গোয়েন্দা নজরদারিতে এমটিএফই'র ৪০০ সিইও © সংগৃহীত
ডেসটিনি-২০০০, ইউনি পে টু ইউ-এর মতো প্রতারক এমএলএম কোম্পানির তালিকায় নাম লেখাল মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ গ্রুপ (এমটিএফই) নামের আরেক প্রতিষ্ঠান। পরিশ্রম ছাড়া ঘরে বসে বিনিয়োগ করে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে গ্রাহকের প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এমটিএফই। সেই প্রতারণা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে এমটিএফই নিয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ৪০০ জন্য সিইও’র বিষয়ে তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, এমটিএফই’র ৪০০ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রয়েছে বাংলাদেশ। এই ৪০০ সিইও’র বিরুদ্ধে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করছেন গোয়েন্দারা। তাদের আটক বা গ্রেফতার করার জন্য গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি সাইবার ফুটপ্রিন্ট সংগ্রহ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিআইডি ও ডিবি সূত্রে জানা যায়, এমটিএফই’র প্রতারণার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক ইউনিট কাজ করছে। পাশাপাশি এ বিষয়ে ডিবি এবং সিআইডিও কাজ করছে। তাদের প্রাথমিক তদন্তে এমটিএফই’র বেশ কয়েকজন রিপ্রেজেনটেটিভ ও মার্কেটিংয়ের লোকজনের সন্ধান পাওয়া গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ গ্রুপ নামে ক্রিপ্টোকারেন্সি (যেমন-বিট কয়েন) ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম এমটিএফই’র প্রতারণা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা ও তথ্য পেলেও এখনো লিখিত কোনো অভিযোগ কিংবা মামলা পাওয়া যায়নি। তবে মামলা না পেলেও এ বিষয়ে ছায়াতদন্ত করা হচ্ছে। কেউ লিখিত অভিযোগ ও মামলা করলে জড়িতদের গ্রেফতার করা হবে।
পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এমটিএফই’র গ্রাহকদের অধিকাংশই অ্যাপটির বিষয়ে জানতো না। তারা স্থানীয় সিইওদের সভা-সেমিনারে অংশগ্রহণ করে অ্যাপটির বিষয়ে জানতে পারেন। এরপর প্রলোভিত হয়ে বিনিয়োগ করেন। এই দায় সিইওরা এড়াতে পারে না। তাই তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যদিও এমটিএফই’র প্রতারণার বিষয়ে এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে আমরা আমাদের কাজ করছি। এখন পর্যন্ত ৪০০ জন্য সিইও’র বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
জানা গেছে, এমটিএফই বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে ২০২১ সালে। তিন বছরে এমটিএফইতে শুধু বাংলাদেশ থেকেই ৪২ লাখ মানুষ যুক্ত হয়েছেন। প্রাথমিক অবস্থায় এমটিএফই অ্যাপে যুক্ত প্রত্যেকেই ৬১, ২০১, ৫০১, ৯০১ ও ২ হাজার ডলার ডিপোজিট করেন। বেশি টাকা আয় করতে কেউ কেউ ৫ হাজার ডলারের বেশিও বিনিয়োগ করেছেন। এর মধ্যে কেউ জমানো টাকা, কেউবা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আবার কেউ জমি বন্ধক রেখে বিনিয়োগ করেছিলেন।
আরও পড়ুন: শুয়ে-বসে আয়ের লোভ দেখিয়ে উধাও এমটিএফই, মূলহোতারা ওমরা হজে
প্রথমে গত ৭ আগস্ট সিস্টেম আপগ্রেডের কথা বলে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন সেবা বন্ধ করে এমটিএফই। এরপর গত বৃহস্পতিবার (১৭ আগস্ট) রাতে হুট করে প্রায় সব গ্রাহকের ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্ট ঋণাত্মক দেখানো শুরু করে অ্যাপটি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের ব্যবসায় লোকসান হয়েছে। এজন্য উল্টো গ্রাহকদের কাছ থেকেই তারা টাকা পাবে। ফলে প্রতিষ্ঠানটিতে বিনিয়োগ করা গ্রাহকরা লাভের গুড় তো পায়নি বরং তাদের ঘাড়ে আরও ঋণের বোঝা চেপেছে।
ঢাকাসহ সারা দেশে কোম্পানিটির ৪ শতাধিক অফিস রয়েছে। এমটিএফই’র অ্যাপে এসব অফিসের ছবিসহ ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য দেয়া আছে। মূলত দুবাই থেকে মাসুদ আল ইসলাম নামের এক বাংলাদেশি এমটিএফই’র এশিয়া অঞ্চলের দেখভাল করেন। তিনিই এমটিএফই’র কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করে বিভিন্ন গ্রুপগুলোতে ছড়িয়ে দিতেন। তার থেকে পাওয়া তথ্য অন্যান্য গ্রুপের সিইওরা তাদের মেম্বারদের জানাতেন। মেম্বাররা আবার তাদের সদস্যদের জানাতেন।
এমটিএফই’র বেশ কয়েকজন গ্রাহক জানান, অ্যাপটিতে কেউ ৫০০ ডলার বিনিয়োগ করলে প্রতিদিন তাকে প্রায় ১৩ ডলার লাভ দেওয়া হতো। তবে এত অল্প বিনিয়োগে তো বড় লাভ আসবে না। সেজন্য অনেকে ৫ হাজার, ১০ হাজার, এমনকি ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন। বিনিয়োগ যত বেশি, লাভও তত বেশি ছিল। এমনকি প্রতিমাসে বিনিয়োগের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ পেতেন গ্রাহকরা।
এমটিএফইতে শুধু বিনিয়োগের ওপর লাভই নয়, কাউকে বিনিয়োগ করাতে পারলে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পাওয়া যেত। এমন করে কারও মাধ্যমে ১০০ জন গ্রাহক বিনিয়োগ করলে তার পদবি হতো ‘সিইও’। কমিশন আর নিজের বিনিয়োগের অর্থ মিলে ওই কথিত সিইও মাসে ১৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারত।
এমটিএফই’র ফাঁদে পড়ে শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও প্রতারিত হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতারিতদের মধ্যে বেশিরভাগই তরুণ এবং বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এ ছাড়া শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী এবং সাংবাদিকসহ অন্যান্য পেশার মানুষও রয়েছেন।