তরুণ প্রজন্ম কি বাম রাজনীতিতে আগ্রহ হারাচ্ছে?

© ফাইল ফটো

একটা সময়, স্বাধীনতাপূর্ব কী পরবর্তী ছাত্র রাজনীতির মূল স্রোতটাই ছিল বামপন্থী। সে সময়কার ছাত্র রাজনীতিতে বামপন্থীদের ছিল বিশাল প্রভাব বলয়। কিন্তু এখন তরুণ প্রজন্মের কাছে সেভাবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না বামপন্থা। মূলত ১৯৭৬ সালের পর কিছুটা গৌণ হয়ে পড়ে ১৯৫২, ‘৬২, ‘৬৯, ‘৭১’র পথ নির্দেশক বামপন্থীরা।

তাহলে তরুণ প্রজন্ম কি আগ্রহ হারাচ্ছে বাম-রাজনীতিতে? কেন? এ নিয়ে কথা বলেছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয়ভাবে বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িত আছেন এমন কয়েকজন নেতা-কর্মীর সঙ্গে। আলোচনায় উঠে আসে, এক সময়কার জনজোয়ারে ভাটা পড়ার নানা কারণ। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, বিরাজনীতিকরণ, তরুণদের ব্যাক্তি স্বার্থবাদী মনোভাবের হয়ে উঠা, ইতিহাস বিমুখতা, নেতৃত্বের দূর্বলতা সহ নানা দিক।

শুরুতেই কথা হয় দিলীপ রায়ের সাথে। যিনি বর্তমানে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। একই পদে তিনি রাবি শাখার নেতৃত্বে ছিলেন।

তার মতে, বাংলাদেশের রাজনীতির যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে সাংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তনও এসেছে। এসব কারণে রাজনীতির ধরনও পরিবর্তন হয়ে গেছে। মানুষের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তার মনস্তত্ত্বকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।

তিনি বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যারা ক্ষমতায় গিয়েছিল তারা মারাত্মক একটা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালিয়েছিল। এর ফলে মানুষ মোটাদাগে ভোগবাদী আর ব্যাক্তি তান্ত্রিক হয়ে গেছে। মানুষকে নিয়ে ভাবনার জায়গা থেকে মানুষ এখন সরে এসেছে। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

দিলীপ রায়ের অভিমত, ৯০ পরবর্তী সময়ে রাজনীতিবিদরাই রাজনীতিটাকে একটা বৈষয়িক বিষয়ে পরিণত করেছে। খুব সুচতুরভাবে একটা বিরাজনীতিকরণ করেছেন। এখন রাজনীতি মানেই দাঁড়িয়েছে কপটতা, ষড়যন্ত্র, ক্ষমতা দখল।

তিনি আরো বলেন, আগে পেশাজীবি মানুষেরাও রাজনীতিতে আসতেন। কিন্তু পরিসংখ্যান দেখলে বুঝবেন এখন কিন্তু রাজনীতিতে আসাদের মধ্যে পেশাজীবি মানুষের সংখ্যা কিন্তু কমে গেছে। আমলা, ব্যবসায়ীরাই এখন রাজনীতি করছে।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করে তিনি বলেন, এখনকার শিক্ষাব্যবস্থা মানুষের সুকুমারবৃত্তির বিকাশ কেন্দ্রিক না হয়ে চাকুরি কেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় মানুষ এখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

দিলীপ রায় বলেন, তরুণদের বামরাজনীতি বিমুখতার আরো একটি কারণ হচ্ছে ‘মানুষের জন্য ভাবলেই বামপন্থী রাজনীতির প্রয়োজন পড়ে, না হলে কিন্তু পড়ে না। সেকারণেই বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আজকের তরুণদের আগ্রহের জায়গাটা একটু কম।’ তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণ করার যে নেতৃত্ব থাকা দরকার সে নেতৃত্বের জায়গায় কিন্তু আমাদের দূর্বলতা আছে। স্বীকার করে নেন তিনি।

একই বিষয়ে কথা হয় বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বর্তমান সাধারণ সম্পাদক রঞ্জু হাসানের সাথে। তিনি এর জন্য মোটাদাগে দায়ী করছেন দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর বুদ্ধিবৃত্তির চর্চায় ভাটাকে।

বহুবার, বিভিন্ন কারণে ধাক্কা আর এ অঞ্চলের যে বুর্জোয়া শ্রেনী তথা পুঁজিবাদি শ্রেণী আছে তারা সচেতনভাবেই চায় না যে এই রাজনীতিটা বিকশিত হোক, যোগ করেন তিনি।

তরুণদের রাজনীতি বিমুখী করার কারণ হিসেবে বর্তমান শাসন কাঠামোকে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, উপনিবেশিক শাসন কাঠামো, দেশভাগ, ভাষা সংগ্রাম, স্বাধীনতা সংগ্রাম সে সময়গুলোতে বামদের শত্রুপক্ষ স্পষ্ট ছিল। আমরা কার বিরুদ্ধে লড়ছি তা পরিষ্কার ছিল। কিন্তু এখনকার যে শাসন কাঠামো এতে আমরা আমাদের কে শত্রু কে মিত্র তা সচেতনভাবে ব্যাখ্যা করতে পারছি না।

তিনি বলেন, আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাস থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এখানে শিক্ষা-পদ্ধতি একটা বিশাল বাধা। আমাদের মধ্যে ‘নিজে বাচলে বাপের নাম’ ধরণের একটা সংস্কৃতি চর্চা শুরু হয়ে গেছে। এই যে স্বার্থপরতার চর্চা, এটা একেবারে সামাজিকীকরণের মাধ্যমে তাদের মগজে ঢুকানো হচ্ছে। এই তরুণদের মধ্য থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকাটা উবে যাচ্ছে।

তার মতে, গণমাধ্যম কিন্তু জনমত গঠন করে। কিন্তু পুঁজিবাদিরা সেসবের মালিকানায় রয়ে গেছে। তরুণদের সঠিক বার্তা পৌঁছাতে এটা একটা প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মহব্বত হোসেন মিলনকে। ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্টেকহোল্ডার ছিল কিন্তু বামপন্থীরা। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ফল্টটা করে ফেলে জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)। কর্ণেল তাহেরের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সমস্যাটা শুরু। সেসময় বর্তমান জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু তার একটা ভালো অবস্থানে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তিনি সেটা করতে পারেননি। কিছু ফল্ট ছিল। সেখান থেকেই বামপন্থীদের পতনের জায়গাটা আসলে শুরু হয়।

তিনি বলেন, আবার বামপন্থীতা বিভিন্ন সময় ত্যাগ স্বীকার করেছে সেটাও পতনের একটা অন্যতম কারণ। যেমন ধরেন, যুক্তফ্রন্টের যে নির্বাচন, সে নির্বাচনে নেজামে ইসলাম পার্টি ছিল। তারা বলল যে, বামরা থাকলে আমরা জোটে থাকব না। সে সময় বামপন্থীরা পূর্ববাংলার স্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করে নেয়। সেটা একটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল।

মহব্বত হোসেন মিলন বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচন যতদিন হত, তখন যে সরকারই আসুক না কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন ছিল। একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ ছিল। রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর একটা পরিবেশ ছিল।

কিন্তু তরুণদের অনাগ্রহ কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিরাজনীতিকীকরণের ফলে তরুণরা এখন রাজনীতি করার চেয়ে সাধারণ মানুষের কাতারে থাকতে পছন্দ করছে। মানুষের মধ্যে রাজনীতির চর্চাই উঠে যাচ্ছে। একটা ছাত্রের মধ্যে যখন রাজনীতির চর্চাই থাকবে না, তখন সে কীভাবে বাম-ডান কিংবা অন্য কোন পন্থার রাজনীতিতেই যুক্ত হবে?

তিনি আরো বলেন, তরুণদের অনাগ্রহের আর একটা কারণ হচ্ছে, আমরা তাদের আকাঙ্ক্ষার যায়গাটাও বুঝতে পারিনি। তারা কি গণতন্ত্র চায় নাকি সমাজতন্ত্র চায়, সে বিষয়টা আগে সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিটা আমরা আসলে ঠিকমতো বুঝতে পারিনি।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের দপ্তর সম্পাদক শাকিল হোসেন বলছিলেন, একটা সময় মানুষ পরাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক ছিল। সেটা মানুষের ভিতর নাড়া দিতো যে আমি পরাধীন আছি। সে পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেতে একটা গণজোয়ারের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ৭১ পরবর্তী সময়ে বাম রাজনীতি অনেকটা সরে সরে গিয়েছিল। অনেকেই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল।

তিনি বলেন, ‘৭৬ এর পর স্বৈরশাসনের কারণে মুক্তিযুদ্ধের যে মূল চেতনা তার থেকে রাজনীতি ছিটকে গিয়েছিল। মানুষ রাজনীতিবিদদের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। যার প্রভাব থেকে বাম রাজনীতিও মুক্ত ছিল না। স্বৈরশাসকরা বামপন্থী রাজনৈতিকদের মূল প্রতিপক্ষ বানিয়ে দমন-পীড়ন চালিয়েছিল। অত্যাচার নির্যাতনের কারণে সে আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে যায়। ধর্মীয় রাজনীতির উত্থানের কারনেও বাম রাজনীতি কিছুটা চাপে পড়ে যায়।

তিনি আরো বলেন, এসময় যারা মনতুষ্টিবাদী রাজনীতি করে, তারা সুযোগটা নিয়ে নিলেন। মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে তারা রাজনীতি শুরু করলেন। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে তারা রাজনীতিকে ব্যবহার শুরু করে। তরুণরা তার প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়। ব্যবহার হতে হতে এখন দেখবেন, অধিকাংশ তরুণই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখছে যে, ‘আই হেট পলিটিক্স’ আমি রাজনীতি ঘৃণা করি। তাহলে বাম রাজনীতির কথা কী বলবেন, তরুণরা তো এখন রাজনীতিই করতে চাচ্ছে না।

একজন বামপন্থী মানুষের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই হলো শ্রেণী শোষণ থেকে মুক্তি ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। এই স্বপ্নকে মাথায় রেখে আজকের পৃথিবীতে বামপন্থীরা এখনো আদর্শিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে দেশে দেশে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে যে তরুণেরা ছিটকে পড়ছে গণমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামযাত্রা থেকে, সে সংগ্রাম যাত্রায় ফিরবে তরুণরা এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

জামায়াত নেতার সুরতহাল সম্পন্ন, মাথা-কপালে-নাকে আঘাতের চিহ্ন
  • ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
দুর্নীতি ঠেকাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেনাকাটায় নতুন আদেশ
  • ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
কারিগরির ছুটির তালিকা প্রকাশ, দেখুন এখানে
  • ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
জামায়াতের দুই নেতা কেন মন্ত্রিত্ব ছাড়েননি, তারেক রহমানকে জব…
  • ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
বিকেএসপিতে চাকরি, পদ ৮টি, আবেদন শেষ ১২ ফেব্রুয়ারি
  • ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনি প্রচারণায় বাধার প্রদানের অভি…
  • ২৯ জানুয়ারি ২০২৬