‘পাঁজর থেকে সৃষ্টি’ ইসলাম, খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্মে হাওয়ার ভূমিকা কীভাবে বর্ণিত হয়েছে?

২৪ মার্চ ২০২৬, ০১:৩০ PM
 ইসলাম, খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের পবিত্র গ্রন্থে ইভ

ইসলাম, খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের পবিত্র গ্রন্থে ইভ © সংগৃহীত

খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ ‘বাইবেল (ইঞ্জিল)’ ও ‘তোরাহ’-তে ‘ইডেনের উদ্যান’ থেকে বেরিয়ে আসার ঘটনায় ইভ বা হাওয়াকে মূল চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই দুই পবিত্র গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, হাওয়াই নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার জন্য নবী আদমকে বলেছিলেন।

তবে ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কোরানের বর্ণনা ভিন্ন। কোরান অনুযায়ী, ‘ইবলিস’ অর্থাৎ শয়তান ধীরে ধীরে আদম ও হাওয়াকে প্রলুব্ধ করেছিল এবং পরে তারা দুজনেই গাছের ফলের স্বাদ গ্রহণ করেন। এর ফলে ‘তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে যায় এবং তারা বাগানের পাতা দিয়ে নিজেদের দেহ ঢাকতে শুরু করে’। এরপর আল্লাহর শিক্ষা অনুযায়ী দুজনই ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং দুজনই ক্ষমা লাভ করেন। পরে দুজনকেই পৃথিবীতে পাঠানো হয়।

হযরত আদম ও হযরত হাওয়াকে পৃথিবীতে পাঠানোর আগে যেখানে রাখা হয়েছিল সেই স্থানটির কথা উল্লেখ করতে কবি আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল তার ‘বাল-ই-জিব্রাইল’ বইয়ের একটি কবিতায় ‘বাগ-ই-বেহেশত’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। একই কবিতায় তিনি সেই স্থান ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ বোঝাতে ‘হাকাম-ই-সফর’ শব্দটিও ব্যবহার করেন। কবিতায় তিনি লিখেছেন, “আমাকে বাগ-ই-বেহেশত ছেড়ে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল, যাত্রা এত দীর্ঘ কেন? এখন আমার জন্য অপেক্ষা করো।”

কোরানের সূরা আল-আ’রাফে এই ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। ধর্মীয় চিন্তাবিদ জাভেদ আহমদ গামিদি তার তাফসিরে লিখেছেন, এখানে যে গাছের কথা বলা হয়েছে, সেটি বোঝাতে ‘আল-শাজারাহ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। সূরা ত্বা-হার একটি আয়াতে সেই গাছটিকে ‘শাজারাতুল খুলদ’ বলা হয়েছে।

গামিদির মতে, এখান থেকে স্পষ্ট হয় যে ‘আল-শাজারাহ’ শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘শাজারাতুল খুলদ’ শব্দের অর্থ এবং এই গাছের ফল খাওয়ার পর যে প্রভাবগুলোর কথা বলা হয়েছে, তা থেকে বোঝা যায় যে এখানে মূলত সেই উর্বর গাছের কথাই বলা হয়েছে, যার ফল খাওয়ার কারণেই মানুষ পৃথিবীতে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। তবে আজও মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হিসেবে এই বিষয়টিকেই দেখা হয় অর্থাৎ যৌন আকর্ষণ ও ভোগ, যার সঙ্গে আদম ও হাওয়া তখনো পরিচিত ছিলেন না।

এ বিষয়ে সাম্প্রতিক বহু নতুন গবেষণার লক্ষ্য হলো মানুষের সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত এই ঘটনাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা, যাতে হজরত হাওয়ার ভূমিকা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। ১৮শ শতকে ব্রিটিশ নান জোয়ানা সাউথকোট ইভ বা হজরত হাওয়ার ভূমিকা নিয়ে নতুনভাবে ব্যাখ্যা দেন। মানবজাতির উৎপত্তির কাহিনি সম্পর্কে নিজের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “ইভ মানবজাতির কাছে জ্ঞান পৌঁছে দিয়েছিলেন, আর এই কারণেই তাকে ইডেন উদ্যান থেকে বের করে দেওয়া হয়, যাকে স্বর্গ হিসেবে ধরা হয়।”

জাভেদ আহমদ গামিদির তাফসির অনুযায়ী, এটি সম্ভবত পৃথিবীরই কোনো একটি বাগান ছিল, যাকে আদম ও হাওয়ার আবাসস্থল ঘোষণা করা হয়েছিল। তিনি লিখেছেন, এখানে ‘ইহবিতু’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ ‘নেমে যাও’ বা ‘অবতরণ করো’। এই অর্থ সূরা আল-বাকারার ৬১ নম্বর আয়াতের ‘ইহবিতু মিসরান’ শব্দের সঙ্গেও মিলে যায়। অর্থাৎ আদম, হাওয়া ও ইবলিস তিনজনকেই বাগান ছেড়ে পৃথিবীতে নেমে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

জোয়ানা সাউথকোটের মতে, ‘এখন ইভকে সেই ব্যক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যিনি শয়তানকে পরাজিত করেছিলেন এবং মানবতাকে মুক্ত করেছিলেন। ইভ অ্যাডামকে প্রলুব্ধ করেননি।” আমেরিকার গামিদি সেন্টার অব ইসলামিক লার্নিং–এর গবেষক নাঈম আহমদ বালুচ বিবিসিকে বলেন, কোরান পড়ে বোঝা যায় যে আদম ও হাওয়া দুজনকেই শয়তান প্ররোচিত করেছিল। তিনি বলেন, “বাইবেলের বিপরীতে কোরানে এমন কোনো ইঙ্গিত নেই, যেখান থেকে বোঝা যায় যে হজরত আদম হজরত হাওয়ার কথার কারণে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেছিলেন।’

বাইবেলের কিছু গবেষকও স্বীকার করেন যে অ্যাডামকে ইভের প্রলুব্ধ করার ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই ঘটনার ব্যাখ্যায় জোয়ানা সাউথকোটও বলেন, ‘সব অনিষ্টের মূল উৎস হলো সাপ, যা শয়তানের প্রতীক, ইভের নয়।’

১৮৬৯ সালে ব্রিটিশ চিন্তাবিদ হ্যারিয়েট ল ‘বাগ-ই-বেহেশত’-এ হাওয়ার ভূমিকা নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি ইভকে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নারীবাদের একটি প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন। তার ভাষায়, ইভ ছিলেন ইতিহাসের প্রথম নারীবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ, যিনি নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন।’

নারীবাদের পথিকৃৎ, পবিত্র গ্রন্থের অনুবাদক এবং সমকালীন শিক্ষাবিদদের মতে, পৃথিবীর প্রথম নারী হজরত হাওয়াকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। ব্রাজিলের পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মারিয়া ক্লারা বেনজামার বলেন, ‘আজ ইভকে নতুনভাবে দেখা হচ্ছে।’ তিনি ইভকে এই পৃথিবীর মতো বলে উল্লেখ করেন, যেখান থেকে সব ধরনের জীবনের জন্ম হয়েছে।

নান ও নারীবাদী দার্শনিক ইউভোন গেবহার্ট বলেন, মানুষের উৎপত্তির ইতিহাসের নানা ঘটনায় ইভকে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিছু ব্যাখ্যায় তাকে দুর্বল এবং নিজের কামনা-বাসনার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো নারী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতত্ত্ববিদ ফাবিওলা রোডিন ১৯৯৫ সালে উপস্থাপিত তার গবেষণায় বলেন, “নারীবাদী ধর্মতত্ত্বে ইভ ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা গুরুত্বপূর্ণ মেরি।”

তিনি আরও বলেন, ইভের ওপর যে দায় চাপানো হয়েছে, সেটিকেই পরবর্তীতে সব নারীর ওপর আরোপ করা হয়েছে। তবে অ্যাডাম ও ইভকে ঘিরে থাকা উপকথাগুলোর নতুন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা অত্যন্ত জটিল কাজ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ধর্মতত্ত্ববিদ হোলি মোরিস তার ‘দ্য বাইবেল অ্যান্ড ফেমিনিজম’ বইয়ে লিখেছেন, সামনে এগোতে হলে পিতৃতান্ত্রিক ব্যাখ্যাগুলো ভেঙে দিতে হবে। মধ্যযুগের ইতালীয় দার্শনিক ও কবি ক্রিস্তিনা দে পিজানো বলেন, সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির উৎকর্ষ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে নারীদের বাদ দেওয়া যায় না।

গবেষক নাঈম আহমদ বালুচ বলেন, কোরানে হজরত হাওয়ার নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবে হাদিস ও ইসলামী ইতিহাসে তার নাম হাওয়া হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। ধর্মীয় আলেম পীর জিয়াউল হক নকশবন্দি বলেন, ইমাম তাবারি ও হাফেজ ইবন কাসিরের তাফসিরেও উল্লেখ আছে যে হজরত আদমের পাঁজর থেকে হাওয়াকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নারীকে পুরুষের পাঁজর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর পাঁজরের সবচেয়ে বাঁকা অংশ হলো তার ওপরের দিক। তাই নারীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো।’ নাঈম বালুচের মতে, এই হাদিসটি রূপক অর্থে নারীর কোমল স্বভাবের কথা বোঝায়।

গবেষকরা বলেন, হিব্রু ভাষায় ‘হাওয়া’ শব্দের অর্থ ‘জীবন্ত’ বা ‘জীবনের উৎস’। তোরাহর জেনেসিস গ্রন্থে তাকে ‘সকল জীবের মা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউভোন গেবহার্টের মতে, আজ অ্যাডাম ও ইভকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে—এই ধারণার ভিত্তিতে যে আমরা সবাই বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি।

তিনি বলেন, অর্থাৎ আমরা শক্তি ও দুর্বলতা, ভয় ও কৌশল, প্রতিরোধ এবং নিজেকে বোঝার জন্য নিরন্তর অনুসন্ধানের এক সমন্বয়। তার মতে, ইভকে নায়িকা হিসেবে উপস্থাপন করা বা অ্যাডামকে দুর্বল হিসেবে দেখানো দুইটিই একতরফা দৃষ্টিভঙ্গি।

ধর্মীয় গবেষক ও শিক্ষাবিদদের মতে, পৃথিবীর প্রথম নারী হজরত হাওয়ার কাহিনি আজ নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ইসলাম, খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্মের পবিত্র গ্রন্থে তার ভূমিকা ভিন্নভাবে বর্ণিত হলেও, সব ক্ষেত্রেই তিনি মানবজাতির ইতিহাসে একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে উপস্থিত।

যে পাঁচ ভুল পুরুষের জন্য নারীর কখনোই করা উচিত নয়
  • ২৪ মার্চ ২০২৬
সন্তান এসএসসি পরীক্ষার্থী হলে ‘প্রধান পরীক্ষক’ হতে পারবেন ন…
  • ২৪ মার্চ ২০২৬
স্বাধীনতা দিবসে ছাত্রদলের কর্মসূচি ঘোষণা
  • ২৪ মার্চ ২০২৬
আসাদগেট-শ্যামলীতে সব ক্লিনিক পরিদর্শন, অনিয়মে ছাড় নয়: স্বাস…
  • ২৪ মার্চ ২০২৬
না ফেরার দেশে জবি শিক্ষক জহিরুল, উপাচার্যের শোক
  • ২৪ মার্চ ২০২৬
বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার …
  • ২৪ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence