ঢাবি অধ্যাপকের পর্যালোচনা 

বিসিএস পরীক্ষার কাঠামো দক্ষ প্রার্থী বাছাই করতে পারছে না

২০ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪০ PM , আপডেট: ২০ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৪ PM
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন © টিডিসি ফটো

বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার বর্তমান কাঠামো যথাযথভাবে দক্ষ প্রার্থী বাছাই করতে পারছে না বলে দাবি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সাইকোমেট্রিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন। তার মতে, বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতিতে অর্জিত জ্ঞান এবং মানসিক সক্ষমতা বা যোগ্যতা একসঙ্গে মূল্যায়ন করায় প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এজন্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে প্রিলিমিনারি পরীক্ষার কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ করেছেন তিনি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) বিবেচনার জন্য প্রস্তুত করা একটি পর্যালোচনায় এসব পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরেন তিনি। ‘বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার স্ক্রিনিং পদ্ধতি: যথার্থতা (Validity), নির্ভরযোগ্যতা (Reliability), ন্যায্যতা (Fairness) ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক নীতি পর্যালোচনা প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক গবেষণা, সাইকোমেট্রিক বিশ্লেষণ এবং নিয়োগ ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বের আলোকে বর্তমান পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

নীতি পর্যালোচনা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, একটি কার্যকর স্ক্রিনিং পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এমন প্রার্থীদের বাছাই করা— যাদের ভবিষ্যতে সফল প্রশাসক হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বর্তমান বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ‘পূর্বে অর্জিত জ্ঞান’ এবং ‘ভবিষ্যৎ শেখার ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা’—এই দুই ভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে একত্রে একটি মোট নম্বরের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সাইকোমেট্রিক গবেষণা অনুযায়ী এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই এগুলোকে একই পদ্ধতিতে মিলিয়ে দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সাইকোমেট্রিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সাইকোমেট্রিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন।

অধ্যাপক কামাল উদ্দীনের মতে, বিসিএসকে আলাদা আলাদা পরীক্ষা হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত তিন ধাপের নির্বাচন প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে। প্রিলিমিনারি পরীক্ষার কাজ হবে কেবল বিশ্লেষণী ও মানসিক সক্ষমতার ভিত্তিতে প্রাথমিক বাছাই করা। লিখিত পরীক্ষায় যাচাই হবে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান এবং বিশ্লেষণ ধর্মী লেখনী। আর মৌখিক পরীক্ষায় মূল্যায়ন করা উচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নৈতিকতা, নেতৃত্ব ও আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগের মতো দক্ষতা। বর্তমানে এই তিন স্তরের মধ্যে কাঠামোগত সামঞ্জস্য নেই বলেই তিনি মনে করেন।

নীতি পর্যালোচনা প্রবন্ধে ভাষাগত মূল্যায়নের বর্তমান পদ্ধতি নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেছেন এই অধ্যাপক। তাঁর প্রবন্ধে বলেন, বর্তমানে বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে মোট ৭০ নম্বর। অর্থাৎ পুরো পরীক্ষার ৩৫ শতাংশ নম্বর ভাষা অংশে। কিন্তু এই নম্বরের বড় অংশই সাহিত্য নির্ভর। গবেষণায় দেখা গেছে, ইংরেজি অংশের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রশ্ন সাহিত্যভিত্তিক। একজন প্রার্থী শেক্সপিয়র, মিল্টন কিংবা বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিক তথ্য জানেন কি না, তা তাঁর প্রশাসনিক যোগাযোগ দক্ষতার নির্ভরযোগ্য সূচক হতে পারে না। প্রকৃত ভাষাগত দক্ষতা মূল্যায়ন করতে হলে ব্যাকরণ, অনুধাবন, রচনা এবং কার্যকর যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

নম্বর বণ্টনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের কথা তুলে ধরেছেন তিনি। বর্তমান ২০০ নম্বরের পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, বাংলাদেশ বিষয়াবলি, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, ভূগোল এবং নৈতিকতা মিলিয়ে পূর্বে অর্জিত জ্ঞান (Achievement)-নির্ভর অংশে রয়েছে ১৭০ নম্বর বা ৮৫ শতাংশ। বিপরীতে গণিত ও মানসিক দক্ষতা—যা যোগ্যতা (Aptitude) নির্ভর। এই অংশের জন্য মাত্র ৩০ নম্বর বা ১৫ শতাংশ বরাদ্দ। প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত যুক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার তুলনায় মুখস্থভিত্তিক বিষয়কে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পর্যালোচনা প্রবন্ধে আরও বলা হয়েছে, প্রিলিমিনারি পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা শুধু পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাতেও প্রভাব ফেলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিষয়ভিত্তিক গভীর জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে বিসিএস-কেন্দ্রিক মুখস্থ প্রস্তুতিতে বেশি সময় দিচ্ছেন। ফলে গবেষণা, সৃজনশীলতা এবং একাডেমিক উৎকর্ষ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতির কারণে বিসিএস থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন বলেও নীতিপত্রে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে বিসিএসের মডেল অনুসরণ করে দেশের অন্যান্য সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাও একই ধরনের কাঠামো গ্রহণ করছে। এর ফলে কোচিং নির্ভর প্রস্তুতি, আর্থ-সামাজিক বৈষম্য এবং প্রকৃত দক্ষতার পরিবর্তে পরীক্ষা কৌশল নির্ভর প্রতিযোগিতা আরও বাড়ছে।

এই অবস্থায় পর্যালোচনা প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক গবেষণার বিস্তৃত তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশের কর্মী নির্বাচন বিষয়ক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে দেখানো হয়েছে, (General Mental Ability) বা বিশ্লেষণী সক্ষমতা ভবিষ্যৎ কর্মদক্ষতার অন্যতম শক্তিশালী পূর্বাভাস। একই সঙ্গে ভাষা মূল্যায়ন, পরীক্ষার বৈধতা এবং ন্যায্যতা নিয়ে প্রকাশিত একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণাও উদ্ধৃত করা হয়েছে। প্রবন্ধে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ২০২০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণার কথা। সেখানে ৩৫তম থেকে ৩৮তম বিসিএস প্রিলিমিনারির ইংরেজি প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পরীক্ষাটি প্রকৃত ভাষাগত দক্ষতা যাচাইয়ের পরিবর্তে সাহিত্যনির্ভর মুখস্থবিদ্যাকে উৎসাহিত করেছে। বিসিএস কর্মকর্তা এবং পরীক্ষার্থীদের সাক্ষাৎকারেও একই মত উঠে আসে।

এসব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বিসিএস প্রিলিমিনারির জন্য একটি নতুন কাঠামোও প্রস্তাব করেছেন ড. কামাল। সেখানে পরীক্ষাকে দুই সমান অংশে ভাগ করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম অংশ 'General Studies'—১০০ নম্বর। এতে থাকবে বাংলাদেশ ও বিশ্ব ইতিহাস, ভূগোল, পরিবেশ, অর্থনীতি, সমসাময়িক বিষয়, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি। দ্বিতীয় অংশ 'Cognitive Aptitude Test'—১০০ নম্বর। এতে থাকবে ভাষাগত দক্ষতা (সাহিত্য বাদ দিয়ে), যৌক্তিক বিশ্লেষণ, সংখ্যাগত যুক্তি, স্থানিক বিশ্লেষণ এবং পরিস্থিতিভিত্তিক নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই দুই অংশে আলাদা আলাদা পাস করতে হবে। একটি অংশে বেশি নম্বর পেয়ে অন্য অংশের দুর্বলতা ঢেকে দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। এর মাধ্যমে প্রকৃত জ্ঞান এবং প্রকৃত সক্ষমতা—দুই দিকই আলাদাভাবে মূল্যায়িত হবে বলে মনে করেন গবেষক।

পর্যালোচনা প্রবন্ধে আরও বলা হয়েছে, বিসিএসের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন, নম্বর বণ্টন এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়মিত সাইকোমেট্রিক পর্যালোচনার আওতায় আনা উচিত। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরীক্ষার বৈধতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং বৈষম্য আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।

নীতি প্রবন্ধে পিএসসির জন্য ১০ দফা সুপারিশও তুলে ধরেছেন অধ্যাপক কামাল। সুপারিশগুলো হলো—  ‘Achievement ও Aptitude-এর জন্য পৃথক নম্বর এবং পৃথক কাট-অফ চালু করা’, ‘প্রতিটি ক্যাডারের জন্য Job Analysis করে প্রয়োজনীয় দক্ষতা নির্ধারণ করা’, ‘পরীক্ষার Predictive Validity যাচাইয়ে পাইলট গবেষণা পরিচালনা করা’, ‘বিষয়ভিত্তিক নম্বর বণ্টন বাস্তব কর্মদক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্নির্ধারণ করা’, ‘ভাষা অংশ থেকে সাহিত্যনির্ভর প্রশ্ন কমিয়ে ব্যাকরণ, অনুধাবন ও বোধগম্য প্রকৃত ভাষাগত দক্ষতায় গুরুত্ব দেওয়া’, ‘নৈতিকতা মূল্যায়নে MCQ-এর পরিবর্তে Situational Judgment Test বা কাঠামোবদ্ধ সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত করা’, ‘Bloom’s Taxonomy  অনুসারে উচ্চতর চিন্তন দক্ষতা মূল্যায়নের উপযোগী প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্মৃতি নির্ভর প্রশ্নের অনুপাত হ্রাস করা’, ‘একাডেমিক ফলাফল প্রিলিমিনারি স্কোরের সঙ্গে সংযুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা’, ‘সরকারি প্রশ্নব্যাংক বা বড় Item Pool তৈরি করা’, ‘নিয়মিত Psychometric Review, Item Analysis এবং Differential Item Functioning (DIF) পরীক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক অনুশীলন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা’।

প্রবন্ধের উপসংহারে অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দীন বলেছেন, বিসিএস প্রিলিমিনারি শুধু একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নয়, এটি রাষ্ট্রের মানবসম্পদ নির্বাচনের প্রবেশদ্বার। তাই পরীক্ষার প্রতিটি ধাপকে বৈজ্ঞানিকভাবে যথার্থ, নির্ভরযোগ্য, ন্যায্য এবং বাস্তব কর্মদক্ষতার পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হতে হবে। তাঁর মতে, সাইকোমেট্রিক প্রমাণ, জব অ্যানালাইসিস এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে এখনই বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার কাঠামো পুনর্বিবেচনার উপযুক্ত সময়।

প্রবন্ধের বিষয়ে অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দীন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গবেষণা ও সৃজনশীলতার দিকে না ঝুঁকে মুখস্থ বিদ্যা নির্ভর চাকরি পরীক্ষার দিকে বেশি মনোনিবেশ করে। আসলে প্রকৃত সমস্যা চাকরির পরীক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোতে। আমি দীর্ঘ দিন ধরে শিক্ষার্থীদের ও দেশের চাকরি পরীক্ষার কাঠামোর নিয়ে সমস্যা অনুধাবন করে আসছি। আগে থেকেই এরকম একটা প্রবন্ধ তৈরী করার জন্য চেষ্টা করে আসছিলাম। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রকাশনা ঘেটে, কয়েকজন পরীক্ষার্থী, ক্যাডার, শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ শেষ করে অনেক দিনের চেষ্টায় অবশেষে তৈরী হয়েছে। ইউজিসি চেয়ারম্যানের নিকট একটা কপি দিয়ে এসেছি। বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে প্রিলিমিনারি পরীক্ষার কাঠামো পুনর্বিন্যাসের জন্য সুপারিশ করেছি।

প্রাথমিকের দুই বিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষককে শোকজ
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
ইমেরিটাস অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাকের ৮৫তম জন্মবার্ষিকীতে বরেন…
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
সুন্দরবনের জলদস্যুদের অন্ধকার জগতের গল্প শোনাতে খুবিতে আসছে…
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
ট্রাম্পের প্রচারণার পোস্ট থেকে সরানো হলো টেইলর সুইফটের গান
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
অ্যাসিস্ট্যান্ট মার্চেন্ডাইজার নিয়োগ দেবে আড়ং, আবেদন ১৫ আগ…
  • ১২ আগস্ট ২০২৬
মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের জুলাইয়ের বেতনের চেক ছাড়
  • ১২ আগস্ট ২০২৬