গুরুত্বপূর্ণ আমল রোজা © সংগৃহীত
রোজা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল রোজা রাখা। রমজানুল মুবারক মাসে রোজা আদায় করা ফরজ বা বাধ্যতামূলক। রমজানের রোজার বাইরে অন্য সময় রোজা আদায় করা নফল। নফল অর্থ অতিরিক্ত, ঐচ্ছিক। দুই ধরনের নফল রোজা রয়েছে। রাসূল (সা.) যে সকল গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দিবসে রোজা রাখতেন এবং উম্মতকে উদ্বুদ্ধ করেছেন এমন দিনগুলোতে রোজা রাখা সুন্নাত। আবার, শরিয়ত নিষিদ্ধ পাঁচটি দিন (ঈদুল ফিতরের দিন এবং ঈদুল আযহার ও তৎপরবর্তী তিন দিন) ব্যতিরেকে বছরের যে কোনো দিনে সওয়াবের নিয়তে রোজা রাখা মুস্তাহাব।
মহানবি (সা.) নিজে বেশি বেশি নফল রোজা রাখতেন। প্রতি সপ্তাহের সোমবার রোজা রাখা এমনই একটি নফল রোজা। রাসুল (সা.) বছরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিবসে রোজা রাখতেন এবং উম্মতকে রোজা আদায়ের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছেন। শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা, আশুরার দিন ও তার আগে বা পরে একটি রোজা, আরাফার দিবসে রোজা সহ বিভিন্ন রোজার গুরুত্ব হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
অগণিত সওয়াব প্রাপ্তি, গুনাহ মাফের ঘোষণা, শুকরিয়া আদায় ইত্যাদি নানা কারণে এসব দিবসে মহানবী (সা.) রোজা রাখতেন এবং সাহাবিদের রোজা রাখতে উৎসাহিত করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ দিনে রোজা রাখার পাশাপাশি প্রত্যেক চন্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে বা আইয়ামে বিযের দিনগুলোতে নিয়মিত রোজা রাখতেন। এছাড়া প্রত্যেক সপ্তাহের সোমবারের ন্যায় বৃহস্পতিবারও রোজা রাখতেন।
আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া তথা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হলো অতিরিক্ত ইবাদত করা বা নেক আমল করা। বিপদ মুসিবত দূর হলে বা কোন নেয়ামত প্রাপ্ত হলে শুকরিয়া সেজদা, নামাজ, রোজা রাখা, দান করার মাধ্যমে শুকরিয়া আদায় করা উচিত। হযরত মূসা (আ.) ও তার সাথিদেরকে ফেরাউন তার বাহিনীসহ আক্রমণের জন্য ধাওয়া করলে সামনে পড়ে অথই জলরাশি। মহান আল্লাহ তাআলা সাগরের মাঝে রাস্তা তৈরি করে মূসা (আ.) কে রক্ষা করেন এবং ফেরাউন তার বাহিনী সহ সাগরে নিমজ্জিত হয়ে সলিল সমাধিস্থ হয়। হযরত মূসা (আ.) এ ঘটনার পর আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করে আশুরার দিনে রোজা রাখতেন। পরবর্তীতে রাসুল (সা.) এ দিনে রোজা রাখেন।
মহানবী (সা.) তার জন্মদিবস এবং কুরআন নাযিলের দিনের শুকরিয়া আদায় করে প্রতি সোমবার রোজা রাখতেন। মহানবি (সা.) এর সোমবার রোজার রাখার মাহাত্ম্য সম্পর্কে সাহাবিদের মধ্যে আগ্রহ ছিল। আবু কাতাদাহ আনসারি(রা.) হতে বর্ণিত, একবার রাসুল (সা.) কে এ দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘এই দিন আমি জন্ম নিয়েছি, আর এই দিনই আমার উপর কুরআন নাজিল হয়েছে।’ (মুসলিম, হাদিস-২৬১৮, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস-২৪২৬, ইবনে খুজাইমাহ, হাদিস-২১১৭)
অন্য একটি হাদিসে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার (আল্লাহর নিকট বান্দার) আমল উপস্থাপন করা হয়, আর আমি এটা পছন্দ করি যে, আমি রোজা পালনরত অবস্থায় আমার আমলসমূহ আল্লাহর নিকট পেশ করা হোক।’ (তিরমিযি, হাদিস:৭৪৫)
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বান্দাহর প্রতিটি পুণ্যকর্ম ও মন্দকর্মের ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞানবান। তাকে নতুন ভাবে কোনো কিছু জানানোর প্রয়োজন থাকে না। তথাপিও তিনি তার প্রিয় বান্দাহদের আমল সমূহ তার দরবারে একত্রিত করে উপস্থাপন করাকে পছন্দ করেন। বান্দাহর সারা সপ্তাহের আমলসমূহ একত্র করে সপ্তাহের এই দুই দিন আল্লাহর দরবারে আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হয়।
সুতরাং এ দিন দুটি হলো সাপ্তাহিক রিপোর্টিং এর দিন। দুনিয়াতে যেখানে আনুষ্ঠানিক ভাবে কর্তৃপক্ষের নিকট কোন রিপোর্ট উপস্থাপনের জন্য আমাদের প্রস্তুতি থাকে সেখানে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট আমার আমল সমূহ উপস্থাপিত হবে সেখানে আমাদের প্রস্তুতি থাকা বাঞ্ছনীয়। রোজা আল্লাহর অতীব পছন্দনীয় আমল, রাসূল (সা.) এজন্য এ দিন রোজা অবস্থায় কাটাতেন।
সোমবার বান্দাহর মুক্তি লাভের দিন, সাধারণ ক্ষমা লাভ করে জান্নাতের প্রবেশের অনুমতি প্রাপ্তির দিন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, এরপর এমন সব বান্দাহকে ক্ষমা করে দেওয়া হয় তাদের ব্যতীত যারা আল্লাহর সাথে শিরক করে। আর সে ব্যক্তিকে নয় যে তার ভাইয়ের সাথে শত্রæতায় লিপ্ত আছে। এ সময় ঘোষণা করা হয়, এদের দুজনকে মীমাংসার অবকাশ দাও, তাদের মীমাংসার অবকাশ দাও, তাদের মীমাংসা অবকাশ দাও। (মুসলিম, হাদিস-৬৩১২)
রাবিআ ইবনুল গাজ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) কে রাসুল (সা.) এর নফল রোজার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘রাসূল (সা.) সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখার ব্যাপারে খুবই মনোযোগী ছিলেন।’ (তিরমিজি -৭৪৩, ইবনে মাজাহ, হাদিস-১৭৩৯, ইবনে হিব্বান, হাদিস-৩৬৪৩)
রাসূল (সা.) এর বিভিন্ন হাদিস সমূহ পর্যালোচনা করে বোঝা যায়, সোমবার সপ্তাহের একটি মর্যাদাপূর্ণ বিশেষ দিন। এটি রাসূল (সা.) এর আগমনের দিন হিসেবে আরো বিশেষায়িত মর্যাদা লাভ করেছে। সোমবার নবিজি (সা.) এর আগমনের দিন একই সাথে আল্লাহর নিকট বান্দাহর আমল পেশ করার দিন। রাসূল (সা.) এ দিনে রোজা রাখতেন। তিনি এই রোজা পালন করাকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতেন।
রোজা আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল সমূহের একটি। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বান্দাহ একমাত্র আমার জন্য পানাহার ও কামাচার বর্জন করে, রোজা আমার জন্যই, আমি নিজে তার প্রতিদান দেব।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস:১৭৭৩)। এজন্য প্রত্যেকের মুমিনের উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে যথাসম্ভব বেশি বেশি রোজা আদায় করা। ফরজ রোজা আদায়ের পাশাপাশি নফল রোজা আদায়ের সর্বাত্মক চেষ্টা করা। রাসূল (সা.) ইরশাদ ফরমান, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য একটি রোজা রাখবে, আল্লাহ তার চেহারাকে জাহান্নামের আগুন থেকে সত্তর বছরের দূরত্বের রাস্তা সমান দূরে সরিয়ে রাখবেন।’ (নাসায়ি, হাদিস:২২৪৮)
মহানবী (সা.) হলেন সমগ্র সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। সমগ্র জগতের জন্য তিনি রহমত। আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা তার উম্মত হতে পেরেছি। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে হলে প্রতিটি আমল করার ক্ষেত্রে রাসুল (সা.) এর অনুসরণ একান্ত অপরিহার্য। পরবর্তী যুগে, সাহাবিগণ, তাবেয়িগণ, তাবে-তাবেয়িগণ থেকে সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা আদায়ের প্রমাণ পাওয়া যায়। উম্মত হিসেবে আমাদেরও সোমবার ও বৃহষ্পতিবার রোযা আদায় করার চেষ্টা করা উচিত।
লেখক: প্রভাষক, বাঁশেরবাদা ডিগ্রী (অনার্স) কলেজ, ঈশ্বরদী, পাবনা