দেড় যুগের বেশি যে কার্যালয় আগলে রেখেছেন, সেখানেই ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নিলেন
রুহুল কবির রিজভী আহমেদ © সংগৃহীত
নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়। দীর্ঘদিন ধরে এই ভবনের একটি কক্ষই ছিল তার রাজনৈতিক ঠিকানা। কখনো দপ্তর সম্পাদক, কখনো যুগ্ম মহাসচিব, আবার কখনো সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দলীয় কর্মসূচি ঘোষণা, সংবাদ সম্মেলন, বিবৃতি দেওয়া, নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক— সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। বিরোধী রাজনীতির কঠিন সময়ে পুলিশি অভিযান, গ্রেপ্তার, মামলা কিংবা অবরোধ— কোনোটিই তাকে এই কার্যালয় থেকে দূরে রাখতে পারেনি। পুলিশি নির্যাতন-হয়রানি, সরকারী দলের সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে দলীয় কোনো স্বাভাবিক কর্মসূচি যখন চালিয়ে যেতে পারছিল না; বিএনপি ঠিক তখনও নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে ওই কার্যালয় থেকেই রিজভী কর্মকান্ড চালিয়ে যান। এমনটি টানা ৭৮৭ দিন বাসা ও স্বজন ছেড়ে দলীয় কার্যালয়কেই নিজের ঠিকানায় পরিণত করেন তিনি।
২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একটানা অবস্থান ও রাত্রিযাপন করছিলেন তিনি। খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব ও রাজনৈতিক সংকটের সময় দলীয় কার্যক্রম সচল রাখতে তিনি কার্যালয়েই অবস্থান করেছিলেন। ২৫ মার্চ ২০২০ খালেদা জিয়া মুক্তি পাওয়ার পর তিনি বাসায় ফিরে যান।
সেই নয়াপল্টনেই এবার নতুন ভূমিকায় বসলেন রিজভী। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর আজ রবিবার (২৩ আগস্ট) দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন তিনি। সকালে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বেলা ১১টার দিকে নয়াপল্টনে নিজের দপ্তরে বসেন তিনি। নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পরও নয়াপল্টনের সঙ্গে তার সম্পর্কের কোনো ছেদ ঘটেনি।
রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বিএনপির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাংগঠনিক দায়িত্বে বসার এই ঘটনাকে তাই শুধু একটি পদায়ন হিসেবে দেখছেন না দলের নেতাকর্মীরা। তাদের কাছে এটি অনেকটা নয়াপল্টনের ‘দপ্তরকেন্দ্রিক রাজনীতির’এক কর্মীর দলটির শীর্ষ সাংগঠনিক দায়িত্বে উঠে আসার গল্প।
যে কার্যালয় ছিল তার রাজনৈতিক ঠিকানা
রিজভীর সঙ্গে নয়াপল্টনের সম্পর্ক নতুন নয়। বিএনপি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি যখন রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, তখন রিজভী ছিলেন এর সবচেয়ে পরিচিত মুখ। হরতাল-অবরোধ, মিছিল-সমাবেশ কিংবা পুলিশের অভিযান—প্রতিটি রাজনৈতিক সংকটেই কার্যালয়ে অবস্থান করে দলের কর্মসূচি ও বক্তব্য তুলে ধরেছেন তিনি। অনেক সময় বাইরে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও কার্যালয় থেকেই সংবাদ সম্মেলন করেছেন, বিবৃতি দিয়েছেন এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়েছেন।
২০১৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপির আন্দোলনের সময় প্রায় দুই মাস নয়াপল্টন কার্যালয়ে অবস্থান করেছিলেন রিজভী। পরে সেখান থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী বছরগুলোতেও কার্যালয়কেন্দ্রিক তার অবস্থান ছিল বিএনপির রাজনীতিতে আলোচিত বিষয়।
২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বর বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে ৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টন কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানের পরও গ্রেপ্তার হন তিনি। ফলে নয়াপল্টনের এই ভবনের সঙ্গে তার রাজনৈতিক জীবনের সম্পর্কের মধ্যে যেমন কর্মব্যস্ততা রয়েছে, তেমনি রয়েছে গ্রেপ্তার, মামলা ও প্রতিকূলতার স্মৃতিও।
এবার সেই চেয়ারেই
২০ আগস্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপির মহাসচিবের পদ শূন্য হয়। একই দিন দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করে বিএনপি। দলের গঠনতন্ত্রের ৭ (খ-৬) ধারা অনুযায়ী এই মনোনয়ন দেওয়া হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হয়।
এর মাত্র তিন দিনের মাথায় রবিবার নয়াপল্টনে নিজের পরিচিত দপ্তরে নতুন দায়িত্বে বসেন তিনি। ফলে রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি হয়ে উঠেছে প্রতীকীও। যে ভবনের একটি ছোট কক্ষ থেকে বছরের পর বছর তিনি দলের বক্তব্য দেশবাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, সেই ভবনেই এবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে তাকে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
দলের নেতাকর্মীদের অনেকে বলছেন, রিজভীর নতুন দায়িত্বের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি দলীয় কার্যালয় ও মাঠপর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সরাসরি যোগাযোগ ধরে রেখেছেন। বিএনপির অধিকাংশ শীর্ষ নেতা সরকার পরিচালনার দায়িত্বে যাওয়ার পর দলীয় কার্যালয় ও মাঠের রাজনীতিতে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, রিজভীর নয়াপল্টনে সক্রিয় উপস্থিতি সেই দূরত্ব কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
রাজপথের ত্যাগের রাজনীতি
রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্ররাজনীতিতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক ও পরে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৯ সালে রাকসু নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন। সে সময় এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন এবং আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে আহত হন।
১৯৯২ সালের ১৬ জুন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে ভোটের মাধ্যমে সংগঠনটির সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। এরপর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃত্ব এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তার উত্থান ঘটে। দলের দীর্ঘ বিরোধী রাজনৈতিক সময়ে মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবাস রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের অংশ হয়ে যায়। বিশেষ করে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে ঘিরে রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনার কারণে তিনি হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে দৃশ্যমান নেতাদের একজন।
দপ্তর থেকে স্থায়ী কমিটি
রিজভীর রাজনৈতিক উত্থান মূলত সাংগঠনিক ও দপ্তরকেন্দ্রিক কাজের মধ্য দিয়েই। সংসদ সদস্য না হয়েও দীর্ঘদিন তিনি বিএনপির জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এরপর প্রায় এক দশক ধরে দলীয় কর্মসূচি, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ও গণমাধ্যমে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব পালন করেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্বও পান। এরপর ১৫ আগস্ট তাকে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়। পাঁচ দিনের মাথায় আসে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব। অর্থাৎ কয়েক দিনের ব্যবধানে তার রাজনৈতিক অবস্থানে বড় পরিবর্তন এসেছে—সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব থেকে স্থায়ী কমিটির সদস্য, এরপর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।
আত্মসংশয় নাকি দায়িত্ববোধ?
নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর রিজভীর বক্তব্যেও ছিল এক ধরনের আত্মসংশয়ের সুর। এত বড় দায়িত্ব তিনি কতটা যথাযথভাবে পালন করতে পারবেন—তা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেছেন তিনি। বাইরে থেকে দেখলে এটি নিজের সক্ষমতা নিয়ে সংশয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন অন্য একটি ব্যাখ্যাও সামনে আনে। সেটি হলো—নিজেকে বড় করে দেখানোর পরিবর্তে দায়িত্বের গুরুত্বকে বড় করে দেখার মানসিকতা।
প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে রাজপথের আন্দোলন থেকে দলীয় কার্যালয়ের কঠিন সময়, ছাত্ররাজনীতি থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব—সব পর্যায়েই তার ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও রাজনৈতিক সহযাত্রী বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকতের মতে, রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি কঠিন পরীক্ষাই রিজভীর দৃঢ়তা, ত্যাগ ও দায়িত্ববোধকে আরও স্পষ্ট করেছে। ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তিনি নিজেকে একজন নিবেদিত রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
সামনে বড় পরীক্ষা
তবে নতুন দায়িত্বের সঙ্গে রিজভীর সামনে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষাও রয়েছে। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলকে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় রাখা, তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ বাড়ানো, দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং সরকার ও দলের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় রাখা—এসবই তার দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে বিএনপি এখন সরকারে। ফলে এতদিন যে নেতা বিরোধী দলের কর্মসূচি ও বক্তব্য নিয়ে প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়েছেন, তাকেই এখন সরকারের সঙ্গে দলের সম্পর্ক, দলীয় নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড এবং মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক বাস্তবতা সামলাতে হবে।
নতুন দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই নয়াপল্টনে ফিরে আসা তাই নিছক অফিসে বসার ঘটনা নয়। যে ভবনকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও আগলে রেখেছেন, সেই ভবন থেকেই এবার তাকে বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্ব দিতে হবে।
গুলি থেকে রাজপথ, রাজপথ থেকে রাকসুর ভিপি; ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে দপ্তর; দপ্তর থেকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব; আর সেই পথ পেরিয়ে স্থায়ী কমিটি ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের চেয়ার—রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক পথচলার প্রতিটি বাঁকেই নয়াপল্টনের ছায়া রয়েছে।
এবার সেই নয়াপল্টনই তার নতুন দায়িত্বের কর্মক্ষেত্র। পার্থক্য শুধু একটাই— এতদিন তিনি ছিলেন দলের দপ্তরের অন্যতম প্রধান কর্মী ও মুখপাত্র; এখন সেই একই কার্যালয়ে বসে তাকেই নিতে হবে বিএনপির সামগ্রিক সাংগঠনিক নেতৃত্বের ভার।