ইমাম মোজাফফর আহমদ © সংগৃহীত
ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের টেটেশ্বর গ্রামের এক কিশোরীকে ধর্ষণের মামলায় অভিযুক্ত হয়ে এক মাস দুই দিন কারাভোগের পর অবশেষে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন ইমাম মোজাফফর আহমদ (২৫)। ডিএনএ পরীক্ষায় কিশোরীর সন্তানের সঙ্গে তার কোনো মিল না পাওয়ায় আদালতে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে কারাভোগ, সামাজিক অপমান ও মানসিক চাপের কারণে বর্তমানে তিনি ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজা নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে বিষয়টি তুলে ধরেন।
স্ট্যাটাসে তিনি লিখেন, ‘ফেনীর মিথ্যা ধর্ষণ মামলার ভুক্তভোগী সেই ইমাম সাহেবের একটি জরুরি আপডেট জানাচ্ছি। আমরা আগেই জেনেছিলাম, জেলে থাকা অবস্থায় তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন এবং দেয়ালে মাথা ঠুকে আহত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যে ভয়াবহ সাইকোসিস বা মানসিক ভারসাম্যহীনতার শিকার হয়েছেন, তা আমাদের জানা ছিল না।’
তিনি আরও জানান, ওই রাতে থাকার জন্য মোজাফফর আহমদকে তার ছোট ভাই ইমনের বাসায় পাঠানো হয়েছিল। সেখানে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই তিনি হঠাৎ অত্যন্ত আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করেন। বাসার বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন এবং ইফতি ও ইমনের ওপর চড়াও হয়ে মারধর ও কামড়ে আহত করেন। এমনকি পাশের ফ্ল্যাটের মালিকের বাসায় ঢুকে তাকেও আঘাত করার চেষ্টা করেন।
তারেক রেজা বলেন, ‘ইমন বিষয়টি জানালে আমি দ্রুত সেখানে উপস্থিত হই। একপর্যায়ে তিনি আমাকেও আঘাত করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বাধ্য হয়ে আমরা তাকে বেঁধে ফেলি এবং ৯৯৯-এ কল করে পুলিশের সহায়তা চাই।’
আরও পড়ুন: ইমাম নয়, ডিএনএ পরীক্ষায় জানা গেল— কিশোরীকে ধর্ষণ করেছিলেন আপন বড় ভাই
পরে পুলিশের সহযোগিতায় তাকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ইনজেকশন দেওয়ার প্রায় ঘণ্টাখানেক পর তিনি ঘুমিয়ে পড়েন বলে জানান তারেক রেজা।
তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি তার অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে হাসপাতালেই আছি। তবে তার জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় এবং আমি তার লিগ্যাল গার্ডিয়ান না হওয়ায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভর্তি করানো যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে ইমাম সাহেবের বাড়িতে যোগাযোগ করেছি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার পরিবার এসে পৌঁছালে ইনশাআল্লাহ তাকে একটি ভালো হাসপাতালে ভর্তি করাবো।’
স্ট্যাটাসে তিনি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান চিকিৎসক ডা. সাঈদুল আশরাফুল কুশালকে। তার ভাষ্য, ‘রাত ৪টার সময় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে এবং তিনি ইমাম জুবায়েরকে সারাজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহ তাকে এর উত্তম প্রতিদান দেবেন।’
সবশেষে তিনি সবার কাছে ওই ইমামের জন্য দোয়া কামনা করেন।
এর আগে গত ১৭ এপ্রিল আদালতে মামলার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) জমা দেয় পুলিশ। প্রতিবেদনে নিরপরাধ মোজাফফর আহমদকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয় এবং আপন বোনকে দীর্ঘদিন যৌন নির্যাতনের অভিযোগে ভাই মোরশেদকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর স্থানীয় মক্তব শিক্ষক ও ইমাম মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে মামলা করে কিশোরীর পরিবার। ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হলে তিনি টানা ৩২ দিন কারাভোগ করেন। শুধু কারাভোগই নয়, সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি তিনি মসজিদের ইমামতি এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরিও হারান।
মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর পুলিশ আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সহায়তা নেয়। সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা যায়, মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তদন্তের একপর্যায়ে কিশোরী স্বীকার করেন, তার বড় ভাই মোরশেদ দীর্ঘদিন ধরে তাকে যৌন নির্যাতন করে আসছিলেন। পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য এবং মূল ঘটনা আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে নিরপরাধ শিক্ষক মোজাফফরকে মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল।
পুলিশ জানায়, ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে কিশোরীর সন্তানের সঙ্গে তার ভাই মোরশেদের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় শিশুটির সঙ্গে মোরশেদের ডিএনএর ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল পাওয়া যায়, যা বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করে যে মোরশেদই শিশুটির জৈবিক পিতা। পরে পুলিশ মোরশেদকে গ্রেপ্তার করে এবং বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।