, ‘আমাদের যদি দূরের স্কুলে পাঠানো হয়, তাহলে আর লেখাপড়া করব না। এত দূরে আমরা যেতে পারব না।’

নবীনগরের বয়োবৃদ্ধ বাসিন্দা মোহাম্মদ খোদাবক্স বলেন, ‘স্কুল যখন হয়েছিল, তখন ছাত্র-ছাত্রী অনেক ছিল। কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার সময় দুই শতাধিক পরিবার কাঁটাতারের ওপারে চলে যায়। তারপর থেকেই স্কুল ফাঁকা হতে শুরু করে।’

প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কম হলেও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দুই শিফটে ক্লাস নিতে হয়। বর্তমানে পাঁচজন শিক্ষক কর্মরত আছেন। তবে একজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে এবং আরেকজন ডেপুটেশনে পরীক্ষণ বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি আরও বলেন, সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী ৫০ জনের কম শিক্ষার্থী রয়েছে এমন বিদ্যালয়গুলোকে নিকটবর্তী বিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই বিদ্যালয়টি যদি তিন কিলোমিটার দূরের অন্য বিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়, তাহলে এই গ্রামের শিশুরা কার্যত বিদ্যালয়বিমুখ হয়ে পড়বে। সীমান্ত এলাকার বাস্তবতা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। 

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে বিভাগীয় উপপরিচালক, প্রাথমিক শিক্ষা বরাবর পাঠানো ‘৫০ জনের কম শিক্ষার্থী রয়েছে—এমন বিদ্যালয়ের তালিকায় নবীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও উল্লেখ করা হয়েছে, এটি সীমান্তবর্তী বিচ্ছিন্ন এলাকা হওয়ায় আশপাশে অন্য কোনো গ্রাম নেই এবং সে কারণেই শিক্ষার্থী সংখ্যা কম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেহেরপুর জেলায় তেরঘরিয়া আশ্রয়ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৯ জন এবং গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পাঠদান চলছে। আবার মেহেরপুর শহরের ভৈরব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভবানন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কালীগাংনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাগজে-কলমে ৫০-এর বেশি শিক্ষার্থী দেখানো হলেও বাস্তবে শিক্ষার্থী অনেক কম বলে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

মেহেরপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুকুমার মিত্র বলেন, যেসব বিদ্যালয়ে ৫০ জনের কম শিক্ষার্থী রয়েছে, সেগুলো নিকটবর্তী বিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের সরকারি সিদ্ধান্ত আছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কিন্তু সীমান্তের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেন একটি ব্যতিক্রম। এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম, কারণ মানুষ কমে গেছে; মানুষ কমেছে কাঁটাতারের কারণে। তাই নবীননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অস্তিত্বের প্রশ্নটি শুধু একটি বিদ্যালয় রক্ষার নয়, বরং সীমান্তের শিশুদের শিক্ষার অধিকার রক্ষারও। সংখ্যার অঙ্কে হয়তো এই স্কুল ছোট, কিন্তু সীমান্তের মানুষের কাছে এটি একটি গ্রামের শেষ আলোর প্রদীপ।

চুয়েটে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত, দ্রুত অচলাবস্থা নির…
  • ০৯ নভেম্বর ২০২৬
শতবর্ষী মাদ্রাসা জাতীয়করণ প্রত্যাশী ফোরামের আহ্বায়ক আমিনুল,…
  • ০৯ নভেম্বর ২০২৬
ভুয়া-ভুয়া স্লোগান শুনে ‘মিডল ফিঙ্গার’ দেখালেন পরীমনি
  • ০৯ নভেম্বর ২০২৬
অক্ষত পরীমনির গাড়ি, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ
  • ০৯ নভেম্বর ২০২৬
অ্যাটকোর সভাপতি অঞ্জন চৌধুরী, মহাসচিব আব্দুস সালাম পুনর্নির…
  • ০৯ নভেম্বর ২০২৬
মায়ের কিডনি নিয়েও বাঁচানো গেল না ছেলেকে, প্রতিস্থাপনের ৩২ দ…
  • ০৯ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950