মোহাম্মদ সামসুল ইসলাম © টিডিসি সম্পাদিত
কোনো জাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস বুঝতে হলে তার শিক্ষাব্যবস্থাটা বোঝা জরুরি । ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনামলের শিক্ষা ব্যবস্থা সেই সত্যেরই এক জীবন্ত উদাহরণ। প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতে (১২০৬–১৮৫৭) মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থা একদিকে যেমন ধর্মীয় চেতনা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিকশিত হয়েছিল, অন্যদিকে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল না মেলাতে পেরে শেষ পর্যন্ত সংকটে পড়েছিল। এই ইতিহাস আমাদের জন্য কেবল অতীতচর্চা নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতির জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তা।
তৎকালীন শিক্ষা ছিল ধর্মীয় দায়িত্ব ও রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। ইসলামে জ্ঞান অর্জনকে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সেই ধর্মীয় দর্শনেরই বাস্তব রূপ আমরা দেখি মুসলিম শাসনামলের শিক্ষা ব্যবস্থায়। দিল্লি সালতানাত থেকে শুরু করে মুঘল আমল পর্যন্ত মুসলিম শাসকেরা শিক্ষাকে অবহেলা করেননি। কেন্দ্রীয় কোনো শিক্ষা মন্ত্রণালয় না থাকলেও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মসজিদভিত্তিক মক্তব ও উচ্চতর শিক্ষার জন্য মাদরাসা গড়ে ওঠে।
গ্রামভিত্তিক মক্তবগুলো সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করেছিল। কোরআন শিক্ষা, আরবি ভাষা, পড়া-লেখা ও ধর্মীয় আচার শেখানোর মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান সমাজকে একটি নৈতিক কাঠামো দিয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—সে সময় ছেলে ও মেয়েরা একই সঙ্গে শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে, যা মধ্যযুগীয় সমাজ বাস্তবতায় ছিল অত্যন্ত অগ্রসর চিন্তার পরিচায়ক।
মাদরাসা: জ্ঞান ও রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্র
মাদরাসাগুলো ছিল কেবল ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র নয়; বরং প্রশাসনিক দক্ষতা তৈরির প্রধান উৎস। ফিকহ, হাদিস, তাফসিরের পাশাপাশি যুক্তিবিদ্যা, দর্শন, সাহিত্য ও ভাষা শিক্ষা দেওয়া হতো। দিল্লি সালতানাতের আমলে বহু মাদরাসা থেকে শিক্ষিত ব্যক্তিরা রাজকর্মচারী, বিচারক ও কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মুঘল আমলে এসে এই ধারাবাহিকতা আরও বিস্তৃত হয়। সম্রাট আকবরের শিক্ষা সংস্কার ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তিনি শিক্ষাকে নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং ধর্মভিত্তিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে শিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগ নেন। তাঁর আমলে পাঠ্যক্রমে গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা ও প্রশাসনিক জ্ঞান যুক্ত হয়। এই সময় মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্তিবাদী বা ‘মাকুলাত’ শিক্ষার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।
সংকটের শুরু: একমুখী শিক্ষার দিকে যাত্রা
কিন্তু এই অগ্রগতির ধারাটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মুঘল পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে শিক্ষাব্যবস্থায় এক ধরনের আত্মতুষ্টি ও রক্ষণশীলতা ভর করে। ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন যুক্তিবিদ্যা, বিজ্ঞান ও পরিবর্তনশীল জগতের জ্ঞানকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়। আওরঙ্গজেব পরবর্তী সময়কালে শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমশ ‘মানকুলাত’ বা কেবল ধর্মীয় শিক্ষায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। শাহ ওয়ালিউল্লাহর মতো প্রভাবশালী আলেমদের ভূমিকা একদিকে ধর্মীয় পুনর্জাগরণ ঘটালেও, অন্যদিকে যুক্তিবাদী শিক্ষার পরিসর সংকুচিত করে দেয়। এর ফলে মুসলিম সমাজ সময়ের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে তাল হারাতে থাকে।
ঔপনিবেশিক যুগ ও শিক্ষার অচলাবস্থা
এই দুর্বলতার ফল সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় ব্রিটিশ শাসনামলে। ইংরেজি ভাষা, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রশাসনিক শিক্ষার যে নতুন ধারা চালু হয়, ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম ছিলো না । এক সময় যে শিক্ষাব্যবস্থা রাষ্ট্র পরিচালনার চালিকাশক্তি ছিল, তা ধীরে ধীরে সমাজের প্রান্তে সরে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ও আত্মরক্ষামূলক চরিত্র ধারণ করে। এটি কোনো একক শাসক বা আলেমের ব্যর্থতা নয়; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংকটের ফল। শিক্ষা যখন কেবল অতীত রক্ষার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তি হারায়—এই ইতিহাস সেটিই প্রমাণ করে।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার সময় এখনই
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রাক-ঔপনিবেশিক মুসলিম শিক্ষার ইতিহাস আমাদের গর্বের যেমন, তেমনি আত্মসমালোচনারও বিষয়। শিক্ষা যদি সমাজ পরিবর্তনের প্রধান মাধ্যম হয়, তবে তাকে হতে হবে সময়োপযোগী, বহুমাত্রিক ও যুক্তিনির্ভর। ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও মানবিক জ্ঞানের সমন্বয় ছাড়া কোনো শিক্ষাব্যবস্থাই টেকসই হতে পারে না।
ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, শিক্ষাকে যদি আমরা কেবল ঐতিহ্যের জাদুঘরে বন্দি করি, তবে একদিন সেই ঐতিহ্যই আমাদের পেছনে টেনে ধরবে। তাই অতীতের গৌরব স্মরণ করার পাশাপাশি সেই অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়াই হোক আমাদের অগ্রযাত্রার প্রধান শর্ত।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ