কেমন ছিল উপাচার্য তৌফিক আলমের ১ বছর ১ দিন

টিডিসি সম্পাদিত

টিডিসি সম্পাদিত © টিডিসি

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌফিক আলমের ১ বছর ১ দিনের দায়িত্বকাল ছিল নানা আলোচনায় ভরা। শিক্ষার্থীবান্ধব আচরণ, সাদামাটা জীবনযাপন ও সততার জন্য যেমন তিনি শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা অর্জন করেছেন, তেমনি প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, আন্দোলন ও বিতর্কও ছিল তার পথচলার অংশ। শেষ দিনে শিক্ষার্থীদের আবেগঘন বিদায় যেন তার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষ সম্পর্কেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

শুক্রবার (১৫ মে) বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের(ববি) কেন্দ্রীয় মসজিদে জুমার নামাজের পর সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌফিক আলম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলিঙ্গন ও কুশল বিনিময় করেন। মসজিদ প্রাঙ্গণে উপাচার্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হতে দেখা যায়। একপর্যায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলিঙ্গনের সময় নিজের আবেগকে চেপে রাখতে পারেননি উপাচার্য। পরে চোখ মুছতে মুছতে নিজের মোটরসাইকেলে ওই মুহূর্ত থেকে বিদায় নেন।

নতুন নিয়োগের ধারাবাহিকতায় বিদায়
বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় গত ১৪ মে ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব নিয়োগ দেয়। সেই তালিকায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদেও আসে পরিবর্তন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য হিসেবে দ্বায়িত্ব রয়েছেন অধ্যাপক মামুন অর রশিদ।

মুক্তি দিয়ে আসা, মুক্তি দিয়ে যাওয়া
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক শুচিতা শরমিনের অপসারণের দিন ২০২৫ সালের ১৩ মে অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌফিক আলম। একই বছর ১০ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে চার বছরের পূর্ণকালীন ষষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

তার যোগদানের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে শিকল দিয়ে তালাবদ্ধ থাকা উপাচার্য বাসভবনের গেটের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন। সে সময় তার বলা যে দুটি বাক্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে, ‘শুনো, এটা আমি তোমার হাতে দিলাম। আমার মাধ্যমে যদি কোনো অন্যায় পাও এটা আবার আটকিয়ে দিও, কেমন?’ আর নতুন উপাচার্যের প্রজ্ঞাপনের দিন (১৪মে) এবং চলমান শিক্ষকদের আন্দোলনে তালাবদ্ধ থাকা রেজিস্ট্রার ও অর্থ দপ্তরের কার্যালয়ের তালা খুলে দেন সাবেক এই উপাচার্য। এই যেন মুক্তি দিয়ে আসা, মুক্তি দিয়ে যাওয়ার মতো।

শিক্ষার্থীদের প্রিয় মুখ, বিতর্কেরও কেন্দ্রে
যোগদানের শুরু থেকেই তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষার্থীবান্ধব উপাচার্য হিসেবে পরিচিতি পান এবং পরবর্তী সময়েও তা ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তার সততার প্রশংসা আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পেশাজীবীর মুখে মুখে।

তবে তার এই এক বছরের পথচলা সহজ ছিল না। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আমরণ অনশন, অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবিতে আন্দোলন, নিজ কন্যার পোষ্য কোটায় ভর্তি, নিয়োগ-পদোন্নতি সংক্রান্ত জটিলতা এবং মাঠ সংস্কারের ধীরগতি বিভিন্ন সময় জবাবদিহিতার মুখে পড়েছেন তিনি। পদোন্নতি বোর্ডসহ কিছু ভুল পদক্ষেপের কথা তিনি নিজেই অকপটে স্বীকার করেছেন এবং নিজের সীমাবদ্ধতার কথাও জানিয়েছেন।
অবকাঠামো উন্নয়ন ও মাঠ সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা তাঁকে 'মুলাচাষী' আখ্যা দিতেও দ্বিধা করেননি।

শিক্ষকদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা
শিক্ষকদের পদোন্নতির দাবিতে গত ১০ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক তৌফিক আলমকে ক্যাম্পাস থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন ‘শিক্ষক সমাজ’। আর এই অবাঞ্ছিত ঘোষণার মধ্যেই তাকে বিদায় নিতে হয়। একই দাবিতে সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান মো. জামাল উদ্দিন গত ১৯ এপ্রিল আমরণ অনশন বসেন উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে।

৭ শিক্ষার্থী অনশনে রাত্রিযাপন
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নসহ তিন দাবিতে গত বছর ৪ সেপ্টেম্বর আমরণ অনশনে বসেছিলেন সাত শিক্ষার্থী। তাৎক্ষণিক (রাত ১০টা) অনশন থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেননি এই উপাচার্য। তবে দায়িত্ব এড়িয়ে না গিয়ে মধ্যরাতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে মশারি টাঙিয়ে কাটিয়ে দেন পুরো রাত। পরে শিক্ষার্থীদের হৃদয় জায়গা করে নেন তিনি।

সাদামাটা চলাফেরা তার
তিনি গতানুগতিক উপাচার্যেদের মতো শিক্ষকদের নিয়ে হাঁটতেন না। কখনো কখনো একাকী গ্রাউন্ড ফ্লোরে দেখা মিলতো তার, তার এই একলা চলা ছিল স্বভাব। তার ছিল না বিশাল গাড়ি বহর, জ্বালানি সংকটে বেঁচে নিয়েছিলেন গণপরিবহণ। ব্যক্তিগত যানবাহন বলতে নিজের মোটরসাইকেল ছিল। কখনো একলাই হলের ডাইনিংয়ে, কখনো ক্যাফেতে কিংবা মোটরসাইকেল চালানো অবস্থায় দেখা যেত তাকে। সাদামাটা চলাফেরাই এই উপাচার্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করছেন বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা। 

শিক্ষার্থীদের জন্য ভিড়ে ঝাঁপিয়ে পড়া
শিক্ষার্থীদের ওই তিন দফা দাবিতে গত বছর ২৬ আগস্ট মহাসড়ক অবরোধে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হয়। তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে উত্তেজিত ভিড়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। আপ্রাণ চেষ্টা করেন দুই পক্ষকে শান্ত করতে। সে দৃশ্যটা মুহূর্তেই ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যে দৃশ্যটা এই উপাচার্যকে নতুন সংজ্ঞায়িত করে শিক্ষার্থীদের কাছে।

উপাচার্যের কিছু দৃশ্যমান অবদান
বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ফেজের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্পের পিডি নিয়োগ নিয়োগ দেন তিনি। ইতোমধ্যে জানা যায়, ওনার উদ্যোগে প্রায় ৫০ কোটি টাকার একটি একক ক্ষুদ্র প্রকল্প (অ্যাকাডেমিক ভবন-৩) একনেকের সুবজ পাতায় যুক্ত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠের সংস্কার সম্পন্ন করার পাশাপাশি আরেকটি পরিত্যক্ত স্থানকে খেলার মাঠে রূপান্তরের উদ্যোগ নেন। যার মাটি বরাটের জন্য ইউজিসি থেকে ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ নিয়ে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ভবনের সামনে জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগ নেন, যার কাজ চলমান। টিএসসির পাশে একটি চত্বর নির্মাণ করেন। সাপ্তাহিক ও সাধারণ ছুটির দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রী লাইব্রেরির রিডিং রুম খোলা রাখার ব্যবস্থা করেন এবং রিডিং রুমে সংস্কার ও এসি স্থাপন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন সেবার পরিধি ও রুট বৃদ্ধি করেন। যার ফলে শিক্ষার্থীরা শহরের বাহিরেও নিজস্ব বাসে যাতায়াতে সুযোগ পাই এবং পরিবহন সংখ্যাও বৃদ্ধি করেন তিনি। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে বেশকিছু উদ্যোগ নেন এবং ১০জন প্রভাষকের নিয়োগ কাজ সম্পূর্ণ করেন সাবেক এই উপাচার্য। তবে তিনি জুলাই হামলার বিচার ও ছাত্র সংসদ গঠন করতে পারেননি।

গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আফরান সিফাত বলেন, ‘প্রাক্তন ভিসি অধ্যাপক তৌফিক আলম স্যারের পরিবর্তনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একদল তার বিদায়ে সন্তুষ্ট, আরেকদল অসন্তোষ। আমি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে ৪ জন ভিসির রদবদল দেখেছি। প্রশাসনিক কার্যক্রমের দিক দিয়ে তার অদক্ষতার কিছু কথা তিনি নিজেই স্বীকার করেন। এর সাথে তার কার্যক্রমে তাকে অসহযোগিতা করার ব্যাপারটিও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে স্পষ্ট। কিন্তু তিনি ব্যক্তি মানুষ হিসেবে অমায়িক একজন মানুষ ছিলেন। তার সাথে নির্দ্বিধায় ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিকসহ যে-কোনো সমস্যা শিক্ষার্থীরা আলোচনা করতে পারতো। যা পূর্ববর্তী কোনো ভিসির সাথে করা সম্ভব হয়নি। ব্যক্তি মানুষ হিসেবে যে উনি অমায়িক ছিলেন তার প্রতিফলন তার বিদায়ের দিন শিক্ষার্থীদের মাঝে দেখা যায়।’

শিক্ষার্থী নাজমুল ঢালি বলেন, ‘সদ্য বিদায়ী বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. তৌফিক আলম স্যার তার এক বছর দায়িত্বকালীন সময়ে অত্যন্ত সৎ, নিষ্ঠা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব ছিলেন। অত্যন্ত সৎ থাকার ফলে তাকে পরতে হয়েছে নানান বিড়ম্বনায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে তিনি ছিলেন শিক্ষার্থীদের পাশে, শিক্ষার্থীদের জন্য ঝাপিয়ে পরছেন নানান প্রতিকূল অবস্থায়। এক বছর আগে আন্দোলন সংগ্রাম করে যে ভিসি আমরা পেয়েছিলাম, এই একবছরে তার কোনো অন্যায় দুর্নীতি দৃশ্যায়মান হয়নি, তবে স্যারের ছিলো নানান বাধা, প্রতিকূলতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকটাপন্ন ব্যবস্থাপনা, যে কারণে তিনি পড়েছেন নানান বিড়ম্বনায়। সর্বশেষ স্যারের জন্য শুভকামনা রইলো।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘যুগে যুগে গাইবে গান, প্রতিটি ইট-পাথর এবং নানান পেশাজীবী মানুষ, তার সততার। স্যার, ভুলে যাবেন না আমাদের। মন থেকে মুছে ফেলবেন না। ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেবেন। আমরা হয়তো যোগ্য ছিলাম না আপনার সততার।’

গত রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রোগ্রামে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক তৌফিক আলম বলেন, ‘আমি ওনার (নবনিযুক্ত উপাচার্য) সঙ্গে কথা বলেছি। ওনি খুবই ভালো মানুষ। এবং আমি ওনাকে বিস্তারিত, আমাদের বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে কি অবস্থা এবং কি ভাবে এগোয় যেতে সমস্ত বিষয় অবহিত করেছি। ইনশাল্লাহ, তোমাদের সহযোগিতা ফেলে ওনি এই কাজগুলো সুন্দরভাবে এগোয়ে নিয়ে যেতে পারবেন। সবার জন্য দোয়া থাকল, আমার জন্য দোয়া করবা।(আবেগাপ্লুত) আর এই চলার পথে গত এক বছর কোনো ভুল ত্রুটি হয়ে থাকে, একটি মানুষ কখনো পারফেক্ট হতে পারেনা তার কিছু ভুল থাকে, আবার কিছু খারাপ দিক ও থাকে, সে খারাপ দিক বিবেচনা নিয়ে কারো মনে আঘাত করে থাকি, তাহলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে এবং আমাকে ক্ষমা করে দিবে। সবাইকে সংখ্য ধন্যবাদ, আসসালামু আলাইকুম।’

শিক্ষকদের বদলি আবেদনের ফলাফল কবে, যা বলছেন কর্মকর্তারা
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনুমোদনের দুই সপ্তাহ পরও হয়নি পে-স্কেলের গেজেট, যা বলছেন কর…
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাবিপ্রবি ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভি…
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বরিস জনসন ও ইউরোপের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্টেশন ছাড়ার পর ইউক্…
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শেষ হলো শিক্ষকদের বদলি আবেদন, জানা গেল সংখ্যা
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আ’লীগ এমপি আনারকে তার আশপাশের বন্ধুরাই হত্যা করেছে: রাশেদ খ…
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
FALL 2026
Application Deadline Wednesday, 16 Sept 2026
Apply Now

Admission Test Schedule

  • Test Date: Friday, 18 Sept 2026
  • Written Exam: 10:00 – 11:00 AM
  • Oral Viva: 11:30 AM onwards

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9