নির্জনে আল্লাহর ইবাদত © এআই সম্পাদিত
ফরজ নামাজের পর গভীর রাতে আদায় করা নফল নামাজের মধ্যে তাহাজ্জুদকে সর্বোত্তম বলা হয়েছে। নির্জনে আল্লাহর ইবাদত, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও দোয়া করার বিশেষ সুযোগ তৈরি হয় রাতের শেষ প্রহরে। কোরআন ও হাদিসে তাহাজ্জুদের গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। নিয়মিত এই ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধি ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়।
মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী তাঁর ‘তাহাজ্জুদ: আল্লাহ তাআলার প্রিয় হওয়ার আমল’ শীর্ষক প্রবন্ধে তাহাজ্জুদের গুরুত্ব, ফজিলত এবং এই নামাজে অভ্যস্ত হওয়ার বিভিন্ন উপায় তুলে ধরেছেন।
প্রবন্ধে বলা হয়েছে, পবিত্র কোরআনে রাতের বেলা শয্যা ত্যাগ করে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হওয়াকে মুমিনদের অন্যতম গুণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের রবকে ডাকে ভয় ও আশার সঙ্গে এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে। (সুরা আস-সাজদা, আয়াত: ১৬)
তাহাজ্জুদ কেবল একটি নফল ইবাদত নয়; বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ফরজ নামাযের পর উত্তম নামাজ গভীর রাতে নামাজ পড়া। (মুসলিম : ১১৬৩)
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) তাহাজ্জুদের প্রতি যত্নবান হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, তোমরা তাহাজ্জুদের প্রতি যত্নবান হও। কেননা তা তোমাদের পূর্ববর্তী সালেহীনের অভ্যাস এবং রবের নৈকট্য লাভের বিশেষ মাধ্যম। আর তা পাপরাশী মোচনকারী এবং গোনাহ থেকে বাধা প্রদানকারী। (তিরমিযী : ৩৫৪৯)
দোয়া কবুলের বিশেষ সুযোগ:
রাতের শেষ তৃতীয়াংশকে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় আল্লাহ তাআলা বান্দাদের আহ্বান করেন বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমাদের রব প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আছো, দোয়া করবে আমি তার দোয়া কবুল করব। কে আছো, আমার কাছে তার প্রয়োজন চাইবে আমি তাকে দান করব। কে আছো, আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আমি তাকে ক্ষমা করব। (বুখারী : ১১৪৫)
রাতের নির্জনতায় মানুষ একাগ্রচিত্তে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন, দুঃখ-কষ্ট ও গুনাহের জন্য ক্ষমা চাইতে পারে। এ সময়ের ইবাদতে লোক দেখানোর প্রবণতা থেকেও দূরে থাকা সহজ। তবে দিনের বেলায় নিজের রাতের ইবাদত প্রচার করে বেড়ানো থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হতে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে:
তাহাজ্জুদে নিয়মিত হওয়ার জন্য কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—পাকাপোক্ত নিয়ত ও দৃঢ় সংকল্প করা, ইবাদতে ইখলাস বজায় রাখা, রাতে দ্রুত ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুমের আগে অজু ও দোয়া-দরুদসহ সুন্নতসম্মত আমল করা। এ ছাড়া ঘুমানোর আগে সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক, সুরা নাস ও আয়াতুল কুরসি পাঠের কথা বলা হয়েছে। সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়ার ফজিলত সম্পর্কেও হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সূরা বাকারার শেষ দুটি আয়াত এমন যে, যে ব্যক্তি কোন রাতে ঐ দু’টি পড়বে তা তার সে রাতের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। (বুখারী : ৫০০৯)
এছাড়া তাহাজ্জুদে উঠতে না পারলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে এবং নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য অনুতপ্ত হতে হবে। পাশাপাশি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হবে। কারণ, নিয়মিত ইবাদতের ক্ষেত্রে আত্মশুদ্ধি ও ইখলাসের গুরুত্ব অনেক।
স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে তাহাজ্জুদ আদায়ের ফজিলত:
তাহাজ্জুদ শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে এই আমলে উৎসাহিত করতে পারেন। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সে ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ রহম করেন যে রাতে উঠে নামায আদায় করে, তারপর স্ত্রীকে জাগিয়ে দেয় এবং সেও সালাত আদায় করে। স্ত্রী যদি উঠতে না চায় তখন তার চেহারায় পানি ছিটিয়ে হলেও উঠানোর চেষ্টা করে।
অনুরূপভাবে ওই নারীর প্রতি আল্লাহ রহম করুন, যে রাতে উঠে নামাজ আদায় করে তারপর স্বামীকে জাগিয়ে দেয় এবং স্বামী উঠে নামাজ আদায় করে। স্বামী উঠতে না চাইলে চেহারায় পানি ছিটিয়ে হলেও তাকে উঠানোর চেষ্টা করে। (নাসায়ী : ১৩০২)
তাহাজ্জুদের আরও বিভিন্ন ফজিলত ও সালফে সালেহিনের জীবনের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাতের ইবাদত মানুষের মধ্যে আত্মসংযম, ধৈর্য, একাগ্রতা ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়াতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে গোপন ইবাদতের মাধ্যমে ইখলাস ধরে রাখার শিক্ষা পাওয়া যায়।
নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায়ের জন্য দৃঢ় নিয়ত, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর কাছে তাওফীক প্রার্থনা জরুরি জীবনে এই ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে একজন মানুষ আত্মিকভাবে সমৃদ্ধ হতে পারেন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথে এগিয়ে যেতে পারেন বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।