নির্বাচন কমিশন (ইসি) © সংগৃহীত
বিচার, প্রশাসন ও পুলিশে বড় রদবদল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সোমবার (২৫ আগস্ট) এই রদবদলের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। রাজনৈতিক মহল বলছে, এ পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বাজতে শুরু করেছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির সুর।
সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নির্বাচনমুখর পরিবেশ তৈরি হতে শুরু করেছে।
এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতিমধ্যে জাতীয় ভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ডিসেম্বর মাসে ঘোষণা করা হবে নির্বাচনের তফসিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্রসংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি আরও গতি পাবে। বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও পুলিশে এই রদবদল সেই প্রস্তুতিরই অংশ।
একই দিন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘বর্তমানে দেশ যথেষ্ট স্থিতিশীল এবং নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত।’ তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।’
প্রধান উপদেষ্টার কথাতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে, অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন আয়োজনের সব ধরনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। ইতিমধ্যে নির্বাচনকালীন প্রশাসন সাজানোর জন্য নিয়েছে নানা উদ্যোগ। এরই অংশ হিসেবে দেশের ছয় জেলায় নতুন ৬ ডিসি, জেলা জজসহ ২৩০ বিচারক, ৭ জেলায় নতুন পুলিশ সুপার ছাড়াও এডিশনাল আইজিপিসহ ৫২ বদলি হয়েছে। প্রশাসন, বিচার ও পুলিশে এই রদবদলে যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নির্বাচনী প্রস্তুতির সুর।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, মোটাদাগে নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে আছে—ছবিসহ একটি স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরি, সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ, ভোটকেন্দ্র স্থাপন, ভোটের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও দেশি পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন দেওয়ার মতো কাজগুলো। এর মধ্যে বেশ কিছু প্রস্তুতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই শেষ করতে হয়। আর কিছু প্রস্তুতি নিতে হয় তফসিল ঘোষণার পর। ইতিমধ্যে ইসি এগিয়ে নিয়েছে বেশকিছু প্রস্তুতিকালীন কাজ।
সাধারণত রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয় ভোটের তফসিলের সময়। জেলা প্রশাসকদের রিটার্নিং কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়। আর প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের। এটি চূড়ান্ত করা হয় তফসিল ঘোষণার পর। এরপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তাদের।
ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজটি করে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনী। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা থাকেন স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে। তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করে নির্দেশনা দিয়ে থাকে ইসি। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এরই অংশ হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে রদবদল করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার আগেই জানিয়েছিল, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে রদবদল করা হবে। এছাড়া দায়িত্ব পালনের জন্য দেড় লাখ পুলিশ সদস্যকে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত তিন মাস প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। এ ছাড়াও নির্বাচনের আগে প্রশাসনের রদবদল হবে। সব জায়গায় রদবদল হবে এমন সিদ্ধান্ত হয়নি। যেখানে যেখানে প্রয়োজন সেখানে রদবদল করা হবে।
প্রশাসনে বড় রদবলের ইঙ্গিত
নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। জাতীয় নির্বাচনে জেলা প্রশাসক রিটার্নিং কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সহকারী রিটার্নিং কাজ করেন। যার ফলে ক্ষেত্রবিশেষ প্রশাসনে রদবদলের প্রয়োজন পড়ে। নতুন ডিসি নিয়োগ যেন প্রশাসনে বড় রদবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পটুয়াখালী, কুষ্টিয়া, কুড়িগ্রাম, মেহেরপুর, নেত্রকোণা ও খুলনা জেলায় ডিসি নিয়োগ দিয়েছে সরকার। সোমবার (২৫ আগস্ট) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীকে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক এবং পটুয়াখালীর ডিসি আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীনকে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক করা হয়েছে।
মেহেরপুরের ডিসি সিফাত মেহনাজকে কুড়িগ্রামের, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালামকে মেহেরপুরের, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার (উপসচিব) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামানকে নেত্রকোণার এবং কুষ্টিয়ার ডিসি মো. তৌফিকুর রহমানকে খুলনার জেলা প্রশাসক করা হয়েছে।
পুলিশে বড় রদবদল
সাত জেলায় নতুন পুলিশ সুপার (এসপি) নিয়োগ দিয়েছে সরকার। সোমবার (২৫ আগস্ট) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বরগুনা, বাগেরহাট, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মেহেরপুর, নড়াইল ও নাটোরে নতুন পুলিশ সুপার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আল মামুন শিকদারকে বরগুনার পুলিশ সুপার, পিবিআইয়ের (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামানকে বাগেরহাট, পুলিশ অধিদপ্তরের মো. মেনহাজুল আলমকে নরসিংদীর পুলিশ সুপার, ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনকে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার, ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ মনজুর আহমেদ সিদ্দিকীকে মেহেরপুরের পুলিশ সুপার, এসবির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলামকে নড়াইলের পুলিশ সুপার, হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামকে নাটোরের পুলিশ সুপার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে পুলিশে বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। অতিরিক্ত আইজিপি, ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি ও এসপি পদে ৫২ জন কর্মকর্তাকে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে।
বিচার বিভাগে বড় রদবদল
বিচার বিভাগে বড় ধরনের রদবদল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন করে মোট ২৩০ বিচারককে বদলি করা হয়েছে। সোমবার (২৫ আগস্ট) আইন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত ৪টি পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ৪০ জেলা জজ, ৫৩ অতিরিক্ত জেলা জজ, ৪০ যুগ্ম জেলা জজ ও ৯৬ সিনিয়র সহকারী ও সহকারী জজকে বদলি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে নিম্ন আদালতের এই বিচারকদের বদলি করা হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের ৩ জুন বিচার বিভাগে আরেক দফা রদবদল করা হয়, যেখানে মোট ২৬৫ জন নিম্ন আদালতের বিচারককে বদলি ও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বরও সরকার নিম্ন আদালতের ২৪৪ বিচারককে বদলি ও পদোন্নতি দিয়েছিল।