ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
অন্তত ২০ ছাত্রীর ‘আপত্তিকর’ ছবি তুলে প্রেমিককে পাঠিয়েছেন ঐশী, ছবিতে তার তিন প্রেমিক © ফাইল ফটো
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) জুলাই-৩৬ আবাসিক হলে সহপাঠী ও রুমমেটদের গোপনে আপত্তিকর তোলা ছবি যুক্তরাজ্যপ্রবাসী প্রেমিকের কাছে পাঠানোর ঘটনায় ক্যাম্পাসজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ওই হলের অন্তত ২০ জন নারী শিক্ষার্থীর আপত্তিকর ছবি পাঠানোর চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় অভিযুক্ত অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী তোবাউল জান্নাতী ঐশীকে হল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে প্রশাসন। একই সঙ্গে তাঁর ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন জব্দ এবং ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনা ফাঁস হওয়ার নেপথ্যে উঠে এসেছে ত্রিভুজ প্রেমের সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক লেনদেনের তথ্য।
ঘটনার তীব্রতার মুখে নিজের ভুল স্বীকার করেছেন অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ঐশী। তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। একইসাথে একাধিক প্রেমিকের সাথে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। এরমধ্যে তিনজনের নাম-পরিচয়ও পাওয়া গেছে।
প্রথমজন অভিযুক্ত ছাত্রীর বাল্যবন্ধু ও যুক্তরাজ্যপ্রবাসী যুবক নাফিজ ফুয়াদ আবিদ, অপরজন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের মুস্তাকিম পিয়াস ও তৃতীয়জন বাংলা বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের মাহিন মুইন। অভিযোগের স্বপক্ষে প্রেমিকদের সাথে যোগাযোগের প্রমাণস্বরূপ স্ক্রিনশট, কল রেকর্ড এবং ভয়েস রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
নেপথ্যে ঐশীর ত্রিভুজ প্রেম
ঐশীর ছোটবেলা থেকেই পরিচিত নাফিজ ফুয়াদ আবিদ। তারা একসঙ্গে কিন্ডারগার্টেনেও পড়ছেন। এজন্য বন্ধুর ন্যায় সম্পর্ক ছিল তাদের, আবিদ যুক্তরাজ্যে পড়তে যাওয়ার পরও কথা হতো মাঝেমধ্যে। তবে ঐশী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পরিচয়, বন্ধুত্ব তারপর সম্পর্কে জড়ায় মুস্তাকিম পিয়াসের সঙ্গে। পরে তাদের সম্পর্ক গড়ায় বছর দুয়েক। এরমধ্যে পিয়াস বিয়ে করলে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আবিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মধ্যেই সম্পর্কে জড়ান ঐশী। অপরদিকে, পরে কোনো একসময় ক্যাম্পাসের মাহিন মুইনের সঙ্গেও ঐশী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে তার সঙ্গেও প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে ঐশীর।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসার প্রেক্ষাপট
প্রবাসে থাকাকালীন আবিদের ফোনে পিয়াসের সাথে কাটানো একান্ত মুহূর্তের একাধিক ছবিও একসময় শেয়ার করেন ঐশী। এদিকে চলতি বছরের শুরুতে আবিদকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। বিয়ের প্রতিশ্রুতি পেয়ে মে মাসেই আবিদ যুক্তরাজ্য থেকে দেশে আসেন ১০ দিনের ছুটিতে। পরে আবিদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়াতে আসলে তাকে সাদ্দাম হোসেন হলে তার আরেক প্রেমিক মুইনের মাধ্যমে দুদিন থাকার ব্যবস্থা করে দেন ঐশী। বিষয়টা তখনও প্রকাশ্যে আসেনি। কিন্তু যখন আবিদকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর ছুটিতে আসলে বিয়ে করতে অস্বীকার করেন ঐশী, তখনই আবিদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয় এবং সেখান থেকেই ঘটনা প্রকাশ্যে আসা শুরু হয়।
বিয়ের জন্য তাগাদা দিলে ঐশী বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান এবং আবিদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন। এক পর্যায়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি। এরপর যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে ঐশীর আরেক প্রেমিক মুইন ফোন কলে আবিদের সাথে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন এবং ঐশীর পিছু ছেড়ে দিতে বলেন। একপর্যায়ে ঐশীর সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে বিয়ে না করেই পুনরায় যুক্তরাজ্য চলে যান আবিদ।
এরপর চলতি সপ্তাহে ঐশীর রুমমেট এবং বান্ধবীদের সাথে তার কথাকাটি হলে একপর্যায়ে আবিদের সাথে প্রেমের জন্য বান্ধবীদেরই দায়ী করেন ঐশী। একপর্যায়ে এই প্রেমের বিষয় অস্বীকার করেন। আবিদকে চেনেন না বলে তর্কে লিপ্ত হন বান্ধবীদের সাথে। এ নিয়ে আবিদের সাথে ঐশীর বান্ধবীরা যোগাযোগ করলে তাদেরকে ঐশীর সরবরাহ করা পূর্বের গোপন ছবি পাঠান তিনি, যেখান থেকে মূল ঘটনার সূত্রপাত হয়। আর এই ছবিগুলো দেখে প্রত্যেকেই আতঙ্কিত হন এবং প্রাইভেসি সংকটে পড়েন সবাই।
অভিযুক্ত ছাত্রীদের ঘুমন্ত অবস্থার, টি-শার্ট পরা বা ওড়না ছাড়া অবস্থার ছবি তুলেন ঐশী। এমনকি বোরকা ও নিকাব পরা ছাত্রীদেরও পর্দার আড়ালের ছবি তিনি তুলেছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
জানাজানি হওয়ার পর যা হলো
যুক্তরাজ্যপ্রবাসী যুবক নাফিজ ফুয়াদ আবিদ ছবিগুলোর কিছু ভুক্তভোগীদের কাছে পাঠানোর পর হলে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাতে বিষয়টি হলের প্রাধ্যক্ষ ও প্রক্টরিয়াল বডি জানতে পারে। এ নিয়ে জানাজানি হলে ক্যাম্পাসে তোলপাড় শুরু হয়।
বৃহস্পতিবার মাঝরাতে জুলাই-৩৬ হলের প্রভোস্টকে জানানো হলে সকালে এসে হলের হাউজ টিউটর, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে জরুরি মিটিং ডাকেন হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. এ কে এম শামসুল আলম সিদ্দিকী। প্রাথমিক তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ঘটনার তদন্তের জন্য আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট পেশ করার জন্য তিনি সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
অভিযুক্ত ঐশী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি আমার ওপর আনা অভিযোগ মাথা পেতে নিচ্ছি, তারা যে অভিযোগ এনেছে তাদের অভিযোগ দেওয়ার অধিকার অবশ্যই রয়েছে। আমি বুঝতে পারি নাই বিষয়টা এতদূর গড়াবে। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, আমার হলের সিট বাতিল করলেও ছাত্রত্ব যেন বাতিল না করে। তাহলে আমার ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যাবে। আমার এভারেজ সিজিপিএ ৩.৭৫, আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ একবারে ধ্বংস হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, আমার সহপাঠী ও রুমমেটরা রুমে স্বাভাবিকভাবে যেভাবে অবস্থান করছিল, সেই ছবি অন্য কাউকে পাঠানো আমার চরম ভুল হয়েছে। আমি অপরাধ স্বীকার করছি এবং যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নিতে রাজি। কিন্তু ছবি পাচার করে কারো ক্ষতি করা বা মানহানির উদ্দেশ্য আমার ছিল না। ঘটনাটিকে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে।
ঐশী আরও বলেন, আমি পরিস্থিতির শিকার হয়ে এসব ছবি তাকে পাঠিয়েছি। সে আমাকে একের পর এক ভিডিও কল দিত। আমি কোন পরিস্থিতিতে আছি, সেটা বোঝাতে রুমমেটদের ছবি পাঠাতাম। এছাড়া তারাও (রুমমেট) ওই ছেলেকে চিনত। এমনকি সে দেশে এলে তারা তার সঙ্গে দেখা করে ট্রিটও নিয়েছে।
তিনি বলেন, এক সপ্তাহ আগে সে আমাকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে আমি পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়েতে রাজি হইনি। তাই সে এখন আমার বিভিন্ন সময়ে পাঠানো ছবিগুলো নিয়ে প্রত্যেককে ইনবক্স করে এসব শুরু করেছে। আমি খুব বাজেভাবে ফেঁসে গেছি। এখন আমার ‘স্যরি’ বলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
যোগাযেগা করা হলে যুক্তরাজ্য প্রবাসী নাফিজ ফুয়াদ আবিদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসসকে বলেন, আমাকে ঐশী ঠকিয়েছে। শুধু আমাকেই না, আরো অসংখ্য মানুষকে ঠকিয়েছে, যেগুলো বিস্তারিত তদন্ত কমিটির কাছেই প্রকাশ পাবে ওর মোবাইল ঘাঁটলেই। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঐশী আমার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, যার প্রমাণের নথি আমার কাছে আছে। এছাড়া আমি কখনো কোনো হলের মেয়েদের ছবি পাঠাতে বলিনি, সে নিজ থেকেই হলের শিক্ষার্থীদের, এমনকি তার আত্মীয়দেরও একান্ত মুহূর্তের ছবি পাঠাতো আমার কাছে। এ সকল ছবি পাঠিয়ে সে পৈশাচিক আনন্দ পেত। আমার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। একপর্যায়ে যখন ওর বান্ধবীদের কাছে আমাকে দোষী হিসেবে উপস্থাপন করছিল, তখন আমি বিষয়টা স্পষ্ট করতেই ঐশীর আসল রূপ তাদের সামনে তুলে ধরি এবং আমার কাছে যে ছবিগুলো পাঠিয়েছে তার কিছু কিছু ছবি তাদেরকে আমি শেয়ার করি। একই সাথে আরো অনেকের কাছেই যে সে ছবি পাঠিয়েছে, সে বিষয়টার ব্যাপারে তাদেরকে সতর্ক করি।
ঐশীর আরেক প্রেমিক ও আইসিটি বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের মুস্তাকিম পিয়াস বলেন, ঐশী একটা ডেসপারেট মেয়ে, ও ডেসপারেটলি আমার পিছে ঘুরতো, আমাকে পছন্দ করতো, তাই মাঝে মাঝে সময় দিতাম। আর ক্যাম্পাসে আমার একটা রেপুটেশন আছে, সে জায়গা থেকে আমাকে অনেকেই চিনে। আমি মাঝে মাঝে ক্যারিয়ার রিলেটেড গাইডলাইন দেই, পরামর্শ দেই। আমি কার সাথে কী করব না করব এই বিষয়টা তো একান্তই আমার ব্যক্তিগত। এ ব্যাপারে আমাকে নেগেটিভ ফ্রেমিং করার কিছু নেই। কিন্তু ওর সাথে আমার কোনো প্রেমের সম্পর্ক নাই। এছাড়া আমি বিয়ে করেছি, আমার একটা বাচ্চাও রয়েছ।
বাংলা বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের মাহিন মুইনের সাথে মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
হলের ভুক্তভোগী ছাত্রী এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসনের বক্তব্য
‘আপত্তিকর’ ছবি ফাঁস হওয়া একাধিক ছাত্রীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তবে তারা নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের অজান্তেই হলের অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীর গোপন ছবি সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। একের অধিক ছেলের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা ও টানাপোড়েন ঢাকতেই এই ছবি পাচারের ঘটনা ঘটেছে। একই সাথে একাধিক ব্যক্তির সাথে সম্পর্কে জড়ান তিনি (ঐশী), আমাদের কাছে প্রমাণও রয়েছে। বাহিরে রাত্রিযাপনের বিষয়ও আমাদের নজরে এসেছে। আমরা তখন বুঝতে পারিনাই।
তারা আরও বলেন, ঐশীর বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইনে আমরা কঠোর শাস্তির দাবি জানাচ্ছি এবং আমাদের এই ছবিগুলো যাদের কাছে গিয়েছে তাদের কাছ থেকে চিরতরে মুছে ফেলার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি। সেই সাথে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি, যাতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
জুলাই-৩৬ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. একেএম শামছুল হক ছিদ্দিকী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সকালবেলায় জরুরি মিটিংয়ে তাৎক্ষণিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ইতোমধ্যে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করেছি। উপাচার্য মহোদয়কে জানানো হয়েছে। তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরা অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে তার বাবার কাছে হস্তান্তর করেছি।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আরিফা আক্তার বলেন, অভিযুক্তের ফোন দুটি জব্দ করা হয়েছে এবং নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে মেয়েদের যে অভিযোগ তার সত্যতা আমার পেয়েছি। এমন কিছু ছবি যেগুলো আমাকে দেখানো হয়েছে, সেগুলো আপনাদেরকে দেখানোর মত নয়। নির্দিষ্ট সময়ের ভিতরে তদন্ত রিপোর্ট পেশ করে প্রয়োজনীয় করব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান জানান, উপাচার্য মহোদয়কে সার্বিক বিষয় জানানো হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে দোষ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।