কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
© টিডিসি ফটো
বিদায় নিচ্ছে ২০১৮ সাল। বছরজুড়ে নানা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি)। লালমাই পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে উঠা বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বছরের শুরুটা অভিভাবকহীনতায় উৎকন্ঠার মধ্য দিয়ে শুরু হলেও শেষটা সৌভাগ্যের মেগা প্রকল্পের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। এছাড়া বছরজুড়ে বেহাল পরিবহন ব্যবস্থা ও বাসে হামলার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলনসহ নানা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পাহাড় আর সমতলের বিশ্ববিদ্যালয়টি।
অভিভাবকহীন বছর শুরু
২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলী আশরাফের মেয়াদ শেষ হয়। নতুন বছর শুরু হয় অভিভাবক শূণ্যতায়। চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি উপাচার্য শূন্য কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের দাবিতে মানববন্ধন করে সম্মিলিত সাংগঠনিক জোট। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেয় এ জোটটি। দীর্ঘ ৫৮ দিন উপাচার্য শূন্য থাকার পর ৩০ জানুয়ারি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমেস্ট্রি অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরীকে। এদিকে দীর্ঘদিন উপাচার্য শূণ্য থাকায় ১৯টি বিভাগের চূড়ান্ত পরীক্ষা আটকে থাকে। স্থগিত ছিল ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষাও। উপাচার্য নিয়োগের পর ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি নতুন শিক্ষাবর্ষের 'এ’ ও ‘বি’ ইউনিট এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘সি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে নতুন বর্ষের শিক্ষার্থীরা ভর্তির আগেই সেশনজটে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে বহিরাগতদের হামলার বিচারে প্রশাসনের অক্ষমতা
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বহণ করা বাসে চলতি বছর দুইবার হামলা করে বহিরাগতরা। তবে এসব হামলার ঘটনায় মামলা করা হলেও বিচার করতে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। চলতি বছরের ১৩ মে কুমিল্লা নগরীর পুলিশ লাইন এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের বাসে পুলিশের উপস্থিতিতে হামলা চালায় কুমিল্লা সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগ এবং মহানগর ছাত্রলীগের বেশ কিছু নেতাকর্মী। হামলার সময় পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জসহ রাবার বুলেট ও টিয়ালশেল নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় প্রায় ৪০ জন আহত হন। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাসও ভাঙচুর করা হয়। হামলাকারী কয়েকজনের ছবি পাওয়া গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি।
হামলার পরে রাত সাড়ে ৯টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত উপাচার্যের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। পরদিন ১৪ মে বাসে সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে দিনভর বিক্ষোভ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য প্রশাসনিক ভবনে প্রবেশ করলে শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হয়ে পুলিশ সদস্যদের ধাওয়া দেয়। পরে প্রক্টরিয়াল বডি এবং অন্য শিক্ষকরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
.jpg)
এরপর গত ১১ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে হামলার ঘটনায় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দশম ব্যাচের শিক্ষার্থী দ্বীন মোহাম্মদ এবং বাসটির চালক আলাউদ্দিন গুরুতর আহত হন। ঘটনার প্রতিবাদে বিচারের দাবিতে সন্ধ্যা সাড়ে ৮ টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ১২ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অজ্ঞাতনামা ১০-১৫জনকে আসামী করে কোতয়ালী মডেল থানায় মামলা করা হয়। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীরা হামলাকারী শণাক্ত করলেও কাউকে গ্রেফতার করেনি প্রশাসন।
বড় প্রাপ্তি স্বপ্নের মেগা প্রকল্প
বছরের মাঝামাঝি সময়ে মূল আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেগা প্রকল্প। ২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) ১১তম সভায় ‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন’ প্রকল্পে ১ হাজার ৬শ’ ৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা অনুমোদন পায়। প্রকল্পটির নতুন ভূমি অধিগ্রহণে বর্তমান ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ১ দশমিক ২ কিমি (প্রশাসনের মতে) দূরে রাজারখলা গ্রামে ২০০ দশমিক ২২ একর জায়গা নেয়া হবে। প্রতিষ্ঠার এক যুগে এসে মেগা প্রকল্প পাওয়াকে সৌভাগ্য মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যরা। তবে প্রায় সাড়ে ১৬শ কোটি টাকা বরাদ্দের পরেও ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের নামে বিভক্তি, প্রভাবশালীদের পূর্বপরিকল্পিত জায়গা কিনে রাখার অভিযোগ এবং বর্তমান ক্যাম্পাস নিয়ে বড় ধরণের কোন পরিকল্পনা না থাকাসহ বেশ কয়েকটি কারণে ক্ষুব্ধ ছিল শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাস বিভক্তির প্রতিবাদে এবং অখন্ড ক্যাম্পাসের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ করে বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা। এছাড়া ২৮ অক্টোবর ক্যাম্পাস বিভক্তির প্রতিবাদে মানববন্ধন করে স্থানীয়রা। এদিকে ক্যাম্পাস বিভক্তির প্রশ্নে প্রশাসনের দাবি, ক্যাম্পাসের আশেপাশে অধিগ্রহণের মতো পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে এ জায়গা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন
ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের মারধর, হুমকি-ধামকির পরেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন। আন্দোলনের অধিকাংশ সময় নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ ছিলো আন্দোলনকারীদের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মোবাইলেসহ বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়া হয় বলে অভিযোগ করে তারা। চলতি বছরের ১৮ মার্চ সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে মানববন্ধন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
.jpg)
এছাড়া ঢাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ‘পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে’ ৯ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস বর্জন করে শিক্ষার্থীরা। এরপর ১১ এপ্রিল ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে কুমিল্লা শহরের পূবালী চত্বর ও আশপাশের এলাকা অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। ১২ এপ্রিল কোটা আন্দোলনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে চাইলে এর বিপক্ষে ফেসবুকে হুমকি দেন শাখা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক রেজাউল ইসলাম মাজেদ। ফলে ওইদিন সংবাদ সম্মেলন ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে স্থগিত করা হয়। চলতি বছরের ৯ মে আন্দোলনকারীরা কেন্দ্রঘোষিত মানববন্ধনের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন করতে চাইলে বাধা দেয় শাখা ছাত্রলীগের উচ্চ-পর্যায়ের কয়েকজন নেতা। পরে ১০ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে কোটা আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে ইংরেজি বিভাগের ১০ম ব্যাচের ছাত্র আশরাফুল সৌরভকে মারধর করে শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এদিকে কোটা সংস্কারের পক্ষে স্ট্যাটাস এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছনার ছবি ফেসবুকে শেয়ার করার অভিযোগে কাজী নজরুল হলের আবাসিক শিক্ষক মোহাম্মদ আকবর হোসেনের অব্যাহতি দেয়ার জন্য হলের প্রাধ্যক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। তবে যারা আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে অভিযোগ করছেন তারা সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। পরে ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের আবাসিক শিক্ষকের দায়িত্ব থেকে সেই শিক্ষিককে অব্যাহতি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এছাড়া শিক্ষকের দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাস দেশবিরোধী কিনা তা খতিয়ে দেখার জন্য চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বছরজুড়েই লক্কড়-ঝক্কড় পরিবহণ ব্যবস্থা
বছরজুড়ে ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় বাসের কারণে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহণ ব্যবস্থা। প্রায়ই শিক্ষার্থীদের বহনকারী বিআরটিসি বাসগুলো বিকল হয়ে যায়। অনেক সময় শিক্ষার্থীদেরকে বাস ঠেলে নিতে দেখা যায়। এর ফলে বিভিন্ন সময় আন্দোলন করেছে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। চলতি বছরের ৩০ জুলাই ফিটনেসবিহীন বাস অপসারণ এবং শিক্ষার্থী বাস বৃদ্ধির দাবিতে ৩ দিনের আল্টিমেটাম দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পরে দাবি না মেনে নেয়ায় ৬ আগস্ট একই দাবিতে বিকেলের বাস আটকে রেখে প্রতিবাদ করে শিক্ষার্থীরা। পরে উপাচার্য নতুন বাস সংযোজনের আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর ১০ সেপ্টেম্বর নিজে চালিয়ে বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বাস উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী। পরিবহণ বাড়লেও চালক নিয়োগ না দেয়ায় শিক্ষার্থীদের দুটি বাস পরিবহণ পুলে পড়ে আছে। এতে করে তীব্র পরিবহণ সংকটেও দুটি বাস চলছেনা। জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট পরিবহণ সংখ্যা ১৭টি। তবে এর বিপরীতে চালক মাত্র ১২জন। এতে করে শিক্ষার্থীদের গাড়ি ব্যবহার করতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা।
.jpg)
চালকদের খামখেয়ালিপনা, নিজেদের বাসের চাপায় ২ শিক্ষার্থী
চলতি বছর চালকদের বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়েরে বাসের চাপায় গুরুতর আহত হয়েছেন ২ শিক্ষার্থী। এছাড়াও বিভিন্ন সময় বিআরটিসি পরিবহণের ত্রুটিপূর্ণ বাস, চালকদের অসদাচারণ এবং বেপরোয়া গতির অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। চলতি বছরের ২৯ মার্চ কুমিল্লার কোটবাড়িতে বিআরটিসি পরিবহণের বাসের চাপায় গুরুতর আহত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষার্থী শিহাব উদ্দিন। এ সময় শিহাবের ডান হাত এবং ডান পা মারাত্নকভাবে জখম হয়। এতে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থেকেও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেনি শিহাব। এরপর ১০ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহণ মাঠে বাসের চাপায় গুরুতর আহত হয় ইংরেজি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান। এসময় মাহমুদুল হাসানের ডান পায়ের বেশ কিছু অংশ কেটে গিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হলে শিক্ষার্থীরা রক্তাক্ত অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেলে নিয়ে যান।