পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি © টিডিসি সম্পাদিত
আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে, এমন ধরনা পাল্টে দিয়ে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। ফলে ওই নির্বাচন দেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বড় একটি বিস্ময় হিসেবেই অনেকের কাছে বিবেচিত।
নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসনে, আর আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৮৪টি আসন। এছাড়া জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসনে এবং জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে জয়লাভ করে। পরে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি এবং তিনি দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন।
এর মাধ্যমেই দেশে কার্যত দ্বি-দলীয় রাজনীতির সূচনা হয়, পাশাপাশি ওই সংসদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছিল। এছাড়া সব দলের সম্মতির ভিত্তিতে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হলে নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার যে ধারণা- তারও আনুষ্ঠানিক প্রয়োগ হয়েছিলো ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনেই।
তৎকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতার দলত্যাগের কারণে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা ছিল দুর্বল, সে তুলনায় আওয়ামী লীগ তখন সাংগঠনিকভাবে শক্তিধর ছিল। তারপরও আওয়ামী লীগকে ওই নির্বাচনে যেভাবে বিএনপি পরাজিত করেছিলো, তা দেশের রাজনীতির গতিধারাই পাল্টে দিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ওই ভাষণ ছাড়াও নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে আওয়ামী লীগের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং দলটির নেতাদের বক্তৃতা বিবৃতিতে নিজেদের বড়াই বা দম্ভের বহিঃপ্রকাশ বিএনপিকে সুবিধা করে দিয়েছিল। তবে তৎকালীন সময়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোটের নেত্রী খালেদা জিয়ার স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে 'আপসহীনতার ভাবমূর্তি'ই ওই নির্বাচনে দলটির বিস্ময়কর সাফল্যের অন্যতম কারণ।
বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে এটা বিশ্বাস করা অনেকটা কঠিন ছিল যে আওয়ামী লীগ হারিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারবে। মূলত এর আগে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের নয় বছরে দলটির অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা দল ছেড়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় সাংগঠনিক অবস্থা ছিল খুবই নড়বড়ে।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, তখন তার কাছে মনে হয়েছিলো–– বিএনপি নেতারা বরং বিশ্বাস করছিলেন যে তারা শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলেই বসতে যাচ্ছেন। তার কথায়, "আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে অনেক বিস্তৃত ছিল। আর জেনারেল এরশাদ তার নয় বছরে বারবার বিএনপি ভাঙার চেষ্টা করেছেন। অনেক নেতাকে ভাগিয়ে নিয়েছিলেন। ফলে বিএনপি আসলে অনেক জায়গায় প্রার্থীও ঠিকমতো দিতে পারেনি সেই নির্বাচনে। এসব কারণেই সবার মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে আওয়ামী লীগই জিতবে।"
আরও পড়ুন : এখন পর্যন্ত মন্ত্রী হওয়ার আশ্বাস পেলেন যারা
ওই নির্বাচনে বিএনপির হয়ে ১৪০টি নির্বাচনী আসনের মনিটরিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন দলটির এখনকার স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি ওই নির্বাচনের পরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে হওয়া মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জয় তারা কোনোভাবে আঁচ করতে পেরেছিলেন কি-না কিংবা নির্বাচনের ফল দলের জন্য আসলেই বিস্ময় ছিল কি-না -এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা নির্বাচনের সপ্তাহ খানেক আগে থেকে 'ভালো বাতাস' পাচ্ছিলেন।
তার কথায়, "অনেকের কাছে বিস্ময়কর ফল মনে হলেও আমরা যারা আসনভিত্তিক কাজ করছিলাম তারা কিছুটা উপলব্ধি করছিলাম যে পরিস্থিতি অনুকূল হচ্ছে। রেডিও টিভিতে দুই নেত্রীর ভাষণের পর ঢাকায় মূলত আওয়ামী লীগ উড়ে গিয়েছিল।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনেকে বলে থাকেন যে, সেবার নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ও আট দলীয় জোট নেত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা বেশ সমালোচিত হয়েছিলো। বরং সেই তুলনায় বিএনপি ও সাত দলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়ার ভাষণ প্রশংসিত হচ্ছিলো।
তখন রাজনৈতিক নেতা, নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকসহ সবার ধারণা ছিল শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগই জিতবে। সিনিয়র সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "মনে হচ্ছিলো আওয়ামী লীগই জিতবে। আসলে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মনোভাব তখন কেউ সেভাবে আঁচ করতে পারেনি। পরে অনেক বিশ্লেষণেই বিএনপির জয়ের কারণগুলো উঠে এসেছে।"
বিএনপির জয়ের ফ্যাক্টরগুলো যা ছিল
বিশ্লেষক ও রাজনীতিক সবাই মানছেন যে, পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনই ছিল দেশের প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন যা একটি দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনের সময় তখন ইত্তেফাকের একটি সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল, "এবারের নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য এই যে -এই প্রথম এদেশে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইতেছে এবং আশা করা চলে যে, ভোটাররা নির্ভয়ে-নিরুপদ্রবে নিজ ইচ্ছামত প্রার্থী বাছাইয়ে তাহাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করিবেন"।
আর নির্বাচনের পর ২ মার্চ দৈনিক সংবাদের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিলো, "নির্দলীয় ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বহু আকাঙ্ক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এ যাবত তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশে এ ধরনের অভূতপূর্ব শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি"।
নির্বাচনে বিএনপির হয়ে ১৪০টি নির্বাচনী আসনের মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আসলে ঠিকমতো সুযোগ পেলে মানুষ নিজের অজান্তেও সঠিক রায় দেয় এবং ১৯৯১ সালে ঠিক তা-ই ঘটেছিলো বলে তারা মনে করেন। এখানে বড় ফ্যাক্টর ছিল এরশাদবিরোধী আন্দোলন খালেদা জিয়ার আপসহীন ভূমিকায় তৈরি হওয়া জনপ্রিয়তা আর শেখ হাসিনার দাম্ভিকতাপূর্ণ বক্তব্য।
তিনি জানান, নির্বাচনের চার দিন আগে ঘরোয়া এক বৈঠকে তারা জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে অনানুষ্ঠানিক কথা বলেছিলেন খালেদা জিয়ার সাথে, তিনি সবাইকে আরও পরিশ্রম করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের কথা শুনে তখন মনে হতো যে তারা ক্ষমতায় এসে পড়েছে। এটি মানুষ ভালোভাবে নেয়নি
এছাড়া বিশ্লেষকদের মতে, সেবার নির্বাচনী প্রচারণায় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তৃতার ভাষা নিয়ে বেশ সমালোচনা হচ্ছিলো। এর বিপরীতে খালেদা জিয়া মূলত ভারতবিরোধী বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছিলেন। গয়েশ্বর রায় দাবি করছেন, শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার পর ঢাকার আসনগুলোতে আওয়ামী লীগের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে পড়েছিলো।
এছাড়া সেসময়ে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এমন কেউ কেউ মনে করেন, ড. কামাল হোসেন ও মোস্তফা মহসিন মন্টুসহ কিছু দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে আওয়ামী লীগেরই একটি প্রভাবশালী অংশ অবস্থান নেওয়ার প্রভাবও পড়েছিলো পুরো নির্বাচনী ফলাফলে।
শেখ হাসিনার ভাষণে যা ছিল
১৯৯১ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় জনসভা করে শেষ নির্বাচনী দেওয়ার পাশাপাশি রেডিও টেলিভিশনেও ভাষণ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। দুই নেত্রীর দুটি করে ভাষণই পরদিন সংবাদপত্রে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। শেখ হাসিনা তার ৫০ মিনিটের ভাষণের অধিকাংশ সময়জুড়েই দুই সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলের কঠোর সমালোচনা করেন।
ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, "জেনারেল জিয়া রেডিও টিভি ভাষণে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে সেনা ছাউনিতে ফিরে যাওয়ার ওয়াদা ভঙ্গ করে প্রথমে জাগদল, এরপর ফ্রন্ট, অতপর ১৯ দফা বাস্তবায়ন কমিটি এবং সবশেষে বিএনপি গঠন করেন। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে জনদল, ফ্রন্ট, ১৮ দফা বাস্তবায়ন কমিটি ও জাতীয় পার্টি গঠন করেন"। ওই ভাষণে তিনি স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে পরবর্তী জিয়াউর রহমান ও এরশাদের শাসনামলের তুলনামূলক চিত্র বর্ণনা করে ওই দুই শাসনামলের তীব্র সমালোচনা করেন।
মূলত প্রতিপক্ষকে তীব্রভাবে আক্রমণ আর স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের ভুলত্রুটি এড়িয়ে যাওয়া ছাড়াও শেখ হাসিনার বলার ভঙ্গি নিয়ে তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা শুরু হয়। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার ভাষণে স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার এবং জেনারেল এরশাদের নয় বছরের শাসনামলের তুমুল সমালোচনার পাশাপাশি তিনি বা তার দল সরকার গঠন করলে কী কী করবেন তার কিছু সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করেছিলেন।
খালেদা জিয়া তার ভাষণের একাংশে আওয়ামী লীগ সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন, "সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলো মানুষ ভুলতে পারে না। এই অত্যাচার, অবিচার, অপশাসনের পটভূমিতেই জাতীয়তাবাদী দলের উত্থান"।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, শেখ হাসিনার চেয়ে খালেদা জিয়ার ভাষণের টোন বা কথা বলার ভঙ্গীতে ভোটের একটি আকুতি প্রকাশ পেয়েছিল, যা তখন অনেক ভোটারকে প্রভাবিত করতে পেরেছিল বলে তারা মনে করেন।
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, "মূলত খালেদা জিয়ার ক্যারিশমা আর শেখ হাসিনার দুর্বিনীত উক্তির কারণেই বিশাল সংখ্যা সুইং ভোটারদের ভোট বিএনপি পেয়েছে, যা আওয়ামী লীগের পরাজয় নিশ্চিত করেছে। আর ওই নির্বাচনের মাধ্যমেই বাংলাদেশে দ্বিদলীয় রাজনীতির সূচনা হয়েছিল, যা আগে ছিল না"।
৩৫ বছর পরে এবার ভিন্ন পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। মূলত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দেশের রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। পরবর্তীতে জুলাই আগস্টে সংঘটিত অপরাধের সুষ্ঠু বিচার করতে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে নির্বাচন থেকেও ছিটকে পড়ে আওয়ামী লীগ। এই অবস্থায় বিএনপির জয় ও আগামীতে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস দলটির নেতাকর্মীদের। তবে জামায়াতে ইসলামীর আশাও ভিন্ন নয়। জামায়াত নেতাকর্মীদের দাবি, ১৯৯১ এর স্মৃতি ফিরতে পারে ২০২৬ এর নির্বাচনে। তবে সব জল্পনা কল্পনার চূড়ান্ত ফলাফল পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েকটা দিন।