গাড়ীক্ষেত্র ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা © টিডিসি ফটো
২৭ বছর ধরে বেতন ছাড়াই শিক্ষকতা করছেন নওগাঁর গাড়ীক্ষেত্র ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার ১৫ শিক্ষক। বেতন-ভাতা না থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। জীবিকার তাগিদে জড়াচ্ছেন ছোটখাটো ব্যবসা ও অন্যান্য পেশায়। এমপিওভুক্ত না হওয়ায় বন্ধের পথে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিও।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মাদ্রাসাটি ওই অঞ্চলের অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে আসছিল। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্তির আওতায় আসেনি। ফলে এ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরা চরম মানবিক ও আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। তাই বিগত একটানা ২৭ বছর ধরে বেতনহীন শিক্ষক বাধ্য হচ্ছেন মানবেতর জীবনযাপন করতে। তাদের সঙ্গে রয়েছেন একজন কর্মচারীও।
মাদ্রাসাটি ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ২০০২ সালে প্রথম স্বীকৃতি লাভ করে এবং ২০০৪ সাল থেকে শিক্ষার্থীরা দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে আসছেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ১৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। তবে এমপিওভুক্ত না হওয়ায় তারা দীর্ঘদিন নিয়মিত বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত। অনেক শিক্ষক জীবিকার তাগিদে পাঠদানের পাশাপাশি দর্জি, দিনমজুরি, কৃষি কাজ ও ছোটখাটো ব্যবসা করতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানান, শিক্ষকরা চরম আর্থিক অনটনের মাঝেও দীর্ঘ ২৬ থেকে ২৭ বছর ধরে সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে পাঠদান করে প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দ্রুত কোনো কার্যকর সরকারি উদ্যোগ না নেওয়া হলে যে কোনো মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে করে ব্যাহত হবে স্থানীয় শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন।
মাদ্রাসাটির গৌরবময় ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনে শিক্ষা কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে সরকারের শিক্ষামন্ত্রীসহ স্থানীয় সংসদ সদস্য ইকরামুল বারী টিপু এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, দ্রুত এ প্রতিষ্ঠানটিকে এমপিওভুক্ত করে এলাকার শিক্ষা বিস্তারের পথ সুগম করা হোক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, ‘বিনা বেতনে ২৭ বছর ধরে মাদ্রাসায় চাকরি করছি। সংসার চালানোর দর্জি-দিনমজুরিসহ নানা পেশায় যুক্ত হচ্ছেন আমাদের সহকর্মীরা। শিক্ষক হিসেবে এটা আমাদের করতে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হলে, আমাদের জীবনমান উন্নয়ন হতো।’
গাড়ীক্ষেত্র ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সভাপতি আনেয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘এ মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠার ২৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক কারণে প্রতিষ্ঠানটি বঞ্চিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি স্বীকৃতি ও বেতন-ভাতার বাইরে থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-কর্মচারীরা। অন্যদিকে জরাজীর্ণ ভবন, ভাঙাচোরা শ্রেণিকক্ষ ও সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই চলছে পাঠদান কার্যক্রম। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। এখন আমরা আশা করছি দ্রুত এমপিওভুক্তির মাধ্যমে শিক্ষকদের বেতন-ভাতার ব্যবস্থা হবে।’
মাদ্রাসার সুপারিনটেনডোন্ট লোকমান হোসেন বলেন, ‘১৪৬.৫ শতক জমিতে এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়। তিল তিল করে অনেক পরিশ্রম ও সময় নিয়ে মাঠে অবস্থান তৈরি করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। অনেক অনেক অনুরোধ ও দোয়ার উপর ভরসা করে শিক্ষার্থী ভর্তি। তাদের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করতে সময় লেগেছে। মাদ্রাসায় বতমানে ৩৬৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য বিগত সরকারের সময়ে বারবার আবেদন করেও এমপিওভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি চরম অবহেলা করা হয়েছে। সরকারিভাবে বিশেষ করে জোরালো গুরুত্ব না দেয়ার কারণে সুযোগ সুবিধার বাইরে থাকায় ধীরে ধীরে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী সংখ্যা কমতে শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভূক্ত না হওয়ায় সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। অবিলম্বে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত করার জন্য সরকারের শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু সুদৃষ্টি কামনা করছি।
উপজেলা অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার আবদুল লতিফ বলেন, প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে। তারা এমপিওভুক্তির জন্য চেষ্টা করছে। আশা করি খুব দ্রুত ইতিবাচক সমাধান হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আকতার জাহান সাথী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে কেবলমাত্র জানতে পেরেছি। তারা যদি এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করে তাহলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।’