থমকে আছে ইবির সাজিদ হত্যার তদন্ত কার্যক্রম, অসন্তুষ্ট পরিবার

১০ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৩ PM
থমকে আছে ইবির সাজিদ হত্যার তদন্ত কার্যক্রম

থমকে আছে ইবির সাজিদ হত্যার তদন্ত কার্যক্রম © সংগৃহীত

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী শহীদ সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কার্যক্রম থমকে আছে। হলের পুকুর থেকে সাজিদের ভাসমান লাশ উদ্ধারের প্রায় ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো হত্যার কূলকিনারা করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে সাজিদ হত্যার বিচার আদৌ হবে কি-না তা নিয়ে সন্দেহ দানা বেঁধেছে। 

গতবছরের ১৭ জুলাই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান হলের পুকুর থেকে ভাসমান অবস্থায় সাজিদ আব্দুল্লাহর মরদেহ উদ্ধার করে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা। প্রথমে পানিতে ডুবে মৃত্যু বলে ধারণা করা হলেও সাজিদের ময়নাতদন্ত এবং ভিসেরা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তাকে পানিতে ফেলার আগেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। 

ফরেনসিক রিপোর্টে সাজিদকে শ্বাসরোধ করে হত্যার বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায় গত ৪ আগস্ট ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় হত্যা মামলা করেন সাজিদের বাবা আহসান হাবিবুল্লাহ দেলওয়ার। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। মামলাটি প্রথমে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার পুলিশ তদন্ত করলেও পরে সিআইডিতে চলে যায়।

সাজিদের মরদেহ উদ্ধারের পরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়ে ইবি শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন সময় ক্লাস পরীক্ষা বর্জন, বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, প্রতীকী লাশ মিছিল, মুখে কালো কাপড় বেধে মৌন কর্মসূচি সহ বিভিন্ন উপায়ে সহপাঠী হত্যার বিচার চেয়ে প্রশাসনের দ্বারে ঘুরতে দেখা যায় ইবি শিক্ষার্থীদের। তবে হত্যার এতদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো সন্দেহভাজন হিসেবেও কাওকে গ্রেফতার করতে পারনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। 

এদিকে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে ওঠা আন্দোলন নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে সাজিদের বিভাগ আল কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে দায়িত্বপ্রাপ্তির পর কয়েকদিন মহাসমারোহে আন্দোলন করলেও কয়েকদিন পর তা আমেজ হারায়। এভাবে একপর্যায়ে হারিয়ে যায় সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যার বিচার দাবিতে করা আন্দোলনের গতি। 

এরইমধ্যে গত ২৭ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে সাজিদ হত্যা মামলার তদন্তকাজে প্রয়োজনবোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষার্থী বা অন্য কোনো ব্যক্তিকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয় সিআইডিকে। তারা বিভিন্ন সময় সাজিদের বন্ধুবান্ধব, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ছাত্রনেতা, সাংবাদিক সহ অন্যান্যদের জিজ্ঞাসা করলেও এখনো কোন ক্লু বের করতে পারেননি। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপের মুখে কিছুদিন পরপর ইবির প্রক্টর অফিসে সিআইডির ব্রিফিংয়ের আয়োজন করলেও প্রায় একইধরনের আশাবাদ একাধিকবার ব্যক্ত করায় তা শিক্ষার্থীদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। দীর্ঘদিন যাবত বন্ধ আছে সেই আপডেট ব্রিফিংও। 

এছাড়া গতবছরের ২৮ অক্টোবর রাতে আল কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. নাছির উদ্দীন মিঝির একটি অডিও ফাঁস হয়। সেখানে সাজিদ হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলন করায় এক শিক্ষার্থীকে ‘তুই-তোকারি’ করে শাসানো এবং বিভাগের বাইরের নারী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বক্তব্য দিতে দেওয়ায় ক্ষোভ ঝাড়তে দেখা যায়। একইসাথে আন্দোলনরত নারী শিক্ষার্থীদের পোশাক নিয়েও কটুক্তি করেন ওই শিক্ষক। পরবর্তীতে তুমুল সমালোচনার মুখে তিনি বিষয়টা নিয়ে ক্ষমা চান। 

এদিকে, সাজিদ হত্যার তদন্তের কাজে ইবি থানা ও সিআইডি অনেকটা ব্যর্থ হলেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনে। তাতে দেখা যায়, সাজিদ হত্যার পরে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাজিদের ব্যবহৃত শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ১০৯ নং কক্ষটি থেকে কোন আলামত পাওয়া যায় কি-না দেখতে বেডটি উলটপালট করে এবং ওই অবস্থায় কক্ষটি সিলগালা করে রাখা হলেও দ্বিতীয় দফায় ২৩ জুলাই সংশ্লিষ্টরা যেয়ে সাজিদের রুমটি পরিপাটি অবস্থায় দেখতে পান। 

প্রশাসনের অগোচরে রুমে তৃতীয় কারো প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে বলে সন্দেহ হলে ওই রুমের সিলগালাকৃত তালার চাবির খোঁজ করা হয়। এ সময় জানা যায়, লাশ উত্তোলনের পর সাজিদ আব্দুল্লাহর ব্যবহৃত রুমটি তাৎক্ষণিকভাবে তালাবদ্ধ করে সিলগালা করার জন্য যে তালাটি রুমে লাগানো হয়েছিল সেই তালাটি হল মসজিদের। উক্ত তালার তিনটি চাবি, যার একটি চাবি হলের একজন কর্মচারীর নিকট, একটি হল মসজিদের ঈমামের নিকট এবং অপর চাবিটি সাদ্দাম হোসেন হলে অবস্থানরত একজন ছাত্রের নিকট রয়েছে বলে উঠে এসেছে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির রিপোর্টে। 

এছাড়াও, ওই সময় রুমে কে প্রবেশ করেছে তা জানতে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি হলের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করার উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সিসিটিভি ফুটেজ স্থাপনকারী টেকনিশিয়ান জানান, ক্যামেরা স্থাপনের পর (১৯ জুলাই) হল প্রভোস্ট যাতে অ্যনড্রোয়েড ফোনে সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে সেজন্য নির্দিষ্ট পাসওয়ার্ড সেট করা হয়েছিলো। কিন্তু ২০ জুলাই কে বা কারা এই ক্যামেরার পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে ক্যামেরার নিয়ন্ত্রন প্রভোস্টের মোবাইল নাম্বার হতে তার নিজের নাম্বারে পরিবর্তন করে দিয়েছে।

এতে সন্দেহ আরো ঘনীভূত হওয়ায় ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি নতুন করে যে মোবাইল নাম্বর সেট করা হয়েছে সে নাম্বারে ফোন করে। তখন জানা যায়, উক্ত নাম্বারটি হলের একজন থোক বরাদ্দের কর্মচারী মো. আব্দুল কাদেরের। তবে কেন তিনি সিসি ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ প্রভোস্টের ফোন থেকে নিজের ফোনের নিয়েছেন সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি কমিটির নিকট এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি বলে উল্লেখ করেছে প্রশাসনের গঠিত কমিটি। পরবর্তীতে সিআইডি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর এই ঘটনাটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছে কি-না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হলের ওই কর্মচারীকে চাপ দিলে অনেক তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা সাজিদের পরিবার, সহপাঠী ও শিক্ষার্থীদের। 

সাজিদ আব্দুল্লাহর বাবা আহসান হাবিবুল্লাহর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা আসলে তাগাদা দিতে দিতে অধৈর্য হয়ে গেছি। শুধু একটাই কথা বলে যে তারা কোন ক্লু পায় নাই। তাদের কার্যক্রমে আমরা মোটেও সন্তুষ্ট না। আমরা জানতাম যে সিআইডি গোপনে গোপনে তথ্য নেয় কাজ করে। কিন্তু এখানে দেখি যে যাওয়ার সময় সবাইকে জানান দিয়ে যায়। এভাবে গেলে কি তথ্য পাবে? এটা গোপনে করলে ভালো হতো মনে হয়। আমরা অধৈর্য হয়ে যাই কিন্তু তারা কোন আপডেট দেয় না। তাদের কে কী তথ্য দিচ্ছে সেটাও আমাদের দেয় না। 

পরিবারের কোন সন্দেহের ব্যাপারে জানতে চাইলে বলেন, প্রতি হলেই গেটম্যান থাকে, তারাই বা কী করে বুঝিনা। ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির রিপোর্টে কিছু সন্দেহের ইঙ্গিত আছে। ওরে রুমে কেও একজন ঢুকেছে, সিসি ক্যামেরার কন্ট্রোল নিয়েছে। এটা তো সন্দেহের। আবার ঘটনার দিন রুমমেটরা কেও ছিল না, এটাও বা কেমন। আবার আশপাশের রুমে তো কেও না কেও ছিলো। তারাই বা কী বললো, কী করলো জানিনা। আবার সাজিদের বন্ধু ইনসান সেদিন বলছিলো অনেক কিছু বলবে সময় হলে, সে আদৌ বলেছে কিনা। ও যেটা সিআইডি কে বলেছে সেগুলো আমাদেরও তো বলতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এতগুলো ছেলেমেয়ে, কেওই কিছু জানে না - এমন তো হতে পারে না। 

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী সিআইডি ইন্সপেক্টর সাইফুল ইসলাম বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যা মামলায় আমরা খুব গুরুত্বের সাথে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছি। তবে আমরা এখনো নির্দিষ্ট করে কাওকে শনাক্ত করতে পারিনি। তবে আশাকরি দ্রুতই আমরা তা কর‍তে পারবো। 

সাজিদের সিলগালা করা কক্ষে প্রবেশ ও সিসিটিভি নিয়ন্ত্রণ বদলের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির রিপোর্ট এখনো আমাদের কাছে আছে। আমরা সব অ্যাঙ্গেল থেকেই তদন্ত করছি। তবে এই ব্যাপারে তদন্তের স্বার্থে এখনি কিছু বলা যাবে না। 

চলন্ত ট্রেনে পাথরের আঘাতে চোখ হারানো বাউবি শিক্ষার্থীকে আর্…
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের ওপর নিউমার্কেট যুবদলের হামলায় আহত ৮
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
ঢাবিতে ফের সমকামিতার অভিযোগ, দুই ছাত্রকে হল থেকে বহিষ্কার
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের ওপর নিউমার্কেট যুবদলের হামলার অভিযোগ
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
আওয়ামী লীগের ৬ নেতাকর্মী কারাগারে
  • ১১ আগস্ট ২০২৬
তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্যেও আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভার…
  • ১১ আগস্ট ২০২৬