শরিফুল ইসলাম মোহন © সংগৃহীত
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে বাবা-ছেলের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে শাণিত করেছিল। কিন্তু আন্দোলন করতে গিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ছেলে ফিরে এলেও বাবার ফেরা হয়নি। আন্দোলনে শহীদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন নাটোরের শরিফুল ইসলাম মোহন (৪৫)। শরিফুলের পরিবারের পাশে দাড়াচ্ছে বিভিন্ন দল ও সংগঠন। আর্থিক সহযোগিতাও পাচ্ছেন তারা। কিন্তু নিহত শরিফুলের ছেলে ফারহান ফুয়াদ বলেন, 'এই টাকা দিয়েই বা কী করব? আমাদের মাথার ওপরে বটগাছটাই তো নেই।’
স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসী (৩৮) আর একমাত্র ছেলে ফারহান ফুয়াদকে (১৮) নিয়ে শহরের উত্তর বড়গাছার বাসিন্দা মোহনের ছিল সুখের সংসার। প্রায় দুই দশকের নিষ্ঠা-একাগ্রতায় গড়ে তুলেছেন ফুয়াদ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ। অনেক মেধাবী ছিলেন মোহন। গাড়ির যন্ত্রাংশ আর বাড়ির অবকাঠামোর লোহার অংশটুকু খুব সহজেই মেশিনে তৈরি করতে পারতেন।
মোহন রাজনীতির সাথে যুক্ত না থাকলেও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত ছিলেন। হাসিনা সরকারের লুটপাট আর নিপীড়নের তীব্র সমালোচনায় মুখর থাকতেন। হাসিনা বিরোধী আন্দোলন শুরু হলে ছেলে ফুয়াদের সাথে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন বাবা মোহন।
১৮ জুলাই নাটোর শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সমাবেশের ডাক দেয় বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা। খণ্ড খণ্ড মিছিল আর প্রতিরোধে গুলি চালায় পুলিশ, নিক্ষেপ করে টিয়ার গ্যাস শেল।
এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সাথে রাজপথে অংশগ্রহণ করেন তাদের বাবারা আর মায়েরা তাদের সমর্থক হিসেবে অবস্থান নেন আশপাশের বাড়িতে অথবা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে। উত্তরা সুপার মার্কেট এলাকায় ইট-পাটকেল আর টিয়ার শেলে আহত হন মোহন। ছেলে ফুয়াদ দৌঁড়ে নিরাপদে চলে যান।
৪ আগস্ট আবারো শহরের স্বাধীনতা চত্বর থেকে স্টেডিয়াম পর্যন্ত শহর উত্তাল হয়ে পড়ে। এবার শিক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ পুলিশের সাথে ওই সময়ের স্থানীয় সংসদ সদস্য শিমুল তার ক্যাডার বাহিনীসহ নিজেই। স্টেডিয়ামে সামনে বিএডিসি অফিসের পাশ থেকে ফুয়াদকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে শিমুলের বাহিনী।
‘গণমাধ্যম কর্মীদের ক্যামেরা সচল থাকায় এ যাত্রায় প্রাণে রক্ষা পাই’- বলেন ফুয়াদ। ফুয়াদ আরও বলেন, ‘এদিনের আন্দোলনে পুলিশ এবং শিমুলের অস্ত্রের সামনে সাহসী ভূমিকায় ছিলেন আমাদের বড়ভাই শহীদ রবিন, আমার বন্ধু ওয়াসিফ, রোহান আর আবিদ।'
এদিনের আন্দোলনে অসুস্থ হয়ে পড়েন ফুয়াদ। তাই পরদিন হাসিনা পতনের দিনে শহরে বের হওয়া আনন্দ মিছিলে অংশ নিতে না পারার কথা জানান তিনি। তবে তার বাবা মোহন ওই মিছিলে যান।
শিমুলের বাড়িতে গিয়ে শেষ হয় মিছিল। জনতার তান্ডবে পুড়ে যায় শিমুলের বাড়ি। ওই বাড়িতেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান পাঁচজন। অসুস্থ শরীরে নিখোঁজ বাবাকে রাত সাড়ে তিনটা পর্যন্ত আর্মি ক্যাম্প, থানা আর হাসপাতালে খুঁজে বেড়ান ফুয়াদ।
পরদিন সকালে অগ্নিদগ্ধ মোহনের মরদেহ পাওয়া যায় শিমুলের বাড়িতে। আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বাঁচতে মোহন সম্ভবত আশ্রয় নিয়েছিলেন ওয়াশরুমে। সেখানের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান।
ফুয়াদের মা জান্নাতুল ফেরদৌসী বলেন, ফুয়াদের বাবা ছিলেন আমাদের পরিবারের চালিকা শক্তি, পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দুই লাখ টাকা এবং জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছে জানিয়ে নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সরকারি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ফারহান ফুয়াদ (১৮) বলেন, 'এই টাকা দিয়েই বা কী করব? আমাদের মাথার ওপরে বটগাছটাই তো নেই।'
তিনি বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নাটোরের আন্দোলনে সরকার স্বীকৃত নিহতের তালিকায় আমার বাবার নাম, আহতের তালিকায় আমার নাম আছে।'
ফুয়াদ বলেন, 'আমার বাবা এখন না ফেরার দেশে। তবে দেশের জন্যে জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করা অনেক গৌরবের। ওপার আল্লাহ বাবাকে ভালো রাখুন, শহীদি মর্যাদা দান করুন।'
সূত্র: বাসস।