গত ২ জুন আনুমানিক বিকাল সাড়ে ৪টা। দুপুরের আভাটা কাটিয়ে বিকেল হয়েছে। দূর থেকে ভেসে আসছে একটা কণ্ঠ, সুর তাল ঠিক থাকলেও কথার শব্দগুলো একটির অপরটির সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। গলা ছেড়ে গাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা; কিন্তু তাও থেমে নেই।
ঘটনাটা তাহলে শুরু বলি
ঢাকার অন্যতম বাণিজ্যিক আবাসন উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টর। যেখানে সব সময় মানুষের হইচই, গাড়ির হর্ন, রিক্সার কলিংবেল শোনা যেত, এখন সেটি আর দেখা যায় না। রাস্তায় কেউ নেই, দু-একটা রিক্সার কলিং বেলের টুং টাং শব্দ মনে করিয়ে দিচ্ছে রাস্তা থেকে সরে গিয়ে ফুটপাত দিয়ে হাটতে হবে।
হাটতে হাটতে হঠাৎ করেই কানে একটা গান ভেসে আসলো, তাকিয়ে দেখি দূরে কি যেনো একটা ঝাপসার মত দেখা যাচ্ছে। সেখানে মানুষের ছোটখাটো একটা জটলাও আছে। সেই সাথে ভেসে আসছে সুন্দর একটি গান, ‘‘আব তো হোশ না খাবার সে, ইয়ে কেছা আছার হে তুমছে মিলনে কে বাত দিলবার’’। তাই অপেক্ষা না করেই দেখতে চলে গেলাম।
রাস্তায় বসে গাইতে থাকা মাঝ বয়সী এক নারীকে ঘিরে রিক্সাচালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের ভিড়। সকলকে মাতিয়ে রেখেছেন তার গান দিয়ে। কেউ ভিডিও করছেন, কেউ বা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। কৌতূহলবশত বেশ কিছুক্ষণ পর কিছুটা ভিড় কমলে জানার চেষ্টা করি তার নাম। মমতাজ বেগম। পেশায় একজন গার্মেন্টসকর্মী। বয়স ৪৫ এর ঊর্ধ্বে। বর্তমান থাকেন উত্তরার ৮ নাম্বার সেক্টরে অফিসার্স কোয়ার্টারের পাশে।
বাসায় চাল ফুরিয়ে গিয়েছে তাই খাবারের সন্ধানে গানটাকে উপার্জনের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। মমতাজ জানান, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ভালোই দিন কাটছিলো। বড় ছেলের বিয়ের পর তার স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা গাজীপুরে বাস করছেন। এখন ছোট ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে বেশ বিপদে আছেন।
গত ২৪ মার্চ সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার, কিন্তু পেট তো আর লকডাউন মানে না। তাই দায়বদ্ধতার জন্য করনাকে উপেক্ষা করেই ঘর থেকে বের হয়েছেন উপার্জনের আশায়। তিনি আরও জানান, শখের বশে থেকে গানটাকে তিনি রপ্ত করেছিলেন কিন্তু পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কারণে গানকে ছেড়ে দিয়েছিলেন কিন্তু সেই গানই আজ তার জীবিকার খোড়াক হিসেবে বেছে নিয়েছেন। স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা প্রায়ই তার গান শুনতে বিকেলে চলে আসেন।
করোনার সময় ভিড় নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বেঁচে থাকতে হলে খাদ্যের প্রয়োজন আর খাদ্য আসবে টাকা থেকে আর এই টাকা হলো তার উপার্জিত টাকা। কষ্ট করবেন কিন্তু কারও কাছে ভিক্ষা চাওয়াটা তার কাছে বেশ অসম্মানজনক বলে মনে করেন তিনি।
রাস্তার বিপরীত পাশে কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের করোনা ইউনিট৷ যেখানে করোনার সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা ডাক্তার-নার্স আর সেবাকর্মীরা। সেখানে দিনের পর দিন স্বজন হারার কান্না ভেসে আসছে ঠিক তেমনি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ গাইছে, ‘‘তুমি পাশে থাকিবে বন্ধু, তুমি থাকবে জীবন মরনে’’। তার গান শুনে একটি কথাই মনে হচ্ছিল— সে যেন বাংলাদেশের রানু মণ্ডল।