দেশে মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার, বেসরকারি ৫৩ হাজার
প্রাক্-প্রাথমিকে সরকারির চেয়ে বেসরকারি পর্যায়ে পড়েছে অধিকাংশ শিক্ষার্থী © টিডিসি সম্পাদিত
দেশে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চলছে ২৫ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী রয়েছে ২ কোটি ১ লাখের বেশি। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে ১ কোটি ৬ লাখ। পাশাপাশি প্রায় ৯৬ লাখ শিক্ষার্থীই বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের। অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৪৮ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরে পড়াশোনা করেছে। শুধু কিন্ডারগার্টেনেই রয়েছে ৫০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘শিক্ষা জরিপ ২০২৫’ প্রতিবেদনে প্রাথমিক শিক্ষার এ চিত্র উঠে এসেছে। এতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) পরিচালিত বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি (এপিএসসি) ২০২৪-এর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
ব্যানবেইসের প্রতিবেদন অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, বেসরকারি বিদ্যালয়, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন, এনজিও স্কুল, উচ্চ মাদ্রাসা সংলগ্ন ইবতেদায়ি বিভাগ, উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন প্রাথমিক বিভাগ, শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট স্কুল, এনজিও লার্নিং সেন্টার এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।
এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রয়েছেন ৭ লাখ ৭ হাজার ২১৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ শিক্ষক ২ লাখ ৭০ হাজার ২১৪ জন এবং নারী শিক্ষক ৪ লাখ ৩৭ হাজার ২ জন। অর্থাৎ মোট শিক্ষকের ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ নারী। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ৯৮ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬২ জন এবং ছাত্রী ১ কোটি ৩ লাখ ২৯ হাজার ৮৬ জন।
সরকারি প্রাথমিক ৬৫ হাজার, বেসরকারি পর্যায়ে ৫৩ হাজার বিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫ হাজার ৫৬৭টি। এ ছাড়া কিন্ডারগার্টেন রয়েছে ২৬ হাজার ২৯৯টি [যদিও সর্বশেষ জুলাই ২০২৬-এ সংসদে দেওয়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের তথ্যমতে ৩২ হাজার)। উচ্চ মাদ্রাসা সংলগ্ন ইবতেদায়ি বিভাগ রয়েছে ৯ হাজার ৪০৬টি, বেসরকারি বিদ্যালয় ৫ হাজার ১৮৭টি, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ৩ হাজার ৪১৩টি, এনজিও স্কুল ২ হাজার ৮৩১টি এবং উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন প্রাথমিক বিভাগ ২ হাজার ৭৬৭টি। এ ছাড়া এনজিও লার্নিং সেন্টার রয়েছে ১ হাজার ৭২৭টি, শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত স্কুল ২০৫টি এবং অন্যান্য শ্রেণিভুক্ত প্রতিষ্ঠান ১ হাজার ২০৫টি।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৪ জন এবং শিক্ষার্থী ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ জন।
কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষক ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩৭৪ জন এবং শিক্ষার্থী ৫০ লাখ ৮ হাজার ৮৫০ জন। উচ্চ মাদ্রাসা সংলগ্ন ইবতেদায়ি বিভাগে শিক্ষক ৩১ হাজার ১৮৩ জন এবং শিক্ষার্থী ১৪ লাখ ৩২ হাজার ১২৭ জন। বেসরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষক ৩১ হাজার ৪৭৭ জন এবং শিক্ষার্থী ৬ লাখ ৮৬ হাজার ১৯৫ জন।
ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় শিক্ষক ১৯ হাজার ৪৮০ জন এবং শিক্ষার্থী ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ জন। এনজিও স্কুলে শিক্ষক ৮ হাজার ১৮২ জন এবং শিক্ষার্থী ৪ লাখ ৯১ হাজার ৫২৯ জন। উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন প্রাথমিক বিভাগে শিক্ষক ২১ হাজার ৬৪৭ জন এবং শিক্ষার্থী ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৮৯৬ জন।
এনজিও লার্নিং সেন্টারে শিক্ষক ৩ হাজার ৮১৩ জন এবং শিক্ষার্থী ২ লাখ ৩৭ হাজার ৭৫৩ জন। শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত স্কুলে শিক্ষক ১ হাজার ২৩৫ জন এবং শিক্ষার্থী ২৭ হাজার ৬৮১ জন। অন্যান্য শ্রেণিভুক্ত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ৮ হাজার ২০১ জন এবং শিক্ষার্থী ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৫৫ জন।
প্রতিষ্ঠানভেদে নারী শিক্ষকের হারেও পার্থক্য রয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক ৬৫ দশমিক ৯ শতাংশ। বেসরকারি বিদ্যালয়ে এ হার ৬৪ শতাংশ এবং কিন্ডারগার্টেনে ৬২ দশমিক ১ শতাংশ।
অন্যদিকে, ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় নারী শিক্ষকের হার ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং উচ্চ মাদ্রাসা সংলগ্ন ইবতেদায়ি বিভাগে মাত্র ২০ দশমিক ৪ শতাংশ। এনজিও লার্নিং সেন্টারে নারী শিক্ষকের হার সর্বোচ্চ ৯৩ দশমিক ২ শতাংশ।
প্রাক্-প্রাথমিকেও বেসরকারি পর্যায়ে পড়েছে ৫৩ শতাংশ শিক্ষার্থী
প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষায়ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু ভর্তি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রাক্-প্রাথমিক স্তরে মোট শিক্ষার্থী ছিল ৩৪ লাখ ৯৬ হাজার ৪২৩ জন। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল ১৬ লাখ ৩২ হাজার ৪২৬ জন, যা মোট শিক্ষার্থীর ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে, কিন্ডারগার্টেনসহ অন্যান্য ধরনের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিল ১৮ লাখ ৬৩ হাজার ৯৯৭ জন শিশু। অর্থাৎ প্রাক্-প্রাথমিক স্তরের ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরে ভর্তি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হিসাবে, কিন্ডারগার্টেনে প্রাক্-প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হয়েছিল ১২ লাখ ৪৮ হাজার ১৫৭ জন শিশু, যা মোট শিক্ষার্থীর ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ। এ ছাড়া উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন প্রাথমিক বিভাগে ১ লাখ ৬৯ হাজার ১৫৮ জন, বেসরকারি বিদ্যালয়ে ১ লাখ ১২ হাজার ৫৫৬ জন এবং এনজিও স্কুলে ১ লাখ ১১ হাজার ৫৯০ জন শিশু ভর্তি হয়েছিল।
এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী যেহেতু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করছে, সেক্ষেত্রে তাদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির আওতায় আনা হবে এবং তাদের শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকার ভাবনার কথা জানিয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শাহীনা ফেরদৌসী।
শাহীনা ফেরদৌসী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এটি মূলত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি বিষয়। প্রাথমিকে যারা বেসরকারি পর্যায়ে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাদের সরকারি আইন ও বিধিমালার আওতায় আসতে হবে। সে জন্য নিবন্ধন করতে হবে। এরপর নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পূর্ণ নিবন্ধন পেতে হবে। এ বিষয়ে আমরা ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছি এবং সভা করেছি। জেলা, বিভাগ ও উপজেলা পর্যায়ে আমাদের কর্মকর্তারা বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোকে সরকারি নিবন্ধনের আওতায় আসতে উদ্বুদ্ধ করেচি এবং এ বিষয়ে আরও কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, সব বেসরকারি বিদ্যালয়কে নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে। নিবন্ধিত হলে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি তাদের কার্যক্রম তদারকির আওতায় আনা সম্ভব হবে। আগে নিবন্ধনের প্রক্রিয়াটি অফলাইনে ছিল, এখন অনলাইনে সহজ করা হয়েছে, যাতে তারা সহজেই আবেদন করতে পারে। ফলে আগের তুলনায় নিবন্ধনের আওতায় আসা বেসরকারি পর্যায়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সংখ্যা বেড়েছে। এ কারণে সেসব প্রতিষ্ঠান কিছু সুবিধাও পাচ্ছে। যেমন, আগে যেসব প্রতিষ্ঠান বৃত্তি কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পেত না। নিবন্ধনের আওতায় আসার ফলে তাদের সেই সুযোগ বেড়েছে। এভাবে ধীরে ধীরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও আমাদের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হবে।
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোকে আমাদের নির্ধারিত পাঠদান পদ্ধতি অনুসরণ করার জন্য বলা হয়েছে। সরকারিভাবে যে বইগুলো দেওয়া হয়, সেগুলো তাদের পাঠদান কার্যক্রমেও থাকবে। আমরা নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছি, যাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের নির্ধারিত পাঠদান পদ্ধতি অনুসরণ করে।