শেরপুর-১ (সদর) সংসদীয় আসনের প্রার্থী ড. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা, মো. শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও হাফেজ রাশেদুল ইসলাম (বা থেকে) © টিডিসি ফটো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উত্তাপ ছড়াচ্ছে শেরপুর-১ (সদর) সংসদীয় আসনের ভোটের সমীকরণে। প্রকাশ্য প্রচারণার বাইরে এখানে তৈরি হয়েছে এক জটিল ও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক সমীকরণ। বিএনপির দলীয় প্রার্থী ও বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থীর মুখোমুখি অবস্থানে ভোট বিভাজনের স্পষ্ট আভাস মিলছে।
এদিকে বিভাজনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে নীরবে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে তৎপর হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ফলে ভোটের মাঠে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—শেষ পর্যন্ত কী হবে শেরপুর-১ আসনে?
এ আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও বিএনপির সর্বকনিষ্ঠ প্রার্থী ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা। নিয়মিত গণসংযোগ, নারী ভোটারদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ এবং দলীয় সাংগঠনিক শক্তিকে ভর করে তিনি এগিয়ে যেতে চাইছেন।
তার বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মোটরসাইকেল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তাঁকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হলেও মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে তার প্রভাব এখনো উপেক্ষণীয় নয়।
স্থানীয় বিএনপি ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, শুরু থেকেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন ঘিরে ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা ও শফিকুল ইসলাম মাসুদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল। শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন পান প্রিয়াঙ্কা।
কিন্তু শফিকুল স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামায় জেলা বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠে। এ বিভক্তিই এখন শেরপুর-১ আসনের নির্বাচনী রাজনীতির সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হয়ে উঠেছে।
সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় রয়েছেন তার বাবা ও শেরপুর সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ্ব মো. হযরত আলী। জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হযরত আলীর দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও প্রভাব সানসিলার জন্য বাড়তি শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দলীয় নেতাদের মতে, নারী প্রার্থী হওয়ায় নারী ভোটারদের একটি বড় অংশ তার দিকে ঝুঁকতে পারে, যা নির্বাচনী ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা বলেন, বিএনপির ভোটাররা ধানের শীষেই ভোট দেবেন। ভোটাররা এখন অনেক সচেতন। বিশেষ করে নারীদের বড় অংশ আমার পক্ষে থাকবে বলে আমি আশাবাদী।
অন্যদিকে শফিকুল ইসলাম মাসুদ বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন। তিনি জেলা যুবদল ও ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও তিনি প্রার্থী ছিলেন। ফলে মাঠপর্যায়ে তার নিজস্ব একটি অনুসারী ভোটভিত্তি রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। বিএনপির একটি অংশ ছাড়াও স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ ভোটারদের কাছ থেকেও তিনি সাড়া পাচ্ছেন বলে তার সমর্থকদের দাবি।
বিশেষ করে শেরপুর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইলিয়াছ উদ্দিন এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বাইসাইকেল প্রতীক নিয়ে মাঠে থাকলেও সম্প্রতি মোটরসাইকেল প্রতীকের পক্ষে সমর্থন দেওয়ায় শফিকুলের অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে। রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও আওয়ামী লীগের ভোটের একটি অংশ তার দিকে যেতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।
শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, দীর্ঘদিন রাজনীতি করায় বিএনপির একাংশের নেতাকর্মী ও ভোটাররা আমার পাশে আছেন। দল আমাকে নিরাশ করলেও এই আসনের ভোটাররা নিরাশ করবেন না, ইনশা আল্লাহ।
এদিকে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিভাজন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীর জন্য তৈরি করেছে কৌশলগত সুযোগ। জামায়াতের প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলাম প্রকাশ্যে উত্তেজনা না বাড়িয়ে নীরবে সংগঠিতভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছেন। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের মজলিশে শুরা সদস্য এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি। স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে, ভোটের মাঠে ‘নীরব বিপ্লব’ ঘটানোর লক্ষ্যেই এগোচ্ছে দলটি।
জামায়াত নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চারদলীয় জোটের শরিক হিসেবে শেরপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী থাকায় এখানে দলটির একটি সংগঠিত ভোটব্যাংক রয়েছে। এবারের নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে ১১-দলীয় জোটের সমর্থন থাকায় তারা আশাবাদী।
হাফেজ রাশেদুল ইসলাম বলেন, এ আসনে জামায়াতের একটি শক্ত ভোটভিত্তি রয়েছে। সাধারণ ভোটাররা পরিবর্তন চান। বিএনপির ভোটে বিভক্তি আছে, আর আমাদের সঙ্গে ১১-দলীয় জোটের সমর্থন রয়েছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দাঁড়িপাল্লার বিজয় সম্ভব।
এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মো. মইনুল ইসলাম এবং জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী মাহমুদুল হক মনি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও মূল লড়াই ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপির বিভক্ত শক্তি ও জামায়াতের সংগঠিত কৌশলকে ঘিরেই। জাতীয় পার্টির প্রার্থী বর্তমানে কারাগারে থাকলেও প্রতীকের প্রতি সমর্থন রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
শেরপুর সদর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৫০ হাজার ৪৮৮ জন। এই বিপুল ভোটারের রায় শেষ পর্যন্ত কোন পথে যাবে—দলীয় দ্বন্দ্বে বিভক্ত বিএনপি, না কি নীরবে সংগঠিত জামায়াতে ইসলামী—সেই উত্তরই দেবে ভোটের দিন।