জাকাতের হিসাব যে নিয়মে করবেন
- টিডিসি রিপোর্ট
- প্রকাশ: ২১ মার্চ ২০২৫, ০১:০১ PM , আপডেট: ২১ মার্চ ২০২৫, ০১:০৬ PM

ইমান, নামাজ, রোজা, হজ যেমন শিখে আমল করতে হয়, তেমনি জাকাতও জেনেবুঝে, হিসাব করে আদায় করতে হয়। হিসাব-নিকাশ ছাড়া অনুমানের ওপর ভিত্তি করে জাকাত প্রদান করলে তা পরিপূর্ণরূপে আদায় হবে না।
যে সম্পদে জাকাত আসে, সে সম্পদের ৪০ ভাগের ১ ভাগ জাকাত আদায় করা ফরজ। মূল্যের আকারে নগদ টাকা দ্বারা বা তা দ্বারা কোনো আসবাব ক্রয় করে তা দ্বারাও জাকাত দেওয়া যায়। জাকাতের ক্ষেত্রে চান্দ্র মাসের হিসাবে বছর ধরা হবে। যখনই কেউ নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে, তখন থেকেই জাকাতের বছর শুরু ধরতে হবে।
হাদিস শরিফে আছে, ‘তোমার হিসাব নেওয়ার আগে নিজের হিসাব নিজে করে রাখো।’ (বুখারি ও মুসলিম)। কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তাআলা বলবেন: ‘তোমার হিসাব-কিতাব পাঠ করো; আজ তোমার হিসাবের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।’ (আল কোরআন, সুরা-১৭ [৫০] আল ইসরা-বনি ইসরাইল (মাক্কি), রুকু: ২/২, আয়াত: ১৪, মঞ্জিল: ৪, পারা: ১৫ সুবহানাল্লাজি, পৃষ্ঠা ২৮৪/২)।
কিসের ওপর জাকাত দিতে হয়
সোনা ৭.৫ ভরি বা তদূর্ধ্ব, রুপা ৫২.৫ ভরি বা তদূর্ধ্ব অথবা এর সমমূল্যের নগদ টাকা, (বিনিময়যোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা, ট্রাভেলার্স চেক, ব্যাংক চেক, ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার, পোস্টাল অর্ডার, মানি অর্ডার, শেয়ার সার্টিফিকেট, কোম্পানির শেয়ার, ডিও লেটার, সঞ্চয়পত্র, সিকিউরিটি মানি, জামানত, প্রাইজ বন্ড, ট্রেজারি বন্ড ইত্যাদি।
ব্যাংকে বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা আমানত─ যেমন বিমা, এফডিআর, ফিক্সড ডিপোজিট, পোস্টাল সেভিংস, বিশেষ সঞ্চয়, পেনশন স্কিম ও স্বেচ্ছা প্রভিডেন্ট ফান্ড, ডিভিডেন্ড এবং ফেরত পাওয়ার যোগ্য প্রদত্ত ঋণ, যেসব ইচ্ছা করলে তুলে আনা যায়) এবং ব্যবসাপণ্য ও শোপিস বা মূলবান পাথর (হীরা-জহরত, মণি-মাণিক্য, মুক্তা ইত্যাদি)।
এসবের বর্তমান বাজারমূল্য, অর্থাৎ বর্তমানে নতুন কিনতে যে মূল্য। শেয়ার সার্টিফিকেটের নামিক মূল্য (Face Velue) ও বাজারদরের (Market Velue) মধ্যে যেটি বেশি, সেটি হিসাব করতে হবে।
ব্যবসায়িক নার্সারি, হর্টিকালচার, বীজ উৎপাদন খামার, কৃষিখামার, বনজ বৃক্ষ খামার, ফলদ বৃক্ষ খামার, ঔষধি গাছের খামার, চা-বাগান, রাবারবাগান, তুলাবাগান, রেশমবাগান, আগরগাছের বাগান, অর্কিড নার্সারি ও ফুলবাগান, মুরগির খামার, মাছের খামার ইত্যাদি এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সামগ্রী। এসবের বর্তমান বাজারমূল্য, অর্থাৎ বর্তমানে ক্রয়মূল্য ধরতে হবে।
যেসব ক্ষেত্রে জাকাত দিতে হয় না
বাড়ি, গাড়ি, জায়গাজমি ও স্থাবর সম্পদ, যা বিক্রির জন্য রাখা হয়নি, তা জাকাত হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে না। তবে গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট ও জমি─ যেগুলো বিক্রির জন্য বা ব্যবসার জন্য রাখা হয়েছে, সেগুলোর বর্তমান বিক্রয়মূল্য (বাজারদর) জাকাতের হিসাবে আসবে।
যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জাকাত প্রদানের নিয়ম হলো, কোম্পানি বা মালিকদের সম্পদ আলাদা আলাদা হিসাব করে দেওয়া হবে এবং এ সম্পদে যদি মালিক নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন বা তার অন্য সম্পদসহ যদি নিসাব পরিমাণ হয়, তবে জাকাত দিতে হবে, অন্যথায় নয়। (জাকাত নির্দেশিকা, পৃষ্ঠা ১৫)
যৌথ মালিকানার ক্ষেত্রে কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান সম্মিলিত সম্পদ থেকে জাকাত প্রদান করলে সে সম্পদের জাকাত পুনরায় দিতে হবে না।
জাকাত আদায়ের সময়সীমা
জাকাত প্রতিবছর একবারই দিতে হয়। সাহাবায়ে কিরাম সাধারণত রমজান মাসেই জাকাত আদায় করতেন। তাই রমজান মাসে আদায় করা উত্তম। রমজানের যেকোনো একটি দিনকে সমাপনী দিন ধরে উপরিউক্ত জাকাতযোগ্য খাতগুলোর সব সম্পদের হিসাব করে জাকাত নির্ধারণ করতে হবে। জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য অন্তত নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক চান্দ্র বছর (৩৫৪ দিন) থাকতে হবে, একে আরবিতে হাওলানে হাওল, অর্থাৎ বছর পূর্ণ হওয়া বা বছর অতিক্রান্ত হওয়া বলে। সম্পূর্ণ সম্পদের বছর অতিক্রান্ত হওয়া শর্ত নয়। জাকাত বর্ষপূর্তি বা জাকাত হিসাব সমাপনী দিনে ওই তিন খাতে যত সম্পদ থাকবে, পুরোটারই জাকাত দিতে হবে।
প্রতিবছর একই তারিখে ও একই সময় হিসাব করতে হবে। যেমন ১ রমজান সন্ধ্যা ৬টা। এই সময়ের এক সেকেন্ড আগে যে সম্পদ আসবে, তা জাকাত হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে। এই সময়ের এক সেকেন্ড পর যে সম্পদ আসবে, তা পরবর্তী বছরের হিসাবে যাবে।
জাকাতের পরিমাণ
জাকাতযোগ্য সম্পদের ‘রুবউ উশর’, অর্থাৎ ২.৫ শতাংশ (শতকরা আড়াই ভাগ, ৪০ ভাগের ১ ভাগ) জাকাত দিতে হবে। জাকাত চান্দ্রবর্ষের হিসাব অনুযায়ী আদায় করতে হয়। চান্দ্রবর্ষ ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনে হয়, যেহেতু সৌরবর্ষ ৩৬৫ দিনে বা ৩৬৬ দিনে হয়, তাই সৌরবর্ষ অপেক্ষা চান্দ্রবর্ষ ১১ বা ১২ দিন কম। সৌরবর্ষ হিসাবে জাকাত আদায় করতে চাইলে শতকরা ২.৫ শতাংশের (আড়াই ভাগ) পরিবর্তে (২.৫ ভাগ ৩৫৪ x ৩৬৫) ২.৫৭৮ শতাংশ (বা ২.৫৮ শতাংশ প্রায়) দিতে হবে। অথবা মূল জাকাতের সঙ্গে অতিরিক্ত ১১ দিনের হিসাব যোগ করতে হবে, যথা ২.৫ ভাগ ৩৫৪ x ১১)। (জাকাত নির্দেশিকা, পৃষ্ঠা ১৬)
জাকাতের পরিমাণ হলো প্রতি ৪০ টাকায় ১ টাকা বা ৪০ ভাগের ১ ভাগ। ১০০ টাকায় আড়াই টাকা বা শতকরা আড়াই শতাংশ। এক হাজার টাকায় পঁচিশ টাকা। এক লাখ টাকায় আড়াই হাজার টাকা। এক কোটি টাকায় আড়াই লাখ টাকা। এক শ কোটি টাকায় আড়াই কোটি টাকা। এক হাজার কোটি টাকায় পঁচিশ কোটি টাকা। এক মিলিয়নে পঁচিশ হাজার, এক বিলিয়নে পঁচিশ কোটি; এক ট্রিলিয়নে আড়াই হাজার বা পঁচিশ শত কোটি)।
অনেক ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা রয়েছেন, যারা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করে থাকেন। হিসাব করলে দেখা যায়, তাদের সম্পদ অপেক্ষা ঋণের পরিমাণ বেশি। এ অবস্থায় তাদের জাকাত দিতে হবে কি না?
উত্তর হলো─ হ্যাঁ, তাদের ওই তিন খাতের সমুদয় সম্পদেরই জাকাত দিতে হবে। কারণ, এ ধরনের ঋণ বাদ দিলে তারা বরং জাকাত খাওয়ার উপযুক্ত বলে গণ্য হবেন, যা প্রকৃতপক্ষে সঠিক নয়।