ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় © ফাইল ফটো
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির চিত্র আশঙ্কাজনক হারে কমছে। এক সময়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণের শীর্ষে থাকা এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখন বিদেশি শিক্ষার্থীদের চরম সংকটে চলছে পাঠদান। ভর্তির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে যেখানে রেকর্ড সর্বোচ্চ ২২ জন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিলেন, ঠিক তার পরের শিক্ষাবর্ষগুলোতেই এই সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমতে থাকে। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৬ জনে এবং ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে তা আরও কমে হয় ১৪ জন।
সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে; যখন একমাত্র নেপাল থেকে একজন বিদেশি শিক্ষার্থী ইবিতে ভর্তি হয়। পরবর্তী বছরগুলোতেও এই পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত হয়নি। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে নেপাল, গাম্বিয়া, সোমালিয়া ও ভারত থেকে সর্বমোট ৬ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও এর পরের বছরগুলোয় তা আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাজ্য থেকে মাত্র একজন শিক্ষার্থী পিএইচডি কোর্সে ভর্তি হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে নেপাল ও ভারত থেকে মাত্র ৩ জন এবং ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত থেকে সর্বসাকুল্যে মাত্র ২ জন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।
ভর্তির সামগ্রিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ থেকে শুরু করে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে মোট ৭২ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, যার মধ্যে পুরুষ ৬২ জন এবং নারী মাত্র ১০ জন। তবে ভর্তি হওয়া মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে কোর্স সম্পন্ন করতে পেরেছেন মাত্র ৩৬ জন, যেখানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ২৩ জন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা অসমাপ্তই রয়ে গেছে।
বিশেষ করে স্নাতক পর্যায়েই এই হার সবচেয়ে বেশি; যেখানে ভর্তি হওয়া ৩১ জনের মধ্যে ১৫ জনই—অর্থাৎ প্রায় ৪৮.৩ শতাংশ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা অসমাপ্ত।
অন্যদিকে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সফলতার চিত্র কিছুটা ইতিবাচক; এই কোর্সে ভর্তি হওয়া ২৮ জনের মধ্যে ২২ জনই সফলভাবে তাদের ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। সব মিলিয়ে নানা শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান হিসাব করলে বর্তমানে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩ জন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বিভিন্ন কোর্সে অধ্যয়নরত রয়েছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক উপস্থিতির করুণ অবস্থাকেই ফুটিয়ে তোলে বলে মনে করছে সচেতন মহল।
এদিকে কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে সর্বসাকুল্যে ৩ জন বিদেশি শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন; যাদের মধ্যে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে গাম্বিয়া থেকে আসা ১ জন নারী শিক্ষার্থী এবং অন্য ২ জন নেপাল থেকে আসা শিক্ষার্থী।
শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহল মনে করছে, সেশনজট, উপযুক্ত ও নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থার অভাব, অধিকাংশ বিভাগে বাংলায় পাঠদান, আধুনিক গবেষণাগারের ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথাযথ প্রচার-প্রচারণার অভাবই বিদেশি শিক্ষার্থীদের এই বিমুখতার মূল কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন ছিল, ক্রমাগত শিক্ষার্থী কমে যাওয়া এবং ড্রপ আউটের উচ্চ হার সেই সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এ বিষয়ে কথা হয় লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের সঙ্গে। সামগ্রিক বিষয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভর্তি এবং পড়াশোনার বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে; অ্যাডভারটাইজিং, কানেক্টিং, কো-অর্ডিনেটিং-সহ আন্তর্জাতিক মানের পাঠদান করতে পারলে এবং সঠিকভাবে প্রচার-প্রচারণা পেলেই বিদেশি শিক্ষার্থীরা ভর্তির জন্য আকৃষ্ট হবে। কাঙ্ক্ষিত বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ প্রোপার অ্যাডভারটাইজমেন্টের অভাব। আমাদের আরও বেশি প্রচারমুখী হতে হবে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজসহ মিডিয়াতে ভর্তির বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা বৃদ্ধি করতে হবে।
বিদেশি শিক্ষার্থী ড্রপআউট বা ঝরে পড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীরা যে প্রত্যাশা নিয়ে এখানে ভর্তি হয় সে অনুযায়ী তারা সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় ঝরে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এছাড়াও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, যথাযথ আবাসন ব্যবস্থা না থাকাসহ ভাষাগত জটিলতার কারণেও অনেকে পড়াশোনা শেষ না করেই চলে যায়।
উত্তরণের উপায় হিসেবে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক সেলকে সুপার অ্যাক্টিভ করতে পারলে, সঠিক প্রক্রিয়ায় প্রচার-প্রচারণা করতে পারলে, বিদেশি শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়তে পারলে এবং দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যথাযথভাবে সমন্বয় করতে পারলে এ অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ সম্ভব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাফেয়ার্স সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. নাসিরুদ্দিন মিজি বলেন, আমার এই দপ্তরে পর্যাপ্ত জনবল নেই, একজন কর্মচারীও নেই। একাডেমিক সেলের একজন কর্মকর্তার সাথে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়, যে কারণে বেশ জটিলতার মধ্যেই চলছে এই দপ্তরের কাজ।
তিনি আরও বলেন, আমার দায়িত্ব গ্রহণ বেশিদিন হয়নি, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যাপারে আগের ভিসি স্যার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, যার ফলে ১৩-১৪ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। শিগগির ভিসি স্যারের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলব। আশা রাখছি সামনে ইনস্টিটিউশনাল ফ্রেমওয়ার্ক, জনবল সংকট, প্রচার-প্রচারণাসহ যাবতীয় দিকে বিশ্ববিদ্যালয় নজর দেবে। এছাড়াও বিদেশি শিক্ষার্থীদের কিছু ফ্যাসিলিটিজ না দিলে তো তাঁরা এখানে পড়বেন না; তাঁদের স্কলারশিপ, আবাসন সুবিধাসহ কিছু সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির হার বৃদ্ধি পাবে।