শরিফ ওসমান হাদি © সংগৃহীত
চলতি মাসের শুরুতে একটি টেলিভিশন টকশোতে শহীদ শরীফ ওসমান হাদিকে নিয়ে কথা বলেন নুরুল হক নুর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি নুর বর্তমানে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী। টকশোতে তিনি বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাশে শরীফ ওসমান হাদিকে সমাহিত করা উচিত হয়নি। তার ভাষ্য, পাঁচ বা দশ বছর পর মানুষ প্রশ্ন করতে পারে, ‘হাদি কে? দেশের জন্য তার অবদান কী?’
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বক্তব্যটির ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এর জবাবে একটি ভিডিও নিজের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে পোস্ট করেন ডাকসুর বর্তমান ভিপি (সহসভাপতি) সাদিক কায়েম। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কয়েকজন শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে আলোচিত ইসলামি বক্তা রফিকুল ইসলাম মাদানীও প্রতিমন্ত্রী নূরের বক্তব্যের সমালোচনা করেন। পরে অবশ্য নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন নুর। ১০ অক্টোবরের মধ্যে নুর সাংবাদিকদের বলছিলেন, হাদি নিজের পরিচয়েই পরিচিত এবং তার আপত্তি কেবল সমাধিস্থলের বিষয়ে।
এই বিতর্কে নুরের বক্তব্যের একটি অংশ সমর্থন পায়, অন্য অংশ প্রশ্নের মুখে পড়ে। ৩৫ বছরের কম বয়সী অনেক বাংলাদেশির কাছে প্রশ্নটি প্রায় অবমাননাকর। অন্যদিকে, বয়স্ক অনেক পাঠক এবং অনলাইনে রাজনৈতিক ভিডিও খুব একটা দেখেন না—এমন মানুষের কাছে প্রশ্নটি যুক্তিসংগত। এর একটি সরল উত্তর দেওয়া প্রয়োজন।
হাদির জীবন ও রাজনৈতিক পথচলা
হাদির জন্ম ১৯৯৩ সালে ঝালকাঠির নলছিটিতে। মাদ্রাসাশিক্ষক বাবার ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদ্রাসায় আলিম পর্যন্ত পড়াশোনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন হাদি। টিউশনি আর একটি কোচিং প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি পড়িয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতেন হাদি— গড়পড়তা বাকি ১০জন বাংলাদেশি স্নাতক পড়ুয়াদের মতোই জীবন ছিল তার। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার আগে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করতেন হাদি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি রাজধানীর রামপুরায় থাকতেন এবং সেখানকার আন্দোলনে অংশ নেন। তবে আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর মধ্যে তিনি ছিলেন না। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট আবদুল্লাহ আল জাবেরকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করেন। সংগঠনটি নিজেদের ‘সব ধরনের আধিপত্যবাদের’ বিরুদ্ধে একটি সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচয় দিত। শুরুতে তাদের দাবির মধ্যে ছিল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা, আন্দোলনকারীদের হত্যার জন্য দায়ীদের বিচার এবং ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
২০২৫ সালে হাদি ঘোষণা দেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। নির্বাচনে ব্যয়ের জন্য তিনি জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন এবং প্রতিটি হিসাব প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দেন। যেটি মানুষের মধ্যে বেশ গ্রহণযোগ্যতা পায়।
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর, নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পরদিন, পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ব্যাটারিচালিত রিকশায় ছিলেন হাদি। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মোটরসাইকেলে থাকা এক বন্দুকধারী তার মাথায় গুলি করে। পরে সেই বন্দুকধারীর পরিচয় বের করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
১৫ ডিসেম্বর তাকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। ১৮ ডিসেম্বর রাতে ৩২ বছর বয়সে সেখানে তার মৃত্যু হয়। ২০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের বাইরে তার বড় ভাইয়ের ইমামতিতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে জানাজায় উপস্থিত মানুষের সংখ্যা কয়েক লাখ ছিল, যদিও হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পরে পরিবারের অনুরোধে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি কমপ্লেক্সে দাফন করা হয়।
জনতুষ্টিবাদী, তবে সাংস্কৃতিক রাজনীতির প্রবক্তা
হাদির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে তিনি নিজেই দ্বিধা রাখতেন না। তিনি জাতীয়তাবাদী ও আধিপত্যবিরোধী ছিলেন এবং ধর্মীয় ভাষা ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ ছিলেন। তবে তার রাজনীতি প্রচলিত দলীয় কর্মসূচির চেয়ে সাংস্কৃতিক ভাবনার ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। পরবর্তী ঘটনাগুলো বুঝতে এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে জনতুষ্টিবাদী রাজনৈতিক প্রবণতা ধর্মীয় ডানপন্থার দিকে ঝুঁকেছে। হাদি সেই প্রবণতার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং এর কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু তিনি কেবল সেই ঢেউয়ে ভেসে যাননি। তিনি এমন একটি আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যা সরাসরি জনগণের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এর অংশ হিসেবে ছিল পাঠাগার, পাঠচক্র, গণচাঁদা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং ঘরে ঘরে প্রচারণা। ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়া রাজনৈতিক স্রোত তাকে যেদিকে নিয়ে যেতে চেয়েছে, তিনি সব সময় সেদিকে যাননি। তার সমর্থকেরা এটিকে নীতিগত অবস্থান হিসেবে দেখেছেন, আর সমালোচকেরা দেখেছেন ‘অস্পষ্টতা’ হিসেবে।
হাদি জনগণের কাছ থেকে নির্বাচনী প্রচারণার অর্থ সংগ্রহ করেন এবং নিয়মিত হিসাব প্রকাশ করেন। তিনি মুড়ি ও বাতাসা খেয়ে প্রচারণা চালাতেন, ফজরের নামাজের পর বের হতেন এবং দিনের পর দিন বাড়ির বাইরে থাকতেন। তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে। তবে জোর করে কোনো আদর্শ চাপিয়ে দেওয়া যায় না—এ বিষয়টি হাদি বুঝতেন। এ কারণেই তিনি ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে নিজের মতের বিরোধীদেরও, এমনকি অনেক সমালোচককেও পাঠচক্রে আমন্ত্রণ জানাতেন।
সংস্কৃতি, ধর্ম ও রাজনৈতিক দল
হাদির অভিযোগ ছিল, কয়েক দশক ধরে একটি ধর্মনিরপেক্ষ বামপন্থী গোষ্ঠী দেশের মঞ্চ, সংবাদকক্ষ ও পুরস্কার কমিটিগুলো নিয়ন্ত্রণ করেছে। তিনি এ অবস্থাকে ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ’ বলে অভিহিত করেন এবং আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দলের চেয়ে একটি কাল্ট বা অন্ধ আনুগত্যভিত্তিক গোষ্ঠীর সঙ্গে বেশি তুলনা করেন। তার মতে, গত ৫০ বছরের মধ্যে শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চ ছিল সবচেয়ে বড় সংগঠিত জনসমাবেশ এবং এটি একটি সমান্তরাল রাষ্ট্রের মতো কাজ করেছে।
এর সমাধান হিসেবে তিনি নিষেধাজ্ঞার বদলে প্রতিযোগিতার কথা বলেন। ধর্মের প্রশ্নে রক্ষণশীল মুসলিম শ্রোতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তিনি খেলাফত প্রতিষ্ঠার পক্ষে প্রচারণা চালান না। তার মতে, ইসলাম বাংলাদেশের ধর্মতত্ত্বের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও একটি অংশ। নিজের একটি সমাবেশে ব্যাপক মানুষের সিজদা দেওয়ার ঘটনাকে তিনি উপাসনা নয়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেন।
ধর্ম প্রভাবিত রাজনীতিবিদ হয়েও অপছন্দের বিষয় নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেননি—এমন উদাহরণ হিসেবে তিনি তিউনিসিয়ার রশিদ ঘানুশির কথা উল্লেখ করেন। একই আলোচনায় তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ ধর্মপ্রাণ মুসলিম হলেও দক্ষতার অভাবে তাদের সাংস্কৃতিক ক্ষমতা কম। এ কারণে তিনি তাদের ভাষা শেখা, ভিডিওগ্রাফি এবং সংবাদমাধ্যমে কাজের কৌশল রপ্ত করার আহ্বান জানান।
সংখ্যালঘুদের নিজস্ব রাজনৈতিক কণ্ঠ তৈরির জন্য হিন্দু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের সম্ভাবনার কথাও তিনি বলেন। পাঠকেরা এই ধারণাকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন। এখানে এটি কেবল তার মতামত হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও হাদির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মিশ্র। তিনি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াকে সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করলেও বলেন, ছায়ানট ও উদীচীর সাংস্কৃতিক প্রভাবের মোকাবিলায় বিএনপির কোনো সাংস্কৃতিক কৌশল নেই। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এনসিপি ‘জুলাই আন্দোলনকে কুঠার মেরেছে’। ইউনূস সরকারের কার্যক্রমের রেটিংয়ে তিনি ১০-এর মধ্যে ৬ দেন।
ইনকিলাব মঞ্চকে জামায়াতের ‘বি-টিম’ বলা হলে হাদি সহজভাবেই বলেছেন, ডাকসু নির্বাচনে সংগঠনটি (ইনকিলাব মঞ্চ) ছাত্রশিবিরের সঙ্গে কোনো জোট করেনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন সদস্য ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিকল্প গণমাধ্যমের যুক্তি
সংবাদমাধ্যম নিয়ে হাদির সমালোচনা ছিল তীব্র, তবে তিনি সংবাদমাধ্যমের অস্তিত্বের বিরোধী ছিলেন না। তার অভিযোগ ছিল, মূলধারার গণমাধ্যম গুম ও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা উপেক্ষা করেছে, অথচ অন্য কিছু বিষয়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছে। তবে তিনি কখনোই সংবাদপত্র বন্ধের দাবি জানাননি।
গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম আলোর কার্যালয়ের বাইরে যখন জনতা জড়ো হয়েছিল, তখন ইনকিলাব মঞ্চ ওই কর্মসূচিকে সমর্থন করেনি বলে হাদি জানান। তিনি বলেন, ‘পারলে প্রথম আলোর আরও দশটি বিকল্প তৈরি করুন।’ তার মতে, প্রভাবশালী বয়ানের জবাব দিতে হবে পাল্টা বয়ান দিয়ে, জনতার হামলা দিয়ে নয়।
প্রথম আলোর এক কলামিস্ট স্মরণ করেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইন্টারনেট বন্ধ থাকার সময় ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম যখন তীব্র চাপের মুখে ছিল, তখন জাতীয় দৈনিকগুলোর মুদ্রিত সংস্করণ দেশের সহিংসতার ব্যাপকতা তুলে ধরেছিল। ওই কলামিস্টের মতে, হাদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিশ্বাস করতেন, যেখানে একটি ধারণার জবাব আরেকটি ধারণা দিয়ে দেওয়া হয়।
তবে হাদির মৃত্যুর পর যে হামলাগুলো ঘটেছে, সেগুলোর কারণে এই বক্তব্যগুলোর প্রচার আরও কঠিন হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তার সমালোচকেরা বলেছেন, তিনি যা বলতেন, তার নামে যা করা হয়েছে, তার মধ্যে বড় ব্যবধান ছিল।
সমালোচকেরা যে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন
হাদির সমালোচকদের সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তির অনেকটাই এসেছে তার নিজের বক্তব্য থেকে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এনসিপির ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পর তিনি নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের সমর্থকদের উদ্দে্শ্য করে অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন এবং জেলাটিকে বিলুপ্ত করার আহ্বান জানান। পরে তিনি বলেন, তিনি পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির বিরোধী এবং গোপালগঞ্জের মানুষের বিরুদ্ধে তার কোনো ক্ষোভ নেই।
তিনি ধানমন্ডি ৩২-কে ‘ফ্যাসিবাদের উপাসনালয়’ বলে অভিহিত করেন। হাদির প্রতি মোটামুটি সহানুভূতিশীল হাসান উজ জামান শ্যামল লিখেছিলেন, ভবনটি ভাঙার ঘটনায় হাদির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গণঅভ্যুত্থানের পরপরই নির্বাচনী রাজনীতিতে যাওয়ার আগে জনতাকে সংগঠিত করার কথিত প্রচেষ্টা নিয়েও তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন।
টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে উপস্থাপকেরা তার বক্তব্যে ‘ছিঁড়ে ফেলা’ ও ‘হত্যা করা’র মতো শব্দ ব্যবহারের প্রসঙ্গ তোলেন। এক টেলিভিশন আলোচনায় এনসিপি নেতা সারজিস আলমের একই ধরনের সহিংস ভাষার বক্তব্যকে রাজনৈতিক বাগ্ভঙ্গি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন হাদি। তবে এ মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন ডা. আব্দুর নূর তুষার।
বিতর্ক, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, লেখালেখি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত ড. তুষারকে হাদি বলেন, ভাষার অর্থ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। রাজপথের সমাবেশ, নীতিনির্ধারণী আলোচনা ও টেলিভিশন স্টুডিওতে কথা বলার ধরন এক হতে পারে না। হাদির ব্যাখ্যা ছিল, গণহত্যার জন্য দায়ী বলে যাদের তিনি মনে করেন, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতাহীন মানুষের অস্ত্র হতে পারে প্রাত্যহিক ব্যবহৃত শব্দমালা। তবে তার মতে, শিক্ষিত মানুষের হাতেই এমন ভাষা নিরাপদ, কারণ তারা জানেন কাকে লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়।
হাদির জানাজার পর ড. তুষার একই ব্যক্তিকে নিয়ে টেলিভিশনে কথা বলেন। তিনি হাদিকে একজন বিদ্রোহী হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি পর্দায় কখনো কখনো আক্রমণাত্মক হলেও ক্যামেরার বাইরে তার সঙ্গে আন্তরিকভাবে মিশতেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হাদি প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এবং একটি পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তবে তিনি বলেন, অনেক কিছু মেনে নেওয়া গেলেও হাদির নিজের সঙ্গীরাই নাকি তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন—এমন কথা শোনা নিষ্ঠুরতার শামিল।
মৃত্যুর পরের সহিংসতা
হাদির মৃত্যুর খবর ঘোষণার পর কয়েক ঘণ্টা ছিল সহিংসতাপূর্ণ। একটি আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এর আগে ইনকিলাব মঞ্চ অনুসারীদের সহিংসতা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছিল।
রাতের মধ্যে জনতা কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা চালায়। একটি ভবনে আগুন দেওয়া হয়। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন সাংবাদিক ও কর্মী ছাদে আটকা পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাদের উদ্ধার করেন। ছায়ানট ও উদীচীতেও হামলা হয়।
অনেকে হাদির নামে চালানো এসব হামলাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং ফ্যাসিবাদী প্রবণতার লক্ষণ বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে, বিদেশে থাকা অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থক অনলাইনে হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় উল্লাস প্রকাশ করেন। এর বিপরীতে, তার মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে শোক দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে তা ছিল বিরল।
হত্যা মামলার নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি গোয়েন্দা পুলিশ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। এতে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদকে গুলিবর্ষণকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে মামলার বাদী জাবের অভিযোগপত্র প্রত্যাখ্যান করেন। পরে আদালত মামলাটি অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) পাঠান।
মার্চে ভারতীয় সীমান্তে ফয়সাল ও তার এক কথিত সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এপ্রিলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের ফেরত পাঠাতে ভারত সম্মত হয়েছে। তবে তাদের হস্তান্তরের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি আদালত সিআইডির প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ২০তমবারের মতো পিছিয়ে ৩ নভেম্বর নির্ধারণ করেন।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির মির্জা আব্বাস ৫৯ হাজার ৩৬৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী পান ৫৪ হাজার ১২৭ ভোট। ইনকিলাব মঞ্চ হাদির বিকল্প কোনো প্রার্থী দেয়নি।
হাদির স্মৃতি রাষ্ট্রীয়ভাবে কীভাবে সংরক্ষিত হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের জুন মাসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে তার জীবন ও আন্দোলনের কথা থাকছে না। তবে ২০২৮ সালে পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে তাকে নিয়ে একটি অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
কীভাবে একটি নাম প্রতীকে পরিণত হয়েছে
হাদির পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছিল এমন কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে, যেগুলো ৫০ বছরের বেশি বয়সী অনেক সম্পাদক নিয়মিত অনুসরণ করেন না। হাদি প্রায় এক দশক ইংরেজি ও আইইএলটিএস পড়িয়েছেন। তার সাবেক শিক্ষার্থীরা প্রথম দিকের অনুসারীদের মধ্যে ছিলেন। তিনি কবিতাও লিখতেন, আর গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তার কবিতার নতুন পাঠক তৈরি হয়।
ছোট ভিডিও ক্লিপও তাকে আরও পরিচিত করে তোলে। ৪০ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে বক্তব্যের ব্যাখ্যা বা প্রেক্ষাপট তুলে ধরার সুযোগ খুব কম থাকে। একই ব্যক্তির দুটি ভিডিও ক্লিপ বিপরীত দুটি ধারণা তৈরি করতে পারে।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হাসিমুখে একজন প্রার্থী নিজের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করছেন। অন্যটিতে দেখা যায়, গোপালগঞ্জ নিয়ে ক্ষুব্ধ ভাষায় কথা বলছেন একজন ব্যক্তি। দুটি ভিডিও আলাদা দর্শকের কাছে পৌঁছায় এবং তার সম্পর্কে আলাদা ধারণা তৈরি করে। এভাবেই একজন ব্যক্তি একটি প্রজন্মের কাছে অনিবার্য হয়ে উঠতে পারেন, অথচ অন্য প্রজন্মের কাছে প্রায় অপরিচিত থেকে যান।
মৃত্যুর পর সমর্থকেরা তাকে সাধক, শহীদ ও নায়ক বলেছেন। বিরোধীরা তাকে জামায়াতের বি-টিম, এনসিপির বি-টিম, ভারতবিরোধী উগ্রপন্থী ও জনতাকে উসকে দেওয়ার কারিগর হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এসব পরিচয়ের খুব কমই ছিল তার নিজের দেওয়া।
পরিচয়ের আড়ালের মানুষটি
বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে হাদি বলেছিলেন, পৃথিবীতে আবার জন্ম নেওয়ার সুযোগ পেলে দুটি বিষয় তিনি আবারও বেছে নিতেন—তার পরিবার ও মাদ্রাসা। মাদ্রাসার স্মৃতিচারণায় তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে উঠতেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে শিক্ষার্থীরা রবীন্দ্রনাথের নাটক মঞ্চস্থ করতেন, রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলগীতি গাইতেন এবং জারি ও ভাটিয়ালি চর্চা করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার মাদ্রাসার পটভূমির কারণে তাকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সমর্থক হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছিল বলে তিনি স্মরণ করেন।
তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল্য দিতে হয়েছে পরিবারকেও। হাদি বলেছিলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং আত্মীয়স্বজন তাকে বাড়িতে থাকার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় দিনের পর দিন তিনি নিজের শিশুসন্তানকেও দেখতে পারেননি। পরে অন্তর্বর্তী সরকার তার স্ত্রী ও সন্তানের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
মৃত্যু নিয়েও যেন একধরনের পূর্বানুমান ছিল তার। এক সাক্ষাৎকারে হাদি বলেছিলেন, অর্থবহ পাঁচ বছর বেঁচে থাকা অর্থহীন ৫০ বছর বেঁচে থাকার চেয়ে ভালো। উদাহরণ হিসেবে তিনি জিয়াউর রহমানের কথা বলেন, যিনি মাত্র কয়েক বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। মৃত্যুর পর প্রকাশিত বক্তব্যে হাদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি বিশাল মিছিলের কথা কল্পনা করেছিলেন। সেই মিছিলের সামনে থাকবেন তিনি, বুকে গুলি লাগবে এবং তিনি ‘হাসিমুখে’ মারা যাবেন—এমন কথাও বলেছিলেন।
নিজের নাম ব্যবহার করে অন্যরা কী করবে, তা অবশ্য হাদি আগে থেকে বুঝতে পারেননি। শ্যামলের যুক্তি ছিল, যারা হাদিকে উপাসনার বস্তুতে পরিণত করতে চান, তাদের কাছ থেকে তার ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে তার সমালোচনা শুরু হওয়াও জরুরি। যারা তাকে মুছে ফেলতে চান, তাদের ক্ষেত্রেও কথাটি সমানভাবে প্রযোজ্য।
তাই নূরের প্রশ্নের সৎ উত্তর কোনো একক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। হাদি ছিলেন প্রতিভাবান, আক্রমণাত্মক এবং কখনো কখনো বেপরোয়া বক্তা; তবে অনেক সময় তিনি ছিলেন চিন্তাশীলও। তিনি যে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক দক্ষতার ঘাটতি দেখতেন, তা পূরণে কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার ভাষা কখনো কখনো সেই জনতাকেও প্রশ্রয় দিয়েছে, যাদের বিরোধিতা করার কথা তিনি বলতেন।
নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য তিনি জীবন দিয়েছেন। তাকে কে হত্যা করেছে, কারা এর জন্য দায়ী থাকবে এবং তার নামে সংঘটিত সহিংসতার জন্য অন্যদের কী দায় রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।